রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইসলামের অপব্যাখ্যা হচ্ছে :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৪, ২৩:১১
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কিছু মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে শান্তির ধর্ম ইসলামের অপব্যাখ্যা করে মানবতাবিরোধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও একই ধুয়া তুলে মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়েছিল। মুসলমানদের মধ্যে ঢুকে হত্যা, নাশকতার মতো ঘটনা ঘটানোর ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করে এ বিষয়ে আলেমদের পাশাপাশি দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল শনিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, খুন-খারাবি, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ইসলামের শিক্ষা নয়। যারা এসব অপকর্ম করে তাদের কোন ধর্ম নেই, সীমানা নেই। তারা গণতন্ত্রেও বিশ্বাসী নয়। ইসলামের অপব্যাখ্যাকারী এ অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতে হবে। বিভিন্ন মুসলিম বিশ্বে হানাহানির বর্তমান চিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইসলামী দেশগুলোতে মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটি লেগেই আছে। এত সম্পদের অধিকারী এক একটা দেশ। অথচ সেই দেশে গোলমাল বাঁধিয়ে, দিয়ে কারা ফায়দা লুটছে? বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সময় মতো পদক্ষেপ নেয়ায় তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কিন্তু তাদের দুরভিসন্ধি এখনো রয়ে গেছে। তাই সকলকে সজাগ থাকতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, যারা নবী করিম (স.) এর সত্যিকার ইসলামিক চিন্তা-ভাবনায় বিশ্বাসী, যারা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করে, তাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে এদিকে নজর দিতে হবে। ইসলামকে শান্তির ধর্ম আখ্যায়িত করে এ ধর্মকে ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী মহল যেন বোমাবাজি, সন্ত্রাস, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়া, চোখ তুলে নেয়ার মত ধর্মবিরোধী কাজ করতে না পারে সে জন্য তিনি আলেম-ওলামাদের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, ইসলাম ধর্মে অপরাধীদের বিচার করার বিধান রয়েছে। তাই একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর। ভবিষ্যতে যেন কেউ আর এমন অন্যায় কাজ করতে না পারে সে জন্য সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। অথচ এ যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে বিএনপি-জামায়াত জোট হরতাল-অবরোধের নামে নাশকতা, স্কুলগামী শিশুদের ওপর বোমা হামলা, হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা, আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার মতো ঘৃণ্য কাজ করেছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যারা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে বিশ্বাস করে তাদের কোনো ধর্ম নাই। ওটাই তাদের ধর্ম। যারা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তারা প্রকৃত ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, ইসলামের নামে মানুষ হত্যা বন্ধ করতে হবে। যারা ধর্মের নামে জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাবে তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আওয়ামী লীগের নাম শুনলেই ধর্ম গেল বলে অপপ্রচার চালায়। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ধর্মের জন্য এতকিছু করার পরও আওয়ামী লীগের জন্য এটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। কওমি মাদ্রাসা পরিচালনায় গঠিত কমিশনের সুপারিশমালা চূড়ান্ত করতে আলেমদের পরামর্শ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম যাতে সকলে মিলে গ্রহণ করে। তাতে করে ওখানে যে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে তারা একটা সনদ পাবে। যে সনদের মাধ্যমে তারা দেশে-বিদেশে চাকরি পাবে। তারাও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাটা পাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় আদর্শে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের আজকের দিনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মের প্রচার ও প্রসারে বঙ্গবন্ধু তার সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে ইসলামের খেদমতে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ করেন। জাতীয় পর্যায়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদ্যাপনের জন্য সীরাত মজলিস গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু বেতার ও টেলিভিশনে প্রতিদিনের অনুষ্ঠান শুরু ও সমাপ্তিতে কোরআন তেলাওয়াতের ব্যবস্থা করেন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), শবে কদর ও শবে বরাতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। বিশ্ব এজতেমার জন্য টঙ্গির তুরাগ নদীর তীরে বিশাল জায়গা বরাদ্দ দেন। কাকরাইল মসজিদ সম্প্রসারণের জন্য জমি বরাদ্দ করেন। তিনি আইন করে মদ, জুয়া, হাউজি ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে বন্ধ করে দেয়। আমরা ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বায়তুল মুকাররম মসজিদের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের জন্য একটি মিনার নির্মাণের কাজ শুরু করি। পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এসে সে কাজ বন্ধ করে দেয়। গত মেয়াদে আমরা পুনরায় মসজিদ সম্প্রসারণ ও মিনার তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছি। হজ্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার জন্য আমাদের সরকার সৌদি সরকারের প্রশংসাপত্র পেয়েছে। হজ্ব ব্যবস্থাপনায় আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম স্থান অধিকার করেছি। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, ধর্ম সচিব চৌধুরী মোহাম্মদ বাবুল হাসান, ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল প্রমুখ বক্তব্য দেন। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে কোরআন তেলওয়াতের পাশাপাশি হামদ ও নাত গাওয়া হয়।