রাজধানীসহ সারাদেশের অবৈধ ব্লাডব্যাংকগুলোর কার্যক্রম বন্ধে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। এই ব্লাডব্যাংকগুলো রোগীর প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার বদলে কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। মাদকাসক্ত ও পেশাদার রক্তদাতারা নিয়মিত রক্ত বিক্রি করছে এখানে। রক্ত সুস্থ দাতার কীনা পরীক্ষার জন্য নেই আধুনিক সরঞ্জাম ও টেকনিশিয়ান। মোবাইল কোর্ট মাঝেমধ্যে এসব ব্লাডব্যাংকে অভিযান চালিয়ে এগুলোর মালিক-কর্মচারীকে জেল-জরিমানা করে। অনেক সময় সিলগালা করে দেয়া হয় ব্লাডব্যাংক। অবশ্য কিছুদিন পর পুনরায় শুরু হয় পুরনো ব্যবসা।
রাজধানীসহ সারাদেশে ৭৭টি অনুমোদিত বেসরকারি ব্লাডব্যাংক রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়। র্যাব ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে অবৈধ ব্লাডব্যাংকের সংখ্যা হাজারেরও বেশি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবাসিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অবৈধ ব্লাডব্যাংক পরিচালিত হতে দেখা গেছে রাজধানীতে। কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণী কিংবা পেশাদার রক্তদাতার রক্ত সংগ্রহ করে ঐসব ব্লাডব্যাংক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রক্ত সরবরাহ করছে। রোগীরা সুস্থ হওয়ার আশায় উল্টো অনেক টাকা দিয়ে কিনছে আরো প্রাণঘাতী রোগ। লিভার, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্তদের রক্তে এইডস, হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসসহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু রয়েছে। এই রক্ত রোগীকে দেয়ার পর তিনি ওই সকল মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক রোগীর এভাবে এইডসও হতে পারে। চিকিত্সকরা ঐসব রোগীর কাছে বিভিন্ন তথ্য জানতে গেলে বলেন, তারা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রক্ত ক্রয় করে শরীরে নিয়েছিলেন। গতকাল শনিবার র্যাব-২-এর পরিচালনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হসপাতাল অদূরে ১ নম্বর বকসিবাজার দোতলা ভবনে ঢাকা ব্লাড ব্যাংক সেন্টার নামে একটি অবৈধ রক্ত বেচাকেনার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। রক্তের ৫টি পরীক্ষা এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও সি, সিফিলিস ও ম্যালেরিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। এ পরীক্ষা শেষে নিরাপদ রক্ত হিসেবে রক্ত দেয়া যেতে পারে। পেশাদার ও মাদকাসক্তদের রক্ত কোন অবস্থায় রোগীকে দেয়া নিষেধ। মোবাইলকোর্ট দেখতে পায়, ওই সব অবৈধ ব্লাড ব্যাংকে এসব পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। নেই কোন যন্ত্রপাতি। ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানও নেই। প্রতি ব্যাগ রক্ত এক থেকে দেড় হাজার টাকায় রোগীর কাছে বিক্রি হয়। পেশাদার ডোনার ও মাদকাসক্তদের প্রত্যেককে এক ব্যাগ রক্তের জন্য মাত্র ২শ থেকে ৩শ টাকা অবৈধ ব্লাড ব্যাংক মালিকরা দিয়ে থাকেন। মোবাইলকোর্ট ওই ব্লাড ব্যাংকের মালিকদের একজন খোকনকে আটক করে। অনেকগুলো রক্তের ব্যাগ জব্দ করে মোবাইলকোর্ট। খোকন মোবাইল কোর্টকে জানায়, তার এই ব্লাড ব্যাংকের রক্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে বেশি চলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। অবশ্য রক্ত বিক্রি করে দালাল, এক শ্রেণীর চিকিত্সক ও নার্সকেও কমিশন দিতে হয়। এই ব্লাড ব্যাংকের মালিক খোকন একা নন। তার সঙ্গে আরও ৩ জন রয়েছে। এদের দুইজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্যাথলজী বিভাগের সিরাজুল হক ও মেডিসিন স্টোরের সারওয়ার হোসেন। খোকন প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দালালির পাশাপাশি এই ব্লাড ব্যাংকটি চালাচ্ছিল। মোবাইলকোর্ট খোকনকে ২ বছরের কারাদণ্ড দেয়। কর্মচারী ও দালাল রবিউল ইসলাম ও মোঃ রাসেল হোসেনকে এক বছর করে কারাদণ্ড দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয় মোবাইলকোর্ট।
মোবাইলকোর্ট উক্ত ব্লাড ব্যাংক নিয়ে ২৮টি ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালায়। এরমধ্যে ২৪টি অবৈধ এবং ৪টি বৈধ। জানা গেছে, বৈধ ব্লাড ব্যাংকগুলোও কোন নিয়মনীতি মানে না। এমন অবস্থা মোবাইল কোর্ট দেখে জেল-জরিমানা করেছে। ২৮টির মধ্যে ২৭টি রাজধানী ঢাকা এবং ১টি চট্টগ্রাম শহরে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডাঃ এমএ হান্নান বলেন, অবৈধ ব্লাড ব্যাংক বন্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। তারপরও এদের কার্যক্রম দেশব্যাপী চলছে। এক্ষেত্রে অন্যান্য পেশাদার লোকজনের মধ্যে সচেতনতা থাকা জরুরি।
