মানবসৃষ্ট ক্ষতির ঝুঁকি কমছে সুন্দরবনে

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৪, ২৩:১৫
সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম। জালে মাছ কম ধরা পড়লেই চলে যেতেন বনে। প্রতিকূল পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছ কাটতেন। কাঠ বিক্রি করে পরিবারের খরচ জোগাতেন। বনের গাছ কাটলে পরিবেশের ক্ষতি হয় জেনেও এ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেননি তিনি অভাবের তাড়নায়। তবে দেড় বছরে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন শুধু বড় জাল দিয়ে মাছ ধরেন নূরুল ইসলাম। গাছ কাটেন না। সুন্দরবনের অলিখিত প্রহরীও বনে গেছেন তিনি। নূরুল ইসলামের মতো সুন্দবনের উপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগণ এখন বনের ক্ষতি না করে বিকল্প পেশা গ্রহণে ঝুঁকছেন। সুন্দরবন সংলগ্ন চারটি জেলা- খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পিরোজপুরের যেসব মানুষ বনের ক্ষতি করে জীবিকা নির্বাহ করত, তারা এখন খুঁজছেন অন্য পেশা। এ চার জেলার ১১টি উপজেলার প্রায় ৪৫ হাজার পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের বিকল্প পেশায় জড়িত হতে সহায়তা করছে বন বিভাগ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এক্ষেত্রে সাফল্যও আসতে শুরু করেছে। বনের গাছ কাটা, কাঠ চুরি, পশু পাচার আগের চেয়ে কমেছে। বন অধিদপ্তর এবং সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৬ লাখ মানুষের জীবিকা সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। সংরক্ষিত বন হওয়া সত্ত্বেও এ জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ সুন্দরবনের কাঠ কেটে জীবিকা সংগ্রহ করে। অনেকে চোরাচালানীর সাথেও জড়িত। দুর্গম এলাকাগুলোতে জীবিকা আহরণের অন্য কোনো উপায় না পেয়ে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই চালিয়ে আসছেন জীবন। তাই সুন্দরবন সংরক্ষণে বন বিভাগের অনেক কর্মসূচি অতীতে স্থানীয়দের অসহযোগিতায় পুরোপুরি সাফল্যও পায়নি। এ প্রসঙ্গে সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের বন কর্মকর্তা মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে স্থানীয়দের জড়িত করার বিকল্প আমাদের হাতে নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহযোগিতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বিকল্প কর্মসংস্থানে ২০১০ সালে কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করে বন বিভাগ। সুন্দরবন এনভায়রনমেন্টাল এন্ড লাইভলিহুডস সিকিউরিটি (সিলস) প্রকল্পের আওতায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ৪০ লাখ ইউরো (প্রায় ৪৪ কোটি টাকা) ব্যয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রকল্পের অধীনে স্থানীয়দের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। সিলস প্রকল্পের পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ জানান, সুন্দরবনের ভিতরে ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে মূলত কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন নামে দুইটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে এ বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি ও সহায়তার কাজ চলছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয়দের মধ্যে হাস-মুরগি পালন, কাকড়া চাষ এবং ভ্যান গাড়ি, নৌকা ও জাল সরবরাহের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান করা হয়েছে। মুদি দোকান পরিচালনা করতেও পুঁজি সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে উপার্জনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চাঁদপাই রেঞ্জে খাল খননের মাধ্যমেও অনেকের জীবিকা নির্বাহের উপায় সৃষ্টি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বন বিভাগের খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক কার্তিক চন্দ্র সরকার বলেন, বনের ক্ষতির কারণ ও ফলাফল এবং সংরক্ষণ বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের ফলে সুন্দরবনে গাছ কাটা আগের চেয়ে কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন উপদেষ্টা মো. আরহাম উদ্দিন সিদ্দিক বলেন, সিলস প্রকল্পটি পরিচালনায় স্থানীয়দের জীবনমান বেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। সুন্দরবনের জন্য মানবসৃষ্ট ক্ষতির ঝুঁকি কমেছে। তবে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পরও স্থানীয়দের সহায়তা প্রয়োজন।