‘যদি মুক্তিযোদ্ধা হতে পারতাম’

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৪, ১৯:৪৬
ওহ্, এই পড়তে পড়তে আর ভাল লাগে না। স্কুল থেকে স্বাধীনতা দিবসের উপর রচনা লিখতে দিয়েছে। আপুর কাছে রক্তঝরা একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনী শুনে গর্বে বুক ভরে ওঠে। আমারে জন্ম তো স্বাধীনতার অনেক পরে। তাও মাঝে মাঝে ভাবি, আমি যদি একাত্তরে তরুণ বয়সের হতাম, তাহলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতাম। কিন্তু যখনই বই খুলি, খালি ইতিহাসের সাল, আর নানা ঘটনা। এত কঠিন যে কিছু বুঝি না। মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচনা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর লেখা বইগুলোও খুব কঠিন। এভাবে একটা বই পড়া যায় না যার অর্থই বুঝতে পারি না। বই থেকে তুলে রচনা লেখারও অর্থ থাকে না। এর মধ্যে সামনে অংক আর ইংরেজী ক্লাস টেস্ট। শুধু শুধু এই রচনা লিখতে দেবার কী দরকার ছিল? মাকে অভিযোগের সুরে বলছিল শিলা। শিলা এবার ক্লাস থ্রিতে উঠল। আসলেই আমাদের ইতিহাসকে জানার জন্য শিশুদের উপযুক্ত বই খুব কমই আছে। সব বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলোকে খুব কঠিন করে লেখা, তাই শিশুদের সে সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কমছে। শিশুদের উপযোগী বইয়ের অভাব দেশের লাখ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা তার প্রকৃত অর্থ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তাই বাচ্চাদের জন্য গল্প বা ছবির মধ্যে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দেশের অবস্থা, স্বাধীনতার কাহিনী তুলে ধরা যেতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র মানুষের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাই এই দিনটি ছোট বড় সবার আনন্দের সাথে মিলেমিশে পালন করতে হবে। পঞ্চম শেণীর ছাত্রী রিমঝিমের কাছে তার স্বাধীনতা দিবসের পরিকল্পনা জানতে চাই। রিমঝিম বলে, আমাদের স্কুলে ভাস্কর্য, ছবি আঁকা, রচনা এসব বিষয়ে প্রতিযোগিতা হবে। আমি সবগুলোতেই অংশ নেব। আবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বইমেলাও হবে দুইদিন ধরে, অপেক্ষায় আছি। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা বইগুলোই বইমেলায় বেশি থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের ওপরই আমাদের আঁকতে হবে বা রচনা লিখতে হবে। তবে সবসময় প্রতিযোগিতা না করে, আমাদের স্কুল থেকে স্বাধীনতা দিবসে নানা জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। যেটা আমাদের জন্য আরও ভাল হতো। যেমন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, স্মৃতিসৌধ। আমি কখনও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাইনি। যাওয়ার ইচ্ছা আছে। আমাদের স্কুলে আমার বন্ধু রাশেদ, মুক্তির গান এরকম নানা সিনেমাও দেখাতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শুনেছি আমার বয়সী বাচ্চারাও যুদ্ধ করেছে। ওদের গল্পও আমরা জানতে চাই। কিন্তু কঠিন ভাষায় পরীক্ষার পড়ার মত করে না, মুখস্ত করার মত করে না। আমাদের বাচ্চাদের জন্য একটা ওয়েবসাইট আছে, যেখানে সব দেশের বাচ্চারাই সদস্য। নানা বিষয়- ঘটনা নিয়ে তাতে লেখা যায়। আমি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সেখানে ছোট একটা লেখা দিয়েছি। বাসায়ও স্বাধীনতা দিবসে আমরা মজা করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা জায়গায় অনুষ্ঠান হয়, নাটক হয় আমরা দেখতে যাই। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মনে লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীনতা দিবসকে, স্বাধীনতাকে ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে ফুটিয়ে তুলতে আমাদের কী করতে হবে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানার কাছে জানতে চাই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে এখন টি-২০ বিশ্বকাপ হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রথম দশে চলে এসেছে। যা আমাদের কাছে স্বপ্নই থেকে যেত, যদি আমরা স্বাধীন হতে না পারতাম। দেশ স্বাধীন হবার আগে, পাকিস্তানের জাতীয় দলে বাঙালির কোন অংশগ্রহণ ছিল না। সব চাকরির উচ্চ পদগুলোতে হাতে গোনা একজন, দুজন ছিল পূর্ব-পাকিস্তানি। আমরা সবসময়ই ছিলাম শোষিত এবং তাই থাকতাম। বহু সংগ্রামের পর আন্দোলনের পর, মা-বোন ভাইদের হারিয়ে আমরা এ স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি। তাই এর প্রকৃত অর্থকে আমাদের বুঝতে হবে। এর মর্যাদা দিতে হবে। শিশুদের মধ্যে এ বোধ গড়ে তুলতে ছোটবেলা থেকেই গল্প, কবিতার মধ্যে দিয়ে সে সময়কার অবস্থা, আমাদের সংগ্রাম-যুদ্ধের চিত্র চোখের সামনে মেলে ধরতে হবে। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী। সেসময় আমরা মেয়েরা রাইফেলস ট্রেনিং নেই এ বোধ থেকে যে প্রয়োজনে আমরাও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ব। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেয়া-নেয়া, গেরিলাদের আশ্রয় দেয়া এসবই আমরা করেছি। সেসময় অনেক স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরাও সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তাই তাদের কথা এ প্রজন্মের শিশুদের জানতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা যারা এখনও বেঁচে রয়েছেন, তাদের কাছ থেকে সে সময়কার কথা, তাদের অভিজ্ঞতার কথা, নিজেদের জানতে হবে এবং শিশুদের বলতে হবে। যেন সরাসরি যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছেন, আমাদের এ স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন তারা আমাদের মনের মধ্য দিয়ে, আমাদের শিশুদের মনের মধ্যে দিয়ে যুগের পর যুগ ধরে বেঁচে থাকেন। শিশুদের কাছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথা বলতে স্কুল- কলেজগুলোকেও উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি স্কুলে ওদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা বিভিন্ন বই লাইব্রেরিতে রাখতে হবে। যা এ দেশ সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে শিশুদের জানতে, সচেতন করতে সাহায্য করবে। কৃতজ্ঞতা: শ্যামা শারমিন রহমান