নারী সাংবাদিক বললে যেন চোখ কপালে তুলে ফেলে এক শ্রেণির মানুষ। তাদের দৃষ্টিতে নারীর এই উন্নতি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বলে কি নারীরা সেই নিন্দুকদের খুশি করতে ঘরে বসে থাকবে? কখনোই নয়। নারী সমাজ আজ যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আসছে। নারীরা বার বার প্রমাণ করেছে তারাও চাইলে পুরুষের মত কাজ করতে পারে। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হচ্ছে সাংবাদিকতা। আর এই সাংবাদিকতা পেশায় নারীরা অনেক দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে চলেছে নির্ভয়ে, নিসংকোচে। একজন নারী সাংবাদিক হিসাবে থাকে নানা প্রতিবন্ধকতা, নানা বৈষম্য। প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নারী সাংবাদিকতার প্রতিবন্ধকতা ও বৈষম্য নিয়ে কথা বলেছিলাম চট্টগ্রামের ইলেট্রনিক মিডিয়ার পাঁচ নারী সাংবাদিকের সাথে। তাদের সাথে আলাপচারিতায় উঠে আসে এর বিভিন্ন দিক। সবার মতে- আমাদের সমাজ আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। আগে একটি মেয়েকে বাইরে কাজ করতে দেখলে অবাক হয়ে থাকতো। তবে ধীরে ধীরে এই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে তাঁরা সবাই এই পেশায় আসার ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। পারিবারিক সমর্থন ও দৃঢ় প্রত্যয় না থাকলে এই পেশায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।
লতিফা আনসারি রুনা
চট্টগ্রামের মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের লতিফা আনসারি রুনা বলেন, ইলেট্রনিক মিডিয়ায় ক্রাইম বিটে নারী সাংবাদিক কিন্তু খুব কম। আমি সবসময় চেয়েছি নিজেকে সবার সাথে তুলে ধরতে, মানে আমার যোগ্যতাটা প্রমাণ করতে। আমাকে শুরুতে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আমি কোন বিটে কাজ করবো? আমি কিন্তু সাহসের সাথে বলেছিলাম, আমি ক্রাইমে কাজ করবো। প্রাথমিকভাবে আমার অফিসের কলিগরা মনে করতো, নারী কিভাবে ক্রাইম রিপোর্টিং করবে? আমি কিন্তু প্রমাণ করে দিয়েছি নারীরাও ক্রাইমের নিউজ করতে পারে। আমাকে অনেক সময় সকাল থেকে অফিসে থাকতে হয়। বাসায় ফিরতে কখনো রাতের একটা দুটো বেজে যায়। পরিবারের লোকজন ও আমার বাচ্চা একটু রাগ করে আবার মানিয়ে নেয় সবাই। তবে এই পেশায় দেশের জন্য, সমাজের জন্য অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে।
শিউলি শবনম
একসময় একটি মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য থাকলেও তা এখন অনেকখানি কমে গেছে বলে মনে করেন বৈশাখি টেলিভিশনের শিউলি শবনম। তিনি বলেন, পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বেশ চ্যালেঞ্জিং। পেশাদারিত্ব মনোভাব যার আছে তার জন্যই সাংবাদিকতা। তিনি নারী হোন কিংবা পুরুষ। কোনো ছক মেপে বা সকাল-সন্ধ্যা হিসেব করে এ পেশায় টিকে থাকা যায় না। তাই সাংবাদিকতা পেশাকে আমি কখনোই নারীর দৃষ্টি থেকে দেখি না। দেখা উচিত বলেও মনে করি না। কোনো নির্দিষ্ট পেশাকে নারী অথবা পুরুষের জন্য বিভাজন করার এ দৃষ্টিভঙ্গি অনেক পুরনো। তবে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে নারীদের কিছুটা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। যেহেতু চ্যালেঞ্জ নেয়ার সক্ষমতা নিয়ে আমার মতো অনেকেই এ পেশায় আসছেন তাই এসব প্রতিবন্ধকতা কীভাবে পেরুতে হয় সেটাও তাদের জানা।
হাজেরা শিউলি
জানতে চাওয়া হয়েছিলো এতো প্রতিবন্ধকতার মাঝে আপনারা কিভাবে এই পেশায় কাজ করছেন? উত্তরে সময় টিভির হাজেরা শিউলি বলেন, আমাদের সমাজ এখনো সেই আদিমযুগে রয়ে গেছে সে কথা আমি বলব না। এখন অনেক উন্নত হয়েছে। একজন নারী হিসাবে এই পেশায় অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে পারিবারিক সর্মথন এটিকে এগিয়ে নিতে পারে। হয়তো রাতে নিউজগুলো আমরা কাভার করতে পারি না। এটার পরিবেশ এখনো এই চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয়নি। রাতে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে। আর সাংবাদিকতায় চট্টগ্রামের কাজের পরিসরও একটু কম। ঢাকার নারী সাংবাদিকতার তুলনায় চট্টগ্রাম অনেক পিছিয়ে। এর একটি কারণ হচ্ছে ঢাকার সামাজিক পরিস্থিতি এখনো চট্টগ্রামে হয়ে ওঠেনি।
জিন্নাত উল ফেরদৌস লিপি
সময় টিভির প্রতিনিধি জিন্নাত উল ফেরদৌস লিপি বলেন, মানুষের মধ্যে এখনো মনস্তাত্ত্বিক একটি বৈষম্য রয়ে গেছে। আমি প্রথম যেদিন খাতুনগঞ্জে নিউজ করতে যাই তখন অনেকে দেখে অবাক হয়। সবাই আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঢাকার তুলনায় আমাদের চট্টগ্রামের কাজের পরিবেশ একটু কম। এখন চাইলে রাতে ১২টার কোন নিউজ কভার করতে একজন নারী প্রতিবেদককে পাঠানো হয় না। একটি নারী দু’টি পর্যায়ে সংগ্রাম করতে হয়। বিবাহের আগে ও পরে। এই ক্ষেত্রে বিবাহের আগে হয়তো পরিবারকে বুঝিয়ে এই পেশায় আশা যায়। আগে কিন্তু বিয়ের পরে দু’টি পরিবার, সংসার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভাবতে এসে এই পেশা থেকে অনেকে সরে যেতো। তবে এটা এখন অনেক উন্নত হয়েছে। এখন অনেক নারী সাংবাদিক কিন্তু সাহসের সাথে দু’টি চালিয়ে যাচ্ছে।
নাসরিন জাহান সুলতানা
ইন্ডিপেন্ডেন্ট চ্যানেলের নারী সাংবাদিক নাসরিন জাহান সুলতানা মনে করেন সাংবাদিকতাও অন্যসব পেশার মত। তিনি বলেন, যখন একটি মেয়ে এই পেশায় কাজ করতে আসে তখন সে তার পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলো জেনেই আসে। এটা আসলে নির্ভর করে আমি কতটুকু দিতে পারবো। ইলেট্রনিক মিডিয়ায় যখন একজন নারী সাংবাদিক আসে তখন তাকে শুরুতেই প্রশ্ন করা হয়ে থাকে আপনি ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলো কাভার করতে পারবে কিনা। নারী হিসেবে এই পেশায় আসতে হলে পারিবারিক সার্পোটটা বেশি প্রয়োজন। কারণ আমাদের নির্দিষ্ট কোন সময় থাকে না, সকাল নয়টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। অনেক সময় আমাদের রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হয়। আবার অনেক সময় অনেক রাতেও বিভিন্ন সোর্স থেকে ফোন আসে। এসব দিক বিবেচনা করলে পারিবারিক সার্পোটটা খুব বেশি দরকার।
