যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিন্দা ও হুঁশিয়ারিকে পাত্তাই দিলেন না রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। নিজেদেরকে রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত করতে ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত উপদ্বীপ ক্রিমিয়াতে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল অনুসারে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সাথে যুক্ত করতে আনা বিলে শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষর করলেন তিনি। ক্রিমিয়ার নেতারাও এতে স্বাক্ষর করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপদ্বীপকে রাশিয়ার অঙ্গীভূত করেছেন। বিলে স্বাক্ষর করার পর উচ্ছ্বসিত পুতিন বলেন, ক্রিমিয়া সব সময়েই রাশিয়ার অংশ ছিল। ক্রিমিয়ার জনগণ এই গণভোটের মাধ্যমে একটি ‘ঐতিহাসিক অন্যায়কে’ সংশোধন করেছে মাত্র। যে ক্রিমিয়া এতদিন ছিল ইউক্রেনের অংশ সেই ক্রিমিয়া এখন রাশিয়ার। অর্থাত্ ভ্লাদিমির পুতিনের এখন পোয়াবারো অবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি পাল্টা শক্তি দেখালেন। একই সাথে রাশিয়ার স্বার্থ হাসিল করে নিলেন।
ক্রিমিয়া সংকট নিয়ে মস্কো তার অবস্থানে অনড় থাকায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর সংস্থা জি-এইট থেকে রাশিয়াকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। জুনে রাশিয়ার সোচিতে জি-এইট শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জি-এইট ভুক্ত বাকি সাতটি দেশ যৌথভাবে রাশিয়াকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে দফায় দফায় অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার ফেডারেশন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিল গত বৃহস্পতিবার দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে পাস হওয়ার পর শুক্রবার উচ্চকক্ষেও পাস হয়। এরপরই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিলটিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে বিলটি আইনে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবরোধ এবং হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে বিলে স্বাক্ষর করেন পুতিন। মস্কোর পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে বিলটি উত্থাপন হওয়ার সময় এর পক্ষে ছিলেন ১৫৫ জন সিনেটর। বিলটি একই সংসদের নিম্নকক্ষে ৪৪৫-১ ভোটে পাস হয়। ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সাথে সংযুক্তির বিলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করার পর রুশ প্রেসিডেন্ট মস্কো এবং ক্রিমিয়াতে রাতে আঁতশবাজি পুড়িয়ে এই ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা উদযাপন করার নির্দেশ দেন।
এর আগে ক্রিমিয়ায় মস্কোর হস্তক্ষেপে জড়িত রুশ-ইউক্রেন কর্মকর্তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ জব্দের তালিকায় আগের ৩২ জনের সাথে আরো ১২ জনের নাম যোগ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউক্রেনকে অস্থিতিশীল করার বাড়তি কোনো পদক্ষেপ নিলে রাশিয়ার ওপর আরো বেশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও প্রস্তুতি নিয়েও রেখেছেন বলে জানিয়েছেন ইইউ নেতারা। কিন্তু কোনো কিছুতেই কান দিলেন না রুশ প্রেসিডেন্ট। এত সমালোচনার মধ্যে তিনি কানে আঙুল দিয়ে ছিলেন এমনটি মনে হতে পারে।
বিলে স্বাক্ষর করার পর পুতিন ক্রেমলিনে রুশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। এতে তিনি ক্রিমিয়ার পদক্ষেপের সমর্থনে বলেন, ১৯৫৪ সালে এবং স্নায়ুযুদ্ধের শেষে দু’দফায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের অংশে পরিণত করাটা ছিল বড় ভুল। কারণ এই অঞ্চলটি রাশিয়ার জন্য ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনকে ভাঙতে চায় না। যারা বলছে যে, ক্রিমিয়ার পর অন্যান্য অঞ্চলের পালা আসবে- তাদের কথায় কান দেবেন না। পুতিন আরো বলেন, ক্রিমিয়ায় যে গণভোট হয়েছে তা আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ক্রিমিয়ার কর্মকর্তারা দাবি করেন, সেখানে আয়োজিত গণভোটে ৯৭ শতাংশ ভোট ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে পড়ে। এরপর ৪৮ ঘন্টা পার না হতেই দেশটিকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় রাশিয়া এবং পুতিন আনুষ্ঠানিকভাবে পার্লামেন্টকে জানান যে, ক্রিমিয়া রাশিয়ার অংশ হবার অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি এর পর এ সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন দেন।
আগে থেকে সমালোচনায় মুখর থাকা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ গণভোটকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করে অবরোধ আরোপ করে রাশিয়া, ক্রিমিয়া ও ইউক্রেনের সরকারি কর্মকর্তা ও অন্য ব্যক্তিবর্গের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের আদেশ দেয়। ইউক্রেনের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী আরসেনলি ইয়ােসনিয়ুক গণভোটকে বন্দুকের মুখে করা ‘সার্কাস’ বলে অভিহিত করেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্রিমিয়াকে রুশ ফেডারেশনের সাথে যুক্ত করার ঘটনাকে জবরদখল বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, ইউক্রেন বলেছে, ক্রিমিয়াকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে কোনোদিন স্বীকৃতি দিবে না। কিন্তু হাজার সমালোচনা সত্ত্বেও পুতিন বলেন, এই গণভোট সম্পূর্ণ বৈধ এবং এর ফলাফল গ্রহণযোগ্য। তিনি আরো বলেন, ক্রিমিয়ার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি ক্রিমিয়ার জনগণকে সত্, সাহসী এবং মর্যাদাবান বলে উল্লেখ করে বলেন, তাদের দেশপ্রেম প্রশংসার দাবিদার। অন্যদিকে পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়াকে তিনি ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেন।
ক্রিমিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হওয়ায় এখন সেখান থেকে ইউক্রেনের সেনাদের বিতাড়িত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রুশ সেনারা। ক্রিমিয়াতে অবস্থিত ইউক্রেনের একটি বিমান ঘাঁটিতে শনিবার অভিযান চালায় রাশিয়ার সেনাবাহিনী। সামরিক ট্যাংক নিয়ে রুশ সেনারা এই অভিযানের সময় দফায় দফায় গুলিবর্ষণ করে। এর আগে একই দিন ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা চালায় রুশ নাগরিকরা। নোভোফেডোরিভকা অঞ্চলে অবস্থিত ওই ঘাঁটিতে শত শত রুশ বিক্ষোভকারী হামলা চালায়। তারা ইউক্রেনের একাধিক নেভী জাহাজও আটক করেছে। তারা দাবি করে, গোটা ক্রিমিয়া এখন রাশিয়ার। সুতরাং এখানে ইউক্রেনের কারো উপস্থিতির অধিকার নেই। এই ঘটনা থেকে রাশিয়ার মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল। এবার সেই যুদ্ধের শতবার্ষিকী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। বর্তমান বিশ্বে ওই সব যুদ্ধের বিভীষিকা রূপ কেউ দেখতে চায় না। তবে দুটি যুদ্ধের মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তার ছায়া দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিরাজ করেনি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকে তাড়া করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমানে ইউক্রেন সংকট নিয়ে যা চলছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পাঠ্যে যাকে ঠাণ্ডা যুদ্ধ বলা হয়। আর এই যুদ্ধ থেকে রক্ষা পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। পাশাপাশি রাশিয়াসহ পশ্চিমা বিশ্বকে। তবে এটা বলা যায় যে, বিশ্বের বড় শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাটাই বেশি। ক্রিমিয়ায় গণভোটকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অবৈধ বলে আখ্যা দিয়েছে। ফলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কিনা। তাহলে আবার সত্যিই সেই ঠাণ্ডা যুদ্ধের ইতিহাসে ফিরে যাবে বিশ্ব! যেটাই ঘটুক না কেন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ক্রিমিয়া গণভোট থেকে সবচে বেশি সুফল কুড়িয়েছেন যিনি তার নাম ভ্লাদিমির পুতিন।
