থাইল্যান্ডে নির্বাচনই হয়নি!

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৪, ২২:০৮
থাইল্যান্ডে গত মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের কথা মনে আছে? যদিও ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে থাই পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তবুও উত্তরটা হওয়া উচিত -কিসের নির্বাচন? কোন্ নির্বাচন? কোনো নির্বাচনই তো হয়নি! কথাগুলো উদ্ভট শোনালেও তেমনটিই বলেছে থাই সাংবিধানিক আদালত। শুক্রবার আদালত বলেছে, থাইল্যান্ডে কোনো নির্বাচনই হয়নি। আপাতত দৃষ্টিতে গত ২ ফেব্রুয়ারি যে ভোটগ্রহণ হয়েছে তা পার্লামেন্ট নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না। থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত দেশটির নির্বাচন সংক্রান্ত এক পর্যবেক্ষণে রায় দিয়েছে যে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন বাতিল। কারণ, ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন সারাদেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে করে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে। থাই সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, সারাদেশে একই দিনে দেশজুড়ে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। যদি তা না হয় তবে সেটি জাতীয় নির্বাচন বলে গণ্য হবে না। কিন্তু গত নির্বাচন ফেব্রুয়ারির দুটি পৃথক দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম দফা ২ ফেব্রুয়ারি এবং স্থগিত হওয়া কেন্দ্রগুলোতে ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাত্ দুইদিন ধরে নির্বাচন হয়েছে। সংবিধানকে সম্মান করতে গেলে এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনের সংজ্ঞায় পড়ে না। নির্বাচনের সময় সরকার বিরোধীদের বাধার মুখে ২৮ জেলার প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। আদালত তার রুলে জানায়, ওইসব জেলাগুলোতে নির্বাচন না হওয়ায় সংবিধান লংঘন হয়েছে। আদালতের এ রায়ের ফলে আবার কবে অনুষ্ঠিত হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে দেশটির নির্বাচন কমিশনের সদস্য সোমচাই বলেছেন, নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করতে রাজকীয় ফরমান জারির দরকার হবে। এ ব্যাপারে আমরা সরকারের সাথে আলোচনা করতে পারি। তবে প্রধান বিরোধী দল এবং তার সমর্থক বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছে, পুনরায় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলে তারা আবারো প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এবারো নির্বাচন পণ্ড করে দিবে। অথচ ইংলাক সিনাওয়াত্রার পুয়া থাই পার্টি সরকার গঠনের অপেক্ষায় ছিল। বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনও মাঝপথে মারা পড়ার যোগাড় হয়েছিল। এর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এই রায় দিল সাংবিধানিক আদালত। এখন পুরান নির্বাচন থেকে সরকার গঠনের আর কোনো সম্ভাবনা থাকলো না। প্রশ্ন আসতে পারে, ইংলাকে বাড়া ভাতে কে ছাই দিল! তিনি বিরোধী দলের কিংবা বিক্ষোভকারীদের কোনো বড় নেতা নন। থাইল্যান্ডের থামাসাত ইউনির্ভাসিটির আইনের শিক্ষক কিতিপং কামোলথামাওং এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তিনিই নির্বাচনের বৈধতা নেই দাবি করে আদালতে নালিশ করেছিলেন। যখন তার অভিযোগের খবরটি প্রকাশ পায় তখন ক্ষমতাসীন পুয়া থাই পার্টি এবং ইংলাকের সমর্থক রেডশার্ট কর্মীরাও এমন আশঙ্কাতেই ছিলেন। শুক্রবারের আগে ওই আইনের শিক্ষক বুঝতেই পারেননি, অনেক রক্তপাত আর সংঘাতের বিনিময়ে বিক্ষোভকারীরা যে নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি, এক ফুত্কারেই তিনি উড়িয়ে দিবেন তা। ঠাঁই করে নিবেন ইতিহাসে। তবে নির্বাচন বাতিল করার পেছনে কিতিপংয়ের যেমন ভূমিকা আছে তেমন ভূমিকা আছে বিক্ষোভকারীদের নেতা সুথেপ থগসুবানেরও। তারা নির্বাচন ঠেকাতে না পারলেও প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম কেনার সময়ে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন যার ফলে ২৮টি জেলায় কোনো প্রার্থীই মনোনয়নপত্র কিনতে পারেননি। যে কারণে ওই ২৮ টি জেলায় আরেকটি দিনে ভোটগ্রহণ করা হয়। এই সুযোগটিই কাজে লাগান অভিযোগকারী। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুক্রবার দুপুরে সাংবিধানিক আদালত সব ওলট পালট করে দেয়। টানা চারমাস সরকার পতনের ব্যর্থ আন্দোলনের পর বিক্ষোভকারীরা যখন বাক্স পেটরা বন্ধ করে ঘরে ফিরে যাচ্ছিল তখন আদালতের রায় আন্দোলনের নিভু নিভু আগুনে ঘি ঢেলে দিল। প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষোভকারীদের নেতা সুথেপ থগসুবান সরকারের উদ্দেশে বলেন, একটি নির্বাচন বাতিল হয়েছে। তাই বলে স্বপ্নেও কল্পনা করবেন না যে আরেকটি নির্বাচন আপনাদের করতে দিব। তার কথায় সায় দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। তারা বলেছেন, নতুন করে নির্বাচন দিলে তারা আবারো বয়কট করবেন। সুথেপ থগসুবান আগামী ২৯ মার্চ আবার বিক্ষোভ ডেকেছেন। তিনি বলেছেন, ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের পর নির্বাচন দিতে হবে। এর আগে নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করলে তা ভণ্ডুল করে দেয়া হবে। থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের রায়ের পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ক্ষমতাসীন দল। পুয়া থাই পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই রায় অগ্রহণযোগ্য। থাইল্যান্ড জুড়ে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। নির্বাচন বাতিল হয়েছে। কি হবে এরপর। কে রাজার কাছে যাবে নতুন করে নির্বাচনের ফরমান জারির অনুরোধ করতে। রাজা যদি নতুন নির্বাচনের ফরমান জারিও করেন তবে বিক্ষোভকারীরা যে সেই নির্বাচন হতে দেবে তার নিশ্চয়তা বা কে দেবে। সব মিলিয়ে একগাদা অনিশ্চয়তার সুতার উপর ঝুলছে থাই জনগণের ভাগ্য। তারা কবে নতুন নির্বাচিত সরকার পাবে তা কেউ বলতে পারছে না।