বন্ধ হচ্ছে না তুরাগ দখল

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৪, ২৩:২৪
রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে চলছে দখলের মহোত্সব। যে যেখানে যেভাবে পারছে নদী ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তুলছে। সরকারি জমি দখল করে চলছে জমজমাট প্লট বাণিজ্য। সেই সঙ্গে চলছে নদী দূষণ। সব মিলিয়ে নদী রক্ষার দায় যেন কারো নেই। তুরাগ দখলে জড়িতদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সরকারি আমলা, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, অসাধু ব্যবসায়ী। কতিপয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও দখলদারিত্বের অভিযোগ রয়েছে। তুরাগ নদের ১০৯টি স্থানে কমবেশি অর্ধসহস্রাধিক দখলদার প্রকাশ্যে দখলযজ্ঞ চালাচ্ছে। শতাধিক হাউজিং কোম্পানি তুরাগ ভরাট করে প্লট ও ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করছে। আর এ সবই সম্ভব হয়েছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, ভূমি জরিপ অধিদফতর এবং বিআইডব্লিউটিএ’র নদী রক্ষায় সীমানা পিলার স্থাপনে ভুল ও অনিয়মের সুযোগে। বিতর্কিত সীমানা খুঁটির কারণে তুরাগ নদের প্রায় দেড় হাজার একর জমি বেহাত হয়ে গেছে। বেহাত হওয়া জমির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। সীমানা নির্ধারণ করে খুঁটি বসানো নিয়েও শতকোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতকিছুর পরও সীমানা পিলার গায়েব করে তুরাগ দখলের হিড়িক পড়েছে। পেশিশক্তি ও টাকার জোরে নদী খেকোরা সরকারি এক নং খাস খতিয়ান জালিয়াতি করে শত শত একর জায়গা নিজেদের নামে মাঠ পর্চাসহ রেকর্ড করে নিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন পবা, বাপা ও বিআইডব্লিউটিএ’র জরিপ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তুরাগ নদের মিরপুর এলাকা থেকে টঙ্গী ব্রিজ হয়ে টঙ্গী কহরদরিয়া খাল পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে দখলের নানা চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। দেখা গেছে, নদীর সীমানার ভেতরে গড়ে উঠেছে অট্রালিকা। সমবায় সমিতি, মার্কেট, শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি করে বাণিজ্য করছে দখলবাজরা। পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের অভিযোগ নদীর সীমানা খুঁটি স্থাপনে ভুল ও অনিয়মের কারণে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গী অঞ্চলে তুরাগ নদের প্রায় দেড় হাজার একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। সীমানার ২শ’ গজের মধ্যে কোন স্থাপনা তৈরি না করার নিয়ম থাকলেও তুরাগ নদের দুই তীরে প্রায় অর্ধশতাধিক ডায়িং কারখানা, হাউজিং প্রতিষ্ঠান, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ও বিভিন্ন সংগঠনের নামে তীরবর্তী জায়গা দখল করে বাউন্ডারি তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সীমানা নির্ধারণে ব্রিটিশ আমলের জরিপ এড়িয়ে সামপ্রতিক জরিপকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবে এবং উেকাচের বিনিময়েও ভুলভাবে সীমানা পিলার বসানো হয়েছে। হাইকোর্ট ২০০৯ সালের ২৫ জুন সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) পদ্ধতি অনুসারে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে (বর্ষাকাল) নদীর ঢাল থেকে ১৫০ ফুট দূরে সীমানা খুঁটি বসানোর নির্দেশ দিয়েছে। সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। ফলে নদীর বিপুল পরিমাণ জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। টঙ্গী-গাজীপুরে তুরাগ নদের ১৫ কিলোমিটার অংশে খুঁটি পোঁতা কাজে বরাদ্দ ছিল এক কোটি চল্লি¬শ লাখ টাকা। ভুল স্থানে খুঁটি পোঁতার কারণে বিআইডব্লিউটিএর হিসাবে ঢাকা, টঙ্গী ও গাজীপুরের তুরাগ নদের তীরবর্তী প্রায় দেড় হাজার একর জমি বেহাত হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) তুরাগের জরিপ প্রতিবেদনে উল্লে¬খ করেছে, টঙ্গীর ইজতেমা মাঠসংলগ্ন স্থানসহ বেশির ভাগ অংশই। নির্ধারিত স্থানের অনেক ভেতরে খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে খুঁটি পুঁতে বেহাত হওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। অনেক স্থানের খুঁটিগুলোও তুলে নিয়ে গেছে ভূমিদস্যুরা। এছাড়া নদী সংশ্লি¬ষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনের কর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা প্রদানের সত্যতা মিলেছে রিপোর্টে। বিশ্ব ইজতেমা মাঠের বিপরীতে তুরাগ নদের সীমানার বিশাল অংশ অবৈধভাবে দখলে নিয়ে কামার পাড়া এলাকার প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে একাধিক গদি বসিয়ে ব্যাপকহারে বালুর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিমাসে এখান থেকে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছে তারা। অপরদিকে ভরাট ও দখলের কবলে পড়ছে তুরাগ। বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন ইত্তেফাককে বলেন, তুরাগ নদের ১৫ কিলোমিটার অংশে ভুলভাবে প্রায় আড়াই হাজার সীমানা খুঁটি পোঁতা হয়েছে। অথচ এর মধ্যে মাত্র ২৯টি পিলার সঠিক স্থানে পেয়েছে বাপার পরিদর্শন টিম। যদিও ইতিমধ্যে একাধিক পিলার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, হাইকোর্ট নির্ধারিত নদীর সংজ্ঞাকে অবজ্ঞা করে জেলা প্রশাসন নিজস্ব বিবেচনায় শুষ্ক সময়ের নদীর তলাকে ‘নদী’ ধরে নিয়ে তুরাগের বুকের মধ্যেই খুঁটি বসিয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, তুরাগে সীমানা নির্ধারণ করে খুঁটি বসানোর সময় কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। খুঁটিগুলোর অধিকাংশই নদীর মূল সীমানা ও নকশা মেনে এবং হাইকোর্টের রায় অনুসারে বসানো হয়নি। পিলার বসানোর সময় গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্যদের মধ্যেও নদীর প্রকৃত সীমানা নিয়ে কয়েক দফা বিরোধ হয়েছিল। ২০০৪ সালের ১১ ডিসেম্বর গুগলের স্যাটেলাইট ছবি অনুযায়ী, তুরাগ ব্রিজের ১৩০ মিটার পশ্চিমে তখন নদী প্রায় ৫৭ মিটার প্রশস্ত ছিল। কিন্তু একই স্থানে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির চিত্রে দেখা যায়, তা ১৭ মিটার প্রস্থে দাঁড়িয়েছে।