নেতা-অভিনেতায় একাকার এখন কলকাতা!

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৪, ২০:১৯
পুরো কলকাতার টালিগঞ্জ, শুটিং ফ্লোর কিংবা রেকর্ডিং স্টুডিও পাড়ায় এখন একটাই আলোচনা, আড্ডায় একটাই মুখরোচক বিষয়—লোকসভা নির্বাচন। মুনমুন সেন, দেব, সন্ধ্যা রায়, সুভাষিনী আলি, শতাব্দী, তাপস পালসহ মঞ্চ, টিভি, চলচ্চিত্রের একাধিক মুখ এখন সরাসরি মনোনয়ন নিয়ে নিজ এলাকা ও মিডিয়াতে কথা বলছেন, কেউ বা নিজ নিজ পছন্দের দলের পক্ষ নিয়ে ক্যাম্পেইনে অংশ নিচ্ছেন। কোনো সভা, সেমিনারে তাই উঁকি দিলেই দেখা মিলছে কোনো না কোনো তারকার। এর সাথে আমাদের দেশের তারকাদের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার তুলনায় কলকাতার দৃশ্যপট একটু আলাদা বলা যায়। আমাদের দেশে সাধারণত সিনিয়র শিল্পীরাই অংশ নেন, যখন নিজের সাংস্কৃতিক কর্মজীবনের প্রৌঢ়কাল চলে। আমাদের এখানে অনেকেই একেবারে সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকেই একটি দলের পক্ষে থাকেন। পরে তারা সেই দলের টিকেট পান। কিন্তু কলকাতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলের সাথে পূর্বসূত্রিতা না থাকলেও লোকসভা নির্বাচনে হঠাত্ চমকের মতোই বিভিন্ন দলের টিকেটে নির্বাচন ক্যাম্পেইন করছেন। দলীয় নেতৃস্থানীয়রা এটাকে নতুন সমীকরণ বলছেন। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চমক তৈরি করেছেন দেব। সর্বকনিষ্ঠ তারকা ও প্রার্থী হিসেবে ঘাটালে নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন তিনি। পুরো মিডিয়া ও বিভিন্ন চ্যানেলের খবরজুড়েই দেবের নানান খবর এখন প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিদিন। দেব মজা করেই বলেন, ‘সিনেমা রিলিজের আগে এমনটা প্রতিদিন খবর জুটলে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির কোনো ছবি ফ্লপ যেত না।’ মিডিয়ার প্রচার সবচেয়ে বেশি পাচ্ছেন এই ‘চাঁদের পাহাড়’-এর তারকাটি। বিভিন্ন জনসভাতেও এভাবে মজা করেই কথা শোনাচ্ছেন তার ভক্ত ও ভোটারদের। বিভিন্ন চ্যানেল, থিয়েটার ও টালিগঞ্জ পাড়া ঘুরে বুঝা গেল দেবের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে বেশ মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। গত দুদিন চন্দ্রকোনা ফিল্ম সিটিতে শুটিং করার ফাঁকে ফাঁকেই দৌড় দিয়েছেন তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকায়। সেখানে কখনও বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিজ বাড়িতে চায়ের দাওয়াত করে চমক লাগাচ্ছেন, কিংবা সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের বক্তব্য কেন দিচ্ছেন তা নিয়েও চলছে নানা মুনির নানা মত। গতকাল এক ফিল্ম প্রোমোশন অনুষ্ঠানে কলকাতার অভিজাত রেস্তোরাঁয় মজা করে সাংবাদিকদের দেব বলেন, ‘এ বছর বিয়ে করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার এলাকা ঘাটাল তা একেবারে ঘেঁটে দিল।’ ঠাট্টা করে বলা এই খবরটিও চলে আসে মিডিয়ায় ভিন্ন রঙে। এদিকে এ বছর দেবের বিয়ে হোক না-হোক নির্বাচনের পরপরই দেব তার বোনের বিয়ে দেবেন। এখন দেখার বিষয় বোনের বিয়েতে দেব শুধু অভিনেতা থাকেন নাকি লোকসভার সদস্য হিসেবে বোনের বিয়ে দেন অন্য মেজাজে! প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলীর সাথে ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, ‘অভিনেতাদের এই নেতা হওয়ার শখটা অনেক পুরোনো। তবে দেব তার ভেতরে নতুন একটি উদাহরণ তৈরি করল। দেখা যাক উদাহরণটা কোন খাতে যায়—ভালো না মন্দ। তবে চলচ্চিত্রের মানুষ হিসেবে অবশ্যই চাইব অভিনয়ের দেব যেন না হারিয়ে যায় কোনোক্রমেই।’ এদিকে মুনমুন সেন তার মা সুচিত্রা ও নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এই দুয়ে আবিষ্ট হয়ে জনসভা করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় এখন তাই নেতা দর্শনের পাশাপাশি তারকা দর্শনও ঘটছে বেশ। তবে এর একটি চমত্কার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি একটি টিভি সাক্ষাত্কারে বললেন, ‘আসলে এটা একটা ইমেজ বিপ্লব। কারণ রাজনীতির ময়দানে এখন বাড়তি আকর্ষণ বলুন আর রাজনৈতিক তারকা প্রার্থীদের দেউলিয়াপনা বলুন এতে আমাদের সংস্কৃতিকর্মীদেরই জয় হচ্ছে। কারণ এখন গোটা ভারতজুড়েই যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলছে তাতে এই নির্বাচনে লতা মুঙ্গেশকর, শচীন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে মুনমুন বা দেবকে প্রয়োজন পড়ছে।’ মুনমুন সেনও একেকটি এলাকায় কতক্ষণ থাকছেন তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা আর কৈফিয়ত। বাঁকুড়ার প্রার্থী মুনমুন সেন কেন এসি গাড়িতে চড়ে নায়িকাসুলভ আচরণে নির্বাচনের ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন তা নিয়ে আবার কটাক্ষ করছেন তারই বিদ্রোহী প্রার্থী। মিডিয়াতে চুলচেরা এ বিষয়গুলোও উঠে আসছে প্রতিদিন। এখনকার খবরগুলোতে তাই নেতা আর অভিনেতারা যেন একাকার হয়ে আছেন! এ নিয়ে চিত্রনায়ক প্রসেনজিতের সাথে কথা বললে তিনি বেশ মজা করে বলেন, ‘দেখুন পরিণত বয়সী অভিনেতা বা শিল্পীরা নিজেদের ভাগ্য খোঁজেন ভালো ডিরেক্টরদের কাছে নিজের হাত দেখিয়ে। এখন অভিনয়শিল্পীরা কেউ কেউ হাত দেখাচ্ছেন জ্যোতিষীদের কাছে—তিনি জিতবেন কি জিতবেন না সেই প্রসঙ্গে। ক্ষমতার একটা আলাদা মোহ আছে। সেটা অস্বীকার করার কোনো মানে নেই। কিন্তু নিজের অভিনয়ের বলয়ের বাইরে এই গুরুদায়িত্ব পালনে কিছুটা ব্যর্থ হলেও শোবিজ কুশলী হিসেবে তা আমাদের খারাপ লাগবে। কারণ সমাজের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। ঠুনকো জনপ্রিয়তা আর সমাজের দায়িত্ব নেয়া দুটো একেবারেই আলাদা।’ এমন মিশ্র প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই কলকাতার শোবিজ অঙ্গন তাই নেতা আর অভিনেতায় একাকার আজ। কোনো জায়গায় জনপ্রিয় শোবিজ তারকা নিজ এলাকার ক্যাম্পেইনে যাচ্ছেন সেখানকার সবচেয়ে প্রতাপশালী রাজনীতিবিদকে সাথে নিয়ে। আবার কোনো বড় রাজনীতিক তার এলাকার ক্যাম্পেইনে যাচ্ছেন বাপ্পী লাহিড়ী বা জনপ্রিয় তারকাদের নিয়ে নতুন চমক হিসেবে। এ নিয়ে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুপম ইসলাম মজা করে বলেন, ‘তবে লোকসভা নির্বাচনে এই তারকাশিল্পীদের নতুন চর্চায় একটা লাভ হয়েছে। সবাই নিজ থেকে বা লোক দেখানোর জন্য হলেও সমাজসেবা বা সমাজ হিতৈষী কাজে অভ্যস্ত হচ্ছেন। কিছুদিন আগে এক পত্রিকায় দেখলাম, শুটিং স্পটে এক প্রখ্যাত হিরো এক অসুস্থ কুকুরকে রাস্তার মাঝখান থেকে সাইড করে রাখছেন। আর যাই হোক, এর আগে এমন খবর আমার চোখে পড়েনি। এই চর্চাগুলো আমাদের জীবনে যে হচ্ছে, প্রচার বা মানসিক তুষ্টির জন্য এটাই বা কম কীসে!’