উত্তাল মার্চের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৪, ১৭:৫৭
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে তিনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সাংস্কৃতিক মুক্তির কথাও বলেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে শিল্পী ও সংস্কৃতি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘরে বসে থাকতে পারেনি। শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিকসমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেছিল অসহযোগ কর্মসূচিতে একাত্ম হতে। ৫ মার্চ লেখক সংঘের কার্যালয় থেকে লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীসমাজ স্লোগানমুখর মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে সমবেত হন। মিছিল থেকে ‘তুলি-কলম-কাস্তে-হাতুড়ি—এক করো এক করো’, ‘লেখকদের সংগ্রাম—চলবে চলবে’ ইত্যাদি স্লোগান ধ্বনিত হয়। শহীদ মিনারে আহমদ শরীফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন মযহারুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। একই দিন পূর্ববাংলার ৩৩ জন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সঙ্গীতপরিচালক এক যুক্ত বিবৃতিতে ঘোষণা করেন, পূর্ববাংলার ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সবাই জনতার সংগ্রামের সঙ্গে থাকবে। বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল জব্বার খান, খান আতাউর রহমান, সালাহউদ্দীন, সত্য সাহা, আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হান প্রমুখ। ৬ মার্চ বাংলার শিল্পীসমাজ গণহত্যার প্রতিবাদে এবং স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষণা করে। এদিন বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও চিত্রশিল্পীদের যৌথ উদ্যোগে কণ্ঠশিল্পী লায়লা আর্জুমান্দ বানুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তৃতা করেন কামরুল হাসান, খান আতাউর রহমান, সৈয়দ হাসান ইমাম, ওয়াহিদুল হক প্রমুখ। বক্তাবৃন্দ আন্দোলনে গণমুখী সঙ্গীত, নাটক, কথিকা ইত্যাদির প্রচারে বেতার, টেলিভিশন ও সরকারি কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধের তীব্র নিন্দা করেন। সমাবেশ শেষে বিক্ষুব্ধ শিল্পীদের বিশাল মিছিল বের হয়। লেখক শিল্পী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল হয় ১০ মার্চ। এরপর শহীদ মিনারে সভা, কবিতাপাঠ ও গণসঙ্গীতের আসর বসে। ঢাকা বেতার ও টেলিভিশনের সকল অনুষ্ঠান বাংলার গণআন্দোলনের অনুকূল হবে—এই শর্তে বিক্ষুদ্ধ শিল্পীসমাজ ১০ মার্চ থেকে বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১১ মার্চ গণহত্যার প্রতিবাদে চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর সরকারের তথ্য ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় আয়োজিত চিত্রপ্রদর্শনীতে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দেশের চিত্রকরদের উক্ত প্রদর্শনী বর্জনের আহ্বান জানান। ১২ মার্চ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শিল্পী সৈয়দ শফিকুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মুক্তিসংগ্রামের প্রতীক জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, সভা অনুষ্ঠানে সাইক্লোস্টাইল করে দেশাত্মবোধক ও সংগ্রামী স্কেচ বিতরণ করা, পোস্টার-ফেস্টুনসহ মিছিলের আয়োজন করা প্রভৃতি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সভায় মুর্তজা বশীর ও কাইয়ুম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১২ মার্চ হাসান হাফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। এর সদস্যবৃন্দের মধ্যে ছিলেন সিকানদার আবু জাফর, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, বদরুদ্দীন উমর, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সুফিয়া কামাল প্রমুখ। ১৫ মার্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘বিক্ষুদ্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ’ গণসঙ্গীতের আয়োজন করে। হাজার হাজার শ্রোতা এ অনুষ্ঠানে যোগদান করে গণসঙ্গীতে কণ্ঠ মিলায়। বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের নেতৃবৃন্দ ঢাকা বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদ, সঙ্গীত ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের নীতি হবে জনতাকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করা। সৈয়দ হাসান ইমামকে আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের ৪৫ জন বিশিষ্ট শিল্পীকে সদস্য করে গঠিত হয় বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজের সংগ্রাম পরিষদ। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ১৬ মার্চ গণসঙ্গীত, গণনাট্য অনুষ্ঠান ও পথসভা। একই দিন বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণসঙ্গীত, কবিতাপাঠ ও নাট্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে। গণআন্দোলনের পটভূমিতে রচিত ‘ভোরের স্বপ্ন’ নাটক জনমনে বিপুল সাড়া জাগায়। এদিন চারু ও কারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশের আয়োজন করে। এতে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও মুর্তজা বশীর। মিছিলের পুরোভাগে ছিল চার জন ছাত্রী সম্মুখভাগে বহন করা বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘স্বা-ধী-ন-তা’। মিছিলে ছিল প্রায় ৩৫টি কার্টুন, ফেস্টুন ও পোস্টার। একই সঙ্গে চলছিল ব্রতচারী আন্দোলন। লেখক সংগ্রাম শিবিরের উদ্যোগে ২২ মার্চ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আহমদ শরীফের সভাপতিত্বে কবিতা পাঠের আসরে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ। গণতান্ত্রিক অধিকার বঞ্চিত করার প্রতিবাদে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ‘হিলাল ই সিতারা’, মুনীর চৌধুরী ‘সিতারায়ে ইমতিয়াজ’ এবং অন্যান্য শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী পাকিস্তান রাষ্ট্রের খেতাব বর্জন করেন। সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে তা হয়ে ওঠে অনন্য প্রতীক। ২৩ মার্চ ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ’ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশগামী পাকিস্তানি বিমান ও নৌবাহিনীর মালদ্বীপ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতিদানের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে। লেখক-শিল্পীসমাজ ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একই দিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘ছায়ানট’ ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভোরবেলা একটি দেশাত্মবোধক গানের আসরের আয়োজন করে। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির হাজার হাজার সাইক্লোস্টাইল কপি উপস্থিত শ্রোতা ও জনতার মাঝে বিলিয়ে ছেলেমেয়েদের সাথে উপস্থিত জনতাকেও গাইতে বলা হয়। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি মঞ্চে শিল্পীরা গাইছে আর তাদের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইছে দর্শক-শ্রোতারাও। ২৪ মার্চ আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর সভাপতিত্বে ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’-এর ‘ভবিষ্যত্ বাংলা’ শীর্ষক আলোচনা সভা বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আহমদ শরীফ, মমতাজুর রহমান তরফদার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বশীর আল হেলাল প্রমুখ। এভাবে একাত্তরের পহেলা থেকে পঁচিশে মার্চ পর্যন্ত অসহযোগের দিনগুলোতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে।