নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে আজ র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) উদযাপন করছে দশম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ২০০৪ সালের এই দিনে স্বাধীনতা দিবস প্যারেডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে র্যাব আত্মপ্রকাশ করে। অপারেশন দায়িত্ব পায় ২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিল। রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের সম্মুখে আসে। আর ঐ বছরের ৩০ জুন রাজধানীর উত্তরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান ক্রসফায়ারে নিহতের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ অপারেশন কার্যক্রম শুরু করে র্যাব।
র্যাবের ১০ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল পৃথক বাণীতে এ বাহিনীর সকল সদস্যকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাণীতে এ বাহিনীর অব্যাহত অগ্রগতি ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
র্যাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আজ সকাল ৮টায় র্যাব সদর দফতরে দরবার অনুষ্ঠিত হবে। এতে র্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতিতে র্যাব মহাপরিচালক বক্তব্য রাখবেন। পরে দেশের ১৪টি ব্যাটালিয়নে র্যাব সদস্যদের মধ্যে প্রীতিভোজ অনুষ্ঠিত হবে।
দশ বছরে র্যাবের সাফল্য শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগও রয়েছে। নানা অপরাধে র্যাবের কিছু সংখ্যক সদস্য জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বিভাগীয়ভাবে শাস্তির ব্যবস্থা নিয়েছে র্যাব। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। তবে তা শুধরে নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত টিম র্যাব সদস্যদের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। র্যাবের পদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, একটি বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্থান দেখিয়েছে র্যাব।
কার্যক্রম শুরুর সময় ব্যাটালিয়ন ছিল সদর দফতরসহ ৭টি। লোকবল ৫ হাজার ৫২১ জন। প্রয়োজনের তাগিদে বেড়েছে র্যাবের জনবল ও ব্যাটালিয়নের সংখ্যা। পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার ও সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের বাছাইকৃত চৌকস কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের নিয়ে এখন ১৪টি ব্যাটালিয়নে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার র্যাব সদস্য কর্মরত রয়েছেন।
র্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, র্যাব সদস্যরা কি উদ্ধার করতে পেরেছে তা বড় কথা নয়। আপামর জনসাধারণের সেবা প্রদানই মূল লক্ষ্য। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে র্যাব মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছে তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আগামীতেও র্যাবের এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
র্যাবের হিসাব অনুযায়ী গত দশ বছরে সারাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ২১২ জনকে তারা গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৪ জন জামায়াতুল মুজাহিদীন (জেএমবি) ও হরকাতুল জিহাদসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। অভিযানে গত এক দশকে ৮ হাজার ২০৩ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রেফতার, ১১ হাজার ১৬টি অস্ত্র, ৯২ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ, সাড়ে ৭ হাজার ককটেল, বোমা, গ্রেনেড এবং ৫,২৮০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে র্যাব।
র্যাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০০৪ সালে ৫৪ জন, ২০০৫ সালে ১০৬ জন, ২০০৬ সালে ১০৯ জন, ২০০৭ সালে ৮১ জন, ২০০৮ সালে ৬৩ জন, ২০০৯ সালে ৩৮ জন, ২০১০ সালে ৪২ জন, ২০১১ সালে ২৩ জন, ২০১২ সালে ৪৫ জন, ২০১৩ সালে ৩৫ জন ক্রসফায়ার, লাইন অব ফায়ার এবং বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। নিহতদের বেশিরভাগই হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দলের সদস্য, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও সুন্দরবনের জলদস্যু।
র্যাব প্রতিষ্ঠার এই দশ বছরে র্যাবের অনেক আলোচিত ঘটনা রয়েছে। জেএমবি’র শীর্ষ নেতা ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারী শায়খ আব্দুর রহমান, জেএমবির সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, হরকাতুল জিহাদের মুফতি আব্দুল হান্নানসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহরীর সদস্যদের গ্রেফতার করে। চট্টগ্রামে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জামাল উদ্দীনের কংকাল উদ্ধার এবং এর রহস্য উন্মোচন করার বিষয়টি অনেক আলোচিত। ঢাকা ও ঝিনাইদহে দেশের আলোচিত চরমপন্থি নেতা মোফাখখারুল ইসলাম ও আব্দুর রশিদ ওরফে তপর মালিথা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। র্যাবের কার্যক্রম শুরুর পর ২০০৪ সালের ৩০ জুন ঢাকার অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার ঘটনাটি ছিল ঐ বছর সবচেয়ে আলোচিত। ২০০৬ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকার গুলশানে ইয়াবা সম্রাট আমিন হুদা ও ছয় ধনীর দুলালকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেফতারের পর সারাদেশে তরুণ সমাজ যে ইয়াবায় আসক্ত সে বিষয়টি ধরা পড়ে। ঢাকার কেরানীগঞ্জের চাঞ্চল্যকর পরাগ মন্ডল অপহরণ মামলার সাথে সরাসরি জড়িত ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের টাকা লুটের প্রধান আসামি গ্রেফতার ও ১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনাটি ছিল এ বছর সবচে আলোচিত।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামে দরবার শরীফে একজন র্যাবের পদস্থ কর্মকর্তা কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাটি যেমন র্যাবের গায়ে কলংকের তিলক এঁটে দিয়েছে। তবে এ ঘটনাটি তদন্ত এবং টাকা উদ্ধার ও অভিযুক্ত র্যাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ায় র্যাবও সেই অভিযোগ অনেকটা খণ্ডন করেছে। এছাড়া র্যাব পরিচয়ে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী ও সাধারণ মানুষ গুমের অভিযোগ রয়েছে র্যাবের বিরুদ্ধে। তবে এ রকমই র্যাব পরিচয়ে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম অপহরণ ও হত্যার ঘটনাটি র্যাব তদন্ত করে দেখে যে, একটি চক্র এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে র্যাবের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
