মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ব দেশ

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৪, ২৩:২৯
মহান স্বাধীনতা দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধায় মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করলো গোটা জাতি। ‘লাখো কণ্ঠে’ জাতীয় সংগীত গেয়ে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার পালিত হয় মহান স্বাধীনতার ৪৩ বছর পূর্তি দিবস। এসময় সর্বস্তরের মানুষের দেয়া ফুলে ফুলে ভরে যায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর সমাধির বেদিমূল। গতকাল প্রত্যুষে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয়। ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল এ সময় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে রাষ্ট্রপতি স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এরপর সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, নয়জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যরা শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবর্গ, কূটনীতিক, তিন বাহিনীর প্রধান, মুক্তিযোদ্ধা এবং পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এছাড়া সকাল ৭টায় প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ইস্যু করা ১০ টাকা মূল্যমানের স্মারক ডাকটিকেট ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন। গণভবনে এই অবমুক্ত অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল ছিল সরকারি ছুটি। স্বাধীনতা দিবসের তাত্পর্য তুলে ধরে বেতার, টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ভবন, বাড়িঘর, যানবাহন ও দোকানে উড়ে জাতীয় পতাকা। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়। সারাদেশে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মসজিদে বিশেষ মোনাজাতে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত, দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করা হয়। মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাতেও অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রার্থনা সভা। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন-প্রতিষ্ঠান আনন্দ শোভাযাত্রা, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা দিবস পালন করে। আওয়ামী লীগের একটি কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন শেষে মোনাজাত করে। অজস্র মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলির ফুলে ভরে উঠে স্বাধীনতার মহান স্থপতির সমাধির বেদিমূল। সশস্ত্র বাহিনীও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্র, হাসপাতাল, জেলাখানা, সরকারি শিশুসনদসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। জাতীয় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষের ঢল গতকাল ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে। হাতে হাতে ছিল রঙ-বেরঙের ফুল আর লাল-সবুজ পতাকা। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতিসৌধের বেদীমূল। স্মৃতিসৌধ ঘিরে গোটা সাভার-নবীনগর এলকায় ছড়িয়ে পড়ে উত্সবের আমেজ। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সকাল সাতটা ৫০ মিনিটে জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে নিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মাত্র। আর যখন হবে তখন আপনাদের জানানো হবে। রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্যগণ এবং কূটনীতিকরা স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করার পর স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। খালেদা জিয়ার শ্রদ্ধা নিবেদন সকাল পৌনে ৯ টার দিকে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সোয়া ৯ টায় তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করেন। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, সেলিমা রহমান প্রমুখ তার সঙ্গে ছিলেন। পরে বিকালে শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও স্বামী জিয়াউর রহমানের মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান খালেদা জিয়া। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দাবি করেন, ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’ অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। জাতীয় পার্টি’র (জেপি) শ্রদ্ধাঞ্জলি দিবসটি উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৬টায় দলের কেন্দ্রীয় ও দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে দলের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এ সময় জেপি নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহ উদ্দিন আহমেদ, মানবাধিকার সম্পাদক নূরুল ইসলাম মিয়া খান, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী প্রমুখ। অন্যান্যের শ্রদ্ধা সকালে উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণফোরাম, কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ এর নেতৃত্বে এলডিপি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সেক্টর্স কমান্ডারস ফোরাম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাসদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, মহিলা পরিষদ, কৃষক লীগ, কৃষক সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, যুবলীগ, যুবদল, যুব ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, বঙ্গবন্ধু সংসদ, জাসাসসহ বিভিন্ন দল, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এছাড়াও স্মৃতিসৌধের বেদীতে ফুল দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জনতা ব্যাংক, এডাব, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, জাতীয় শ্রমিক লীগ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে গতকাল ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল মানুষের ঢল। অগণিত মানুষ শ্রদ্ধা জানান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দেশাত্মবোধক গান, শ্লোগান আর মিছিলে মিছিলে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন প্রাঙ্গণ দিনভর ছিল মুখরিত। হাজার হাজার মানুষ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে ঘুরে দেখেন। জাতীয় স্মৃতিসৌধের কর্মসূচি শেষ করে প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে প্রধানমন্ত্রী দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দলীয় সভানেত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফসহ দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক। এসময় আওয়ামী লীগের অসংখ্য দল ও সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।