সায়মা নাজনীন নিশাতের সঙ্গে পরিচয় গত একবছর ধরে তার এক বান্ধবীর মাধ্যমে। আর এই পরিচয়ের পর থেকেই তাকে ভালবাসতে শুরু করি। কিন্তু সায়মা আমার ভালবাসার কোন মূল্য দেয়নি। বরাবরই ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। পাশাপাশি তার বাবা ও ভাইয়ের কাছে বার বার নানাভাবে অপমানিত হয়েছি। এর ফলে তার প্রতি চরম ক্ষোভ দানা বাঁধে। এ কারণে ঘটনার দিন (সোমবার) সকালে পূর্ব পরিচিত শহীদকে (প্রাইভেটকার চালক) সঙ্গে নিয়ে সায়মাদের বাসায় যাই। পরিকল্পনা ছিল অস্ত্রের মুখে সায়মাকে তুলে নিয়ে বিয়ে করার। কিন্তু বাসায় ঢোকার পরপরই সায়মার মা রিজিয়া খাতুনের সঙ্গে শহীদের ধস্তাধন্তি হয়। একপর্যায় শহীদ তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পাশাপাশি সায়মাও প্রচণ্ডভাবে চিত্কার শুরু করে। এ অবস্থায় ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকায় সায়মাকে ছুরিকঘাত করে হত্যা করি। পরে দু’জনের হাত-পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করি। বাসায় প্রবেশ আর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছে সায়মা ও তার মা রিজিয়া খাতুন হত্যার প্রধান ঘাতক আবু রায়হান (২৫)। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাকে গ্রেফতার করে। গতকালই তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। অপরদিকে রায়হানের দেয়া তথ্যমতে গতকাল ভোর চারটার দিকে চট্টগ্রামের খুলশীর মাস্টার লেন এলাকার বাসা থেকে গ্রেফতার হয় আবু রায়হানের সহযোগী অপর খুনি শহীদ (২৭)।
গত সোমবার (২৪ মার্চ) সকালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ১৭ নম্বর রোডের ১২৯ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে (পদ্মা-যমুনা ভবন) সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রেজাউল করিমের স্ত্রী রিজিয়া খাতুন (৪৭) ও এসএসসি পরীক্ষার্থী সায়মা নাজনীন নিশাতকে (১৬) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সায়মার বাবা রেজাউল করিম বাদি হয়ে সোমবার রাতে ডবলমুরিং থানায় মামলা করেন। মামলায় রায়হানসহ অজ্ঞাত ৭/৮ জনকে আসামি করা হয়।
পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ড: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দফতরে জিজ্ঞাসাবাদকালে আবু রায়হানের মধ্যে কোন ভয়ের ছাপ ছিল না। ধরা পড়ার পরপরই অকপটে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা করে। আবু রায়হান জানায়, বার বার অপমানিত হবার পর সায়মাকে অস্ত্রের মুখে তুলে এনে বিয়ে করার পরিকল্পনা ছিল। আর এ পরিকল্পনা অনুয়ায়ী রায়হান সহযোগী হিসেবে বেছে নেয় চালক শহীদকে। ক্রাউন রেসিডেন্স রেস্ট হাউজে যাতায়াতের সুবাদে আগে থেকেই তার সঙ্গে পরিচয় ছিল রায়হানের। তাছাড়া শহীদ ঘটনার কয়েকদিন আগে রায়হানের কাছে ১০ হাজার টাকা ধার চায়। আর এটাকে কাজে লাগায় রায়হান। রায়হান তার পরিকল্পনার কথা শহীদকে জানায় এবং কাজটি সফল হলে তাকে সাত হাজার টাকা দেয়ার কথা বলে। এতে রাজি হয় শহীদ। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ঘটনার একদিন আগে আবু রায়হার ছোরা কেনে। আর ঘটনার দিন সকালে ব্যাগে করে ছুরি নিয়ে সায়মাদের বাসায় যায়। এসময় সায়মা ও তার মা ছাড়া বাসায় কেউ ছিল না। কলিং বেল চাপলে সায়মা দরজা খোলে। তাকে দেখে সায়মা ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠে এবং দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করে। এ পর্যায়ে তারা জোর করে বাসার ভেতরে প্রবেশ করে। রায়হান সায়মাকে ধরে ফেলে তার হাত বেঁধে ফেলার চেষ্টা করে। অপরদিকে ড্রাইংরুমে শহীদের সঙ্গে সায়মার মা রিজিয়া বেগমের ধস্তাধন্তি হয়। একপর্যায় শহীদ তাকে ছুরিকাঘাত করলে তিনি নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। এ অবস্থায় শহীদ পাশের রুমে এসে রায়হানকে হত্যার বিষয়টি অবহিত করে। এ অবস্থায় ধরা পড়ার আশংকায় সায়মাকে তারা হত্যা করে। রায়হান আরও জানায়, ঘটনার সময় সায়মাকে ছুরিকাঘাত করার আগে সে তার হাতে কামড় দেয়।
রায়হান জানায়, পরিকল্পনা ছিল বাসা থেকে টাকা, স্বর্ণালংকার লুট করা। কিন্তু দুইটি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ায় তারা লুটের চিস্তা পরিত্যাগ করে। এদিকে তাদের দুজনের শরীরের জামা প্যান্ট রক্তে ভিজে যায়। এসময় আবু রায়হার তার প্যান্টের উপর আর একটি প্যান্ট পরে নেয় (আলনায় রাখা ছিল, সম্ভবত সায়মার ভাইয়ের)। অপরদিকে শহীদ তার রক্তমাখা প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পরে। এরপর তারা বাসার নিচে নেমে অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এরপর রায়হান কৈবল্যধাম এলাকার একটি ফার্মেসিতে গিয়ে সায়মার কামড়ের স্থান ব্যান্ডেজ করে। পরে বাসায় গিয়ে কাপড় পরিবর্তন করে।
যেভাবে আবু রায়হান গ্রেফতার হয়: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (পশ্চিম) শেখ নাজমুল আলম জানান, চট্টগ্রাম পুলিশ ঘটনার পর রায়হানের বাবা, মা, তিন বন্ধু ও নিহত সায়মার বন্ধু মীর্জাকে আটক করে। তাদের দেয়া তথ্যে নিশ্চিত হওয়া যায় আবু রায়হান চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আত্মগোপন করেছে। এরপরই তিনি আবু রায়হানকে গ্রেফতারের জন্য এডিসি (পশ্চিম) সাইফুল ইসলাম ও এসি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন। ফকিরাপুলের একটি হোটেলে বয়ের দেয়া তথ্য ও হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি থেকে আবু রায়হানকে সনাক্ত করা হয়। পরে ঢাকার ফকিরাপুলের মুনস্টার হোটেল থেকে রাত ১১টায় আবু রায়হানকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গতকাল সকালে আবু রায়হানকে চট্টগ্রাম পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই চট্টগ্রাম থেকে হানিফ বাসযোগে ঢাকায় আসে। প্রথমে উঠে মালিবাগে তার এক বন্ধুর বাসায়। কিন্তু সেখানে নিরাপদ নয় ভেবে ঘন্টা দু’য়েক পর রাত ৮টার দিকে ফকিরাপুলের হোটেল আসরে ওঠে। কিন্তু সেখানে নিরাপদ নয় ভেবে আবারও হোটেল পরিবর্তন করে মুনস্টারে ওঠে।
চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি বাবুল আক্তার জানান, শহীদকে গ্রেফতার করার পর সেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। কিভাবে ঘটনাটি ঘটেছে তারও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে।
তিনি জানান, শহীদ জানিয়েছে, ২৩ মার্চ (রবিবার) সায়মাদের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঐদিন আর যাওয়া হয়নি। পরেরদিন সোমবার সকাল ৯টার দিকে তারা দু’জন সিএনজি অটোরিকশায় করে সায়মাদের বাসায় যায়। তারা কিছু সময় বাসার নিচে অপেক্ষা করে। পরে সায়মার বাবা ও ভাই বাসা থেকে বের হবার পর তারা কলিং বেল চাপে। তিনি জানান, শহীদের রক্তমাখা ছোরা, লুঙ্গি (ড্রেন থেকে) উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি যে দোকান থেকে তারা ছুরি কিনেছিল ও যেখান থেকে রায়হান হাতে ব্যান্ডেজ করেছিল ঐ ফার্মেসির মালিককে আটক করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গ্রেফতারকৃতদের আজ রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।
গ্রেফতারকৃত আবু রায়হানের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মহিষাদী। তার পিতা এএসআই (সশস্ত্র) আবুল বাশার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইনে কর্মরত।
শহীদের গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপ। পিতা বাবুল মিয়া। সে চট্টগ্রামের ক্রাউন রেসিডেন্স রেস্ট হাউজের মালিকের প্রাইভেটকার চালক।
