আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর নছীহত বাণী

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৪, ২০:০৩
বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর বাণীসমূহ, বক্তৃতা, যেমন অমূল্য ও শিক্ষায় ভরপুর, তেমনি তাঁর অমূল্য রচনাবলীও দুর্লভ শিক্ষা ও সম্পদে পরিপূর্ণ। তাঁর সেই অমূল্য বক্তৃতাসমূহের অংশ বিশেষ এখানে উল্লেখ করলাম। ই’লমে শরীয়ত :একদল অজ্ঞ, মূর্খ এবং ভণ্ডপীর, ভণ্ডদরবেশ বলে বেড়ায় যে, ই’লমে শরীয়ত এবং ই’লমে তরীকত দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। এর একটির সাথে অন্যটির কোন সম্পর্ক নেই। এমন কি এরা মনে করে পরস্পরের সম্পর্কের কোন প্রয়োজনও নেই। তারা শরীয়তের প্রয়োজনীয়তার ওপর তেমন গুরুত্ব দেয় না। শরীয়তকে তারা সব সময় অবজ্ঞা করে চলে। বলে বেড়ায়, আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভের জন্য একমাত্র উপায় ই’লমে তরীকতের অনুসারী হওয়া। তাদের প্রচারের ভাব-ভঙ্গিতে সাধারণ লোক মনে করে যে, তারা না জানি ই’লমে তরীকত সম্পর্কে কত বিজ্ঞ। মূলত এরা সে সম্পর্কে কোনই জ্ঞান রাখে না। তাদের এ কথা যে তাদের অজ্ঞতা ও মূর্খতা বৈ কিছুই নয়, তা সূফীকুল শিরোমনি হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর উক্তি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। তিনি বলেন যে, তোমরা সর্বাগ্রে ই’লমে শরীয়ত হাসিল কর, অতঃপর নির্জনতা অবলম্বন কর। কারণ যে ব্যক্তি ই’লম হাসেল না করে ই’বাদতে মগ্ন হয়, সে যে সাফল্য লাভ করতে পারে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। প্রায় ক্ষেত্রেই এরূপ লোকের ই’বাদাত বিনষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং অগ্রে শরীয়তের দীপ-শিখা প্রজ্বলিত কর এবং তত্পর আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভের জন্য বেশি পরিমাণে যিকির-আযকারের দিকে মনোযোগী হও। যে ব্যক্তি ই’লমে শরীয়ত অনুযায়ী আমল করেন, আল্লাহ তাঁর ই’লম বৃদ্ধি করে দেন এবং তাঁকে শিক্ষক ও কিতাবপত্র ছাড়াই আপনা হতে ই’লম দান করেন। ইলমে মা’রেফাত :ই’লমে মা’রিফাত ই’লমে শরীয়তেরই একটি অংশবিশেষ। শরীয়ত থেকে পৃথক করে ই’লমে মা’রিফাতের কোন অস্তিত্ব মিলবে না। মনে রাখতে হবে তাসাউফ, মা’রিফাত, বেলায়েত, সুলুক, ই’লমে তরীকত, ফকীরী ও দরবেশী প্রভৃতি নামগুলো তরীকতের নামান্তর এবং এর প্রত্যেকটিরই এক ও অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। অতীব দুঃখের বিষয়, একদল মূর্খ, প্রতারক, ধোঁকাবাজ, সর্বসাধারণকে এই বলে প্রতারিত করছে যে, তরীকত অর্থাত্ ফকীরী-দরবেশী কুরআন হাদীছের বিষয় নয়। কাজেই এ সম্পর্কে কুরআন শরীফে উল্লেখ নেই; বরং এই বিষয়টি ছিনা-ব-ছিনা অর্থাত্ একজনের বক্ষ হতে অন্য জনের বক্ষে চলে এসেছে। আবার কেউ কেউ মনে করে গোপন বিষয় বলতে পারা, কারামাত প্রদর্শন করা, লতীফা নড়াচড়া করা প্রভৃতি ব্যাপারগুলোই মা’রেফাতের পরিচয়। আসলে উল্লিখিত সকল দলই ভ্রান্ত। মূলত মা’রেফাত হাছীলের নির্দেশ শরীয়তেই বিদ্যমান এবং এটা কুরআন ও হাদীছ থেকেই শিক্ষা করতে হয়। যেমন পবিত্র কালামে উদ্ধৃত হয়েছে। “আ’লা ইন্না আওলিয়া-আল্লাহি লা খাওফুন আ’লাইহিম অ-লাহুম ইয়াহযানূন। আল্লাযীনা আ-মানূ অ-কা-নূ ইয়াত্তাক্বনা লাহুমুল বুশরা ফিল হাইয়াতিদ্দুনইয়া অ-ফিল আ-খিরাতি লা-তাবদীলা লি কালিমাতিল্লা-হি যা-লিকা হুয়াল ফাওযুল আযীম।” অর্থাত্ জেনে রাখ, আল্লাহ্র অলীদের, নিশ্চয়ই কোন ভয় বা চিন্তা নেই। যারা মোমিন এবং ধর্মভীরু (তাঁরাই আল্লাহ্র অলী) তাঁদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই সুসংবাদ। আল্লাহ্র বাক্য অপরিবর্তনীয়, ইহাই সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য। উল্লিখিত আয়াত দ্বারাই বেলায়েত বা তরীকত হাছীল হয়ে থাকে তার প্রথমটি ঈমান এবং দ্বিতীয়টি পরহেজগারী বা ধর্মভীরুতা; সুতরাং যার ঈমান যত মজবুত এবং আল্লাভীরুতা যত বেশী, তিনি তত বড় অলী। এ থেকে এও বোঝা যায় যে, তার একটি নিম্নতম পর্যায় আছে। তদানুসারে প্রত্যেক সাধারণ মোমিন মুসলমানই এ পর্যায়ের বেলায়েতের অধিকারী। অবশ্য প্রচলিত নিয়মে যারা উচ্চস্তরের বেলায়েত লাভ করে থাকেন, কেবল তাদেরকেই অলী বলা হয়ে থাকে। কালামে পাকের ঘোষণা অনুযায়ী বোঝা যাচ্ছে যে, বেলায়েত বা দরবেশীর জন্য উচ্চস্তরের ঈমান এবং ধর্মভীরুতা একান্ত আবশ্যক। এসব ক্ষেত্রে যারা শরীয়ত বিরোধী উক্তি করে এবং নামায-রোযার সাথে সম্পর্ক রাখে না, হারাম-হালাল পার্থক্য করে না এবং শরীয়ত বিরোধী বিভিন্ন কাজে লিপ্ত হয়, তারা কোনক্রমেই দরবেশ বা অলী হতে পারে না। হযরত বড়পীর (রহ.) পীর বা মুর্শিদের জন্য নিম্নোক্ত পাঁচটি গুণ থাকা অবশ্য কর্তব্য বলে বর্ণনা করেছেন। (১) শরীয়তে পরিপূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন আলেম হওয়া। (২) ই’লমে হাকীকত সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞান থাকা। (৩) সাক্ষাত্ প্রার্থীর সাথে স্নিগ্ধ ও মার্জিত ব্যবহার এবং প্রফুল্ল বদন ও সন্তুষ্টচিত্তে দর্শন দান করা। (৪) দীন-হীনদের সাথে কথায় ও কাজে নম্রতাপূর্ণ ব্যবহার করা। (৫) ভক্তবৃন্দের অন্তরের ব্যাধিসমূহ নির্ধারণপূর্বক তা দূরীকরণের উপায় সম্বন্ধে অভিজ্ঞ হওয়া। নিজেকে রিয়া, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, গর্ব-অহমিকা ইত্যাদি থেকে মুক্ত রাখা, কর্তব্যকর্মে শৈথিল্য এবং আরামপ্রিয়তা দূরীভূত করা। বড়পীর (রহ.)-কে একদা এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, ফকীর সম্পর্কে। জবাবে তিনি বললেনঃ “ফকীর” শব্দের “ফে” হরফ বলে যে, তুমি মহান আল্লাহর ইচ্ছার ওপরে নিজেকে ফানা করে দাও এবং আল্লাহ্ ব্যতীত যাবতীয় সৃষ্ট বিষয়বস্তু হতে হূদয়কে মুক্ত করে ফেল। “ক্কাফ” হরফ বলে যে, তোমার ক্বলবকে আল্লাহ-প্রেমের শক্তি দ্বারা মজবুত কর এবং তাঁর সন্তুষ্টিতেই সদাসর্বদা নিয়োজিত থাক। “ইয়া” বলে যে, প্রত্যাশা আল্লাহরই নিকট কর এবং তাঁরই। অবলম্বন এবং লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা প্রভৃতি হীন প্রবৃত্তি হতে নিজেকে মুক্ত করে আল্লাহ্র দিকে রুজু কর। অন্যত্র বলেছেন, পরিপূর্ণভাবে রাসূলে মকবুল (স.)-এর অনুসারী হও। তাঁর নসীহতসমূহ মেনে চল এবং সাবধানতার সাথে বেদায়াতসমূহ হতে মুক্ত থাক। ধৈর্যধারণ করাকে আপন অভ্যাসে পরিণত কর। জেনে রেখো, প্রত্যেক দুঃখের পর সুখ নিশ্চয়ই আসবে। বিপদাপদে আশা হারিয়ে ফেল না। আল্লাহ্র যিকিরে মশগুল থাক। পাপে লিপ্ত হয়ো না; বরং তওবা করে পাপরাশি ধৌত করে পবিত্র হয়ে যাও। আল্লাহ্র দরজায় সর্বদা পড়ে থাক। এ দরজা কখনো পরিত্যাগ করো না। তিনি অন্যত্র বলেছেন, তোমরা সর্বদা স্বীয় অন্তরের দুয়ারে পাহারায় রত থাক। আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী যে প্রবেশের অধিকার রাখে শুধু তাকেই প্রবেশ করতে দাও, যার প্রবেশাধিকার নেই তাকে প্রবেশ করতে দিয়ো না। হূদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধি করো না। নতুবা তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ্র সাথে ধর্ম-পথযাত্রীদের সম্পর্ক দৃঢ় হয়ে গেলে তার কিছু প্রভাব হূদয়ের মণিকোঠায় প্রতিফলিত হয়। এ অবস্থাকে হাল বলা হয়। এ হাল যখন উন্নত অবস্থায় পৌঁছে তখন তাকে মকাম বলে। এর ওপর নির্ভর করে মনে করো না যে, তা চিরস্থায়ী। কেননা স্বয়ং আল্লাহ তাআ’লা এরশাদ করেনঃ “কুল্লা ইয়াওমিন হুয়া ফী শা’ন। অর্থাত্ তিনি (আল্লাহ) প্রত্যহ নতুন নতুন শানে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন; সুতরাং হাল বা মকামেরও পরিবর্তন অবধারিত। তিনি অন্য এক জায়গায় বর্ণনা করেছেন, কারো সাথে বন্ধুত্ব করতে জলদি করো না; আবার কারো সাথে শত্রুতা বা ঘৃণা পোষণ করতেও বিধি-পথ অনুসরণ করো। কু-রিপুর খারাব প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে তোমরা কারো প্রতি কু-ধারণা পোষণ করো না। এরূপ করা পাপের কাজ। বড়পীর (রহ.) অন্যত্র বলেছেন, যারা আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় লাভে ব্যর্থ হয়েছে, কেবল এ ধরনের লোকেরাই আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট তাদের প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনায় মনোনিবেশ করে থাকে। হালাল রুযী অন্বেষণ করা ঈমানদারের নিদর্শন। ঈমানদার ব্যক্তি তকদীরের প্রতি নির্ভর করে চুপচাপ বসে থাকে না। —লেখক :ইসলামী গবেষক ও সাংবাদিক