মৃত্যু নিয়ে আত্মকথন

‘সরদার খুশবন্ত সিং আর নেই’

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৪, ২০:১২
৯৯ বছর বয়সে চলে গেলেন খ্যাতিমান গল্পকার, ঔপন্যাসিক, আইনবিদ ও সাংবাদিক খুশবন্ত সিং। তিনি ১৯১৫ সালে পাঞ্জাবের খুশাব জেলার হাদালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবিতার প্রতি তীব্র ভালোবাসা, লেখায় শক্তিশালী রসবোধ একই সাথে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র তাঁকে পাঠকের কাছে নিয়ে এসেছে। খুশবন্ত সিং-এর বিখ্যাত লেখাগুলোর মধ্যে আছে—‘ট্রেন টু পাকিস্তান’, ‘দিল্লি’, ‘দ্য মার্ক অব ভিসু অ্যান্ড আদার স্টোরি’, ‘দ্য হিস্টরি অব শিখ’, ‘দ্য ভয়েস অব গড অ্যান্ড আদার স্টোরি’। তাঁর প্রয়াণে ইত্তেফাক সাময়িকীর পক্ষ থেকে শোকাঞ্জলি মৃত্যু নিয়ে খুব কম কথাই হয় আমারদের বাসায়। আমি বিস্মিত যে কেন এটা হয়, যখন আমরা জানি যে মৃত্যু আসবেই, আঘাত হানবেই। এ অলঙ্ঘনীয়। যস যাগানা চ্যাঙ্গেজির কথায় : ‘ঈশ্বর নিয়ে সন্দেহ করতে পারো, কিন্তু মৃত্যুর নিশ্চয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ করতে পারো না।’ এই পঁচানব্বই বছরে পা দিয়ে আমি অবশ্যই মৃত্যু নিয়ে ভাবি। যদিও আমি খুব কমই ভাবি এ নিয়ে, এজন্যে ঘুম বরবাদ করি না। যারা চলে যায়, আমি তাদের নিয়ে ভাবি, তারা কোথায় যায়? তারা কোথায় যাবে? —এর উত্তর জানা নেই। আমি জানি না, আপনি কোথায় যাবেন, একটু পরেই কী ঘটবে? ওমর খৈয়াম বলেন : ‘মহাবিশ্বের ভেতর, কেন জানা হয় না, কোথায় পানি উথাল-পাতাল করে’। বা ‘এক দরোজা ছিল, যার কোনো চাবি পাইনি, এখানেই এক পর্দা ছিল, যাকে আমি দেখতে পাইনি। আমার ও তোমার মধ্যে কিছু আলাপ, এরপর মনে হয়, তুমি আমি নেই’। একবার আমি দালাই লামাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মৃত্যুকে কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে? তিনি ধ্যানের পরামর্শ দিলেন। মৃত্যু নিয়ে আমি শঙ্কিত নই, আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। মৃত্যু অনতিক্রম্য। যখন এ নিয়ে আমাকে বেশি ভাবতে হয়, তখন আমি জড়সড় হই না, বরং প্রস্তুতি নিতে থাকি। যেমন আসাদুল্লাহ গালিব বলেন : ‘জীবন-পথে বয়সের ভ্রমণ, কে জানে কোথায় এটা থামবে; আমাদের হাতেও না পায়েও বাঁধন নেই।’ আমার সমকালীন এখানকার (ভারতের), পাকিস্তানের বা লন্ডনের—সবাই চলে গেছেন। আমি জানি না এক দুই বছরের মধ্যে আমি কোথায় থাকব। মৃতুকে আমি ভয় পাই না। আমি ভীত বার্ধ্যকের কারণে, আমি অন্ধ বা অচল হয়ে যেতে পারি—এ কারণে ভয়ে থাকি। এই অবস্থা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরণ ভালো। আমি এখনই আমার কন্যা মালার জন্যে বোঝা, তার জন্যে আরো বাড়তি বোঝা হতে চাই না। সব মিলিয়ে আমি আশা করি, মরণ যখন আসবে, এটা খুব দ্রুতই আসবে, অনেক বেশি ব্যথা নিয়ে আসবে না। যেন গভীর ঘুমের অতলে হারিয়ে যাওয়া। ততক্ষণ পর্যন্ত যেন কাজ করতে পারি, বাঁচতে পারি, যেহেতু এটি আসবেই। এখনো অনেক কিছু করার বাকি। ইকবালের লাইনগুলো বলে আমি নিজেকে আশ্বস্ত করি : ‘কেন তুমি আমাকে এই স্বর্গের বাগান থেকে বের করে দিতে চাও, আমার তো অনেক কাজ বাকি, এখন করো অপেক্ষা।’ প্রায়ই আমি বাদে মিয়ানের কথা বলি, যে অপেক্ষা করে আছে, আমার এখনো শেষ করার জন্যে কাজ বাকি আছে। টেনিসনের এই লাইনগুলো আমি খুব বিশ্বাস করি : সূর্যাস্ত ও সন্ধ্যাতারা, এবং আমার জন্যে একটি শান্ত ডাক, হয়তো বারে কোনো সাড়া নেই, যখন সমুদ্র থেকে ফিরি, গোধূলি এবং সন্ধ্যার ঘণ্টা, হয়তো এখানে কোনো দুঃখ বা বিদায় নেই, যখন আমি যাত্রা করি।’ আমি জৈন দর্শনে বিশ্বাস করি যেখানে মৃত্যুকে উদ্যাপনের জন্য বলা হয়েছে, প্রথম দিকে আমি বিষণ্ন থাকতাম, এরপর আমি শ্মশান চত্বরে যাওয়া শুরু করি। এর মারাত্মক ফল পাই; এটি থেরাপির মতো কাজ করে। কয়েক বছর আগে আমি আমার এপিটাফ লিখে রাখি (হুবহু ইংরেজি তুলে দেওয়া হলো) : ‘Here lies one who spared neither man nor God/ Waste not your tears on him, he was a sod/ Writing nasty things he regarded as great fun/ Thank the Lord he is dead, this son of a gun.’ এমনি বিশের ঘরে বয়স থাকতেই ১৯৩৪ সালে, আমি আমার ‘মৃত্যু-সংবাদ’ লিখে রেখেছিলাম। পরবর্তীকালে, আমার ছোটগল্পের সংকলন ‘পোস্টহিউমাস’-এ স্থান পায়। এই লেখায়, আমি কল্পনা করেছিলাম, ‘দি ট্রিবিউন’ পত্রিকা প্রথম পাতায় একটি ছোট্ট ছবিসহ আমার মৃত্যুসংবাদ প্রচার করছে। শিরোনাম হবে : ‘সরদার খুশবন্ত সিং আর নেই’ এবং নিচে ছোট্ট করে লেখা রয়েছে : ‘আমারা গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, গত সন্ধ্যা ছয় ঘটিকায় সরদার খুশবন্ত সিং আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। তিনি যুবতী স্ত্রী, নাবালক দুই সন্তান ছাড়াও অসংখ্য বন্ধু-গুণগ্রাহী রেখে গিয়েছেন। বিদেহী সরদারের বাসভবনে উপস্থিতদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত সচিব, কয়েকজন মন্ত্রী এবং উচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারক।’ মৃত্যু আমাকে নাড়া দেয় যখন আমার স্ত্রী মারা যায়। অজ্ঞেয়বাদী হওয়াতে আমি ধর্মীয় কৃত্যগুলোতে কোনো স্বস্তি খুঁজে পাই না। নৈঃসঙ্গবাদী হওয়াতে আমি বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনদের নিরুত্সাহিত করেছি আমাকে সমবেদনা জানাতে আসার জন্য। প্রথম রাত্রি আমি একা অন্ধকার ঘরে আমার চেয়ারে বসে পার করি। এই সময়, আমি ভেঙে পড়েছিলাম, কিন্তু খুব দ্রুতই আমি নিজেকে সামলে নিই। দুইদিন বাদেই, আমি দৈনন্দিন কর্মে ফিরে যাই। সকাল-সন্ধ্যা কাজ করতে থাকি। এটা আমার মনকে একটি শূন্য বাসায় একা থাকার জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিল। যখন বন্ধুরা আমাকে ক্রমাগত ডাকতে থাকে আমি তখন গুটিয়ে গোয়ায় চলে যাই, নিজেকে নিজের করার জন্যে। আমি সমাধিস্থ হতে আগ্রহী, কারণ সমাধিস্থ হওয়ার মাধ্যমেই পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব যা পৃথিবী থেকে আপনি নিয়েছেন। এখন তো বিদ্যুত্চালিত শ্মশান। আমি বাহাই বিশ্বাসীদের শেষকৃত্য আয়োজকদের বলেছিলাম আমাকে সমাধিস্থ করার জন্যে। তারা রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু নানা শর্ত-নিয়ম-নীতি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। আমি একটি পাকুর বৃক্ষের নিচে কোনার দিকে শায়িত হতে চাই। এই বলার পর, কর্তৃপক্ষ আমাকে জানাল যে, তাদের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। কবরস্থানের মাঝখানে জায়গা দেওয়া সম্ভব। ফলে বনিবনা হলো না। আমি জানি, মৃত্যুর পর এটা কোনো বিষয়ই না। তবু আমি চেয়েছিলাম এক কোনায় শেষশয্যা নিতে। তারা পরে বলেছিল, কিছু প্রার্থনার করতে, যে কারণে আমি রাজি হতে পারিনি। কারণ, আমি ধর্মে বিশ্বাস করি না বা কোনো ধরনের ধর্মীয় কৃত্যেও আস্থা নেই। যদি এখনো আমি পুরোপুরি সবল তবুও জানি আমার বেশি বাকি নেই। আমি মৃত্যুকে বুঝতে যাচ্ছি, প্রস্তুতি নিচ্ছি। যখন থেকে আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই, শেষবিচারের দিনেও বিশ্বাস নেই, এমনকি, জন্মান্তরবাদেও। একটি সম্পূর্ণ ফুলস্টপে বিশ্বাস করতে হবে। আমি মৃত্যুকে পাত্তা না দেওয়ার জন্য সমালোচিত, কিন্তু মৃত্যু তো কোনো ব্যক্তিকে শুদ্ধ করতে পারে না, এবং যদি কোনো ব্যক্তি ধরা পড়ে, সে দুর্নীতিবাজ ছিল, আমি এ নিয়ে লিখব, এমনকি তার মৃত্যুর পরও। আমি পুনর্জন্মে বা জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করি না; বিশ্বাস করি না শেষ বিচারের দিনে, স্বর্গ-নরকে। আমি মৃত্যুর সমাপ্তিসূচকতাকে গ্রহণ করেছি। আমরা জানি না, মৃত্যুর পর আমাদের কী ঘটে, কিন্তু এটা ঠিক যে, এটা একজনকে শান্তির দিকে যাত্রায় সহায়তা করে—এই শান্তি নিজের, নিজেকে ও পৃথিবীকে নিয়ে। (আত্মকথনটি পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত Absolute Khushwant: The Low-Down on Life, Death & Most Things In-Between গ্রন্থ থেকে নেয়া।)