১৯৫৯ সালে তিনি প্রথম সত্যজিত্ রায়ের পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দর্শক সমাদৃত হলো ফেলুদা। তিনি সত্যজিত্ রায়ের পরিচালনায় ‘সোনার কেল্লা’ এবং ‘জয় বাবাফেলুনাথ’ ছবিতে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শক হূদয়ে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছেন। সিনেমা ছাড়াও তিনি বহু নাটক, যাত্রা এবং টেলিভিশনের ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। আর মঞ্চনাটকেও ছিল তাঁর পদচারণা। অভিনয় ছাড়াও নাটক ও কবিতা লিখেছেন অনেক। তিনি একজন উঁচু দরের আবৃত্তিকার। কিংবদন্তি অভিনেতা, এই পরিচয়টির পাশেই স্বতন্ত্র আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর কবি পরিচয়।
একজন বাঙালি হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটাই বিলিয়ে দিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য। তিনি তাঁর রক্ত মাংসে চলচ্চিত্রকে ধারণ করেছেন একজন সত্যিকারের শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে। তিনি সত্যজিত্ রায়ের ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেন। সত্যজিত্ রায় নির্মিত বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে আবির্ভূত হন। জনশ্রুতি আছে যে, তাঁর অভিনীত কিছু কিছু চরিত্র দেখে ধারণা করা হয় যে তাঁকে মাথায় রেখেই গল্প বা চিত্রনাট্যগুলো তৈরি করা হয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় হলো ফেলুদা। প্রথমে ফেলুদা চরিত্রে তাঁর চেয়েও ভালো কাউকে নেয়ার ইচ্ছে থাকলেও তাঁর অভিনীত ফেলুদার প্রথম ছবি ‘সোনার কেল্লা’ রিলিজ হওয়ার পর সত্যজিত্ রায় অকপটে স্বীকার করেন যে, তাঁর চেয়ে (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) ভালো আর কেউ ছবিটি করতে পারতেন না।
শুধু অভিনয় নয়, এমনকি আবৃত্তি কিংবা লেখালেখি নয়; গত পাঁচ দশক ধরে নিরন্তর ছবিও এঁকে চলেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সেসব পেইন্টিং, স্কেচ-এর প্রদর্শনী হয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসে।
পদ্মভূষণ, সঙ্গীত নাটক একাডেমি, দাদা সাহেব ফালকেসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত এই কিংবদন্তি অভিনেতার অতি সামপ্রতিক কালে ‘রাজা লিয়ার’-এর নাম ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় সকল মহলে সমাদৃত হয়। কাজের ফাঁকে কবিতা রচনা করছেন নিয়মিত।
প্রশ্ন : গত ১৯ জানুয়ারি তো আপনি আশি বছর পূর্ণ করলেন। আমাদের দৃষ্টিতে আপনি এখনো চিরসবুজ। এই চিরসবুজের মতো বিষয়টা আপনি কীভাবে ধরে রাখলেন?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : দেখুন, আশি বছর আমার এখনো পূর্ণ হয়নি। সবেমাত্র ঊনআশিতম জন্মদিবস পালন করে আমি আশিতে পা দিলাম। বাইরে থেকে হয়তো লোকেরা চির সবুজ ভাবে, কিন্তু আসলে তো কেউ চির সবুজ থাকে না। বিশেষ করে চিরসবুজ থাকার জন্য মানুুষের মাঝে যে ইচ্ছে জন্মায় সেটা হয়তো একটি হতে পারে যে, আমি এখনো কর্মক্ষম আছি কিংবা কাজে ব্যস্ত আছি। এখনো নাটক করছি, নাটক লিখছি। এখনো প্রতি বছর বেশ কয়েকটা ছবিতে অভিনয় করি, কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানে নিয়মিত ডাকা হয় এবং আমি তাতে অংশগ্রহণ করি। হয়তো সেজন্যই লোকে ভাবছে যে সমান তালে ঘোড়া ছুটছে। আর অসুখ বিসুখ কিছুটা তো আছেই, সেগুলো নিয়েই তো জীবনটা চলছে। ২০০৭-এ আমি একটু অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে অনেকটাই ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে চলতে হয়।
প্রশ্ন : আপনাার দৃষ্টিতে আপনার দীর্ঘ বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্র-জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ছবি কোনটি?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : এটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, কারণ আমি আমার বিচারক হতে পারি না।
প্রশ্ন : হালের চলচ্চিত্রাঙ্গণে একাল এবং সেকালের যে একটা পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি, যেমন অতীতের চলচ্চিত্রের মূল বিষয় ছিল অভিনয় এবং কাহিনি; অথচ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অভিনয় এবং কাহিনিকে পাশ কাটিয়ে মিউজিকের ওপর বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। অনেকটা এমনভাবে বলা যায় যে, মিউজিকের দাপটে হয়তো অভিনয়ের বিষয়টা গৌণ হয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়টা কি আপনাকে কষ্ট দেয়?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : না, কষ্ট পেয়ে তো কোনো লাভ নেই। চলচ্চিত্র একটা ইন্ডাস্ট্রি, সেখানে উত্থানপতন আছে। তবে বাংলা ছবির যে স্বর্ণযুগ সেটা আমরা পেরিয়ে এসেছি। সেই রকম পরিচালক এখন কেউ নেই। সত্যজিত্, ঋত্বিক, মৃণাল, তপন সিনহা, অজয় কর, এদের মাপের এখন কেউ নেই এখানে। কিন্তু কমবেশি চেষ্টা হয়তো করা হচ্ছে। মাঝখানে বাংলা চলচ্চিত্রের যে করুণ দশা হয়েছিল, যেমন—সুদূর মুম্বাই কিংবা দক্ষিণ ভারতের ছবিকে যেভাবে ফ্রেম টু ফ্রেম অনুকরণ করা হচ্ছিল সেটা থেকে একটু সরে এসেছে এবং আবার নিজের মতো করে কাহিনি তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সাহিত্যের কাছে এখনো বাংলা ছবি ফেরেনি। বাংলা ছবির মূল বিষয়টিই ছিল সাহিত্যে। সাহিত্যনির্ভর ছবি বলেই হয়তো মানুষের এত ভালো লাগত। ভালো লাগা ছাড়াও যারা ছবি করতেন তাদেরও কিছু বলার থাকত ছবির মাধ্যমে। এখন অন্তত একটা চেষ্টা শুরু হয়েছে।
প্রশ্ন : এবার একটা ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আপনি কি জানেন যে, বাংলাদেশে আপনার জনপ্রিয়তা পর্বতপরিমাণ?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : সেটা আমি মাঝে মধ্যে যখন বাংলাদেশে গিয়েছি, তার আঁচ আমি পেয়েছি। দেখেই বুঝতে পারি বাংলাদেশের মানুষ আমাকে কতটা ভালোবাসে। আমি বিভিন্ন সময় সেখানে গিয়ে যে আদর-সমাদর পেয়েছি তাতেই আমি উপলব্ধি করতে পারি যে বাংলাদেশে আমার অনেক আগ্রহী ভক্ত আছেন।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যদি আপনাকে অভিনয়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় তবে আপনি তা গ্রহণ করবেন কি না?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : আসলে এমনিতেই নীতিগতভাবে আমার তো কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এখন যেটা এসে গেছে তা হলো আমার শারীরিকভাবে অনেক বাধ্যবাধকতা এসে গেছে। শারীরিকভাবে ক্ষমতাও অনেক কমে গেছে। আমাকে কোথাও যেতে হলে সঙ্গে একজন স্কট নিয়ে যেতে হয়। পাশাপাশি খাবারের বাধ্যবাধকতা তো রয়েছেই। সেই দিক হিসাব করে আমি আমন্ত্রণটা রক্ষা করতে পারব কি না তা ভাবতে হয়। তবে আমন্ত্রণ পেলে এমনিতে নিশ্চয়ই আমার ভালো লাগবে।
প্রশ্ন : আমরা জানি যে আপনি শুধু চলচ্চিত্রেই নয়, পাশাপাশি নাটক, মঞ্চনাটক, এমনকি যাত্রা এবং পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন। আর আবৃত্তিতে আপনি অতুলনীয়। এসব বহুমাত্রিক বিষয়ে নিজেকে কিভাবে সম্পৃক্ত করলেন?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : যাত্রা আমি এক বছরই করেছিলাম। একসময় আমি মুখস্থ করে আবৃত্তি করেছি তবে এখন সামনে বই রাখি, তবে বইটা একটা সাপোর্ট হিসেবে রাখি। আমি খুব ছোটবেলা থেকেই কবিতা ভালোবাসি আর তা পড়তে পড়তে একসময় মুখস্থ হয়ে যায়। আমার কবিতার বইও অনেকগুলো আছে, তা সেটা বারো-তেরো তো হবেই। এখনো কবিতা লিখি, আবৃত্তি করি, অভিনয় করি, আর যা যা সারা জীবন করে এসেছি, এখনো তা-ই করছি। সত্যজিত্ রায়ের যে দান তা আমার নিজের অন্তরে ধারণ করে রেখেছি।
প্রশ্ন : বাংলাদেশে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় কলকাতার শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে বড় আকারে কভারেজ দেওয়া হয়। সেদিক বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রিকায় বাংলার শিল্প-সাহিত্যের তেমনটা কভারেজ দেওয়া হয় না। কেমন যেন একটা কৃপণতা। আরও স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাংলার সংস্কৃতিকে এক ধরনের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : সেটাতো আমরা অনেকদিন ধরেই লক্ষ করছি। খুব ভালো করে যদি লক্ষ করেন তবে দেখবেন যে, বাংলায় মুদ্রিত বড় বড় কাগজগুলো তাদের সাধারণ নিউজ কভারেজেই একদম দুর্বল। সেগুলোর কিছু কিছু হলুদ সাংবাদিকতাও বলা চলে। কোন চলচ্চিত্র তারকা কী করছেন তা নিয়েই ব্যস্ত। আপনি ভাবুন এমনও দিন আমি দেখেছি যে, কোনো একজন চিত্রতারকার মৃত্যুতে প্রায় সমস্ত কাগজটা জুড়েই তার কথা। আর পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে অথবা সেদিনই হয়তো কোথাও আত্মঘাতী বোমায় আশি জন মারা গেছেন সেসব খবর কোথাও কিছু নেই। সেদিক দিয়ে পশ্চিম বঙ্গের বাংলা কাগজ গুলোকে বলব খুবই দরিদ্র। এটা আসলে আমাদের ভাববার বিষয়।
