পিটার হানসেন আমেরিকার ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের একজন তরুণ। তার সুইডিশ বাবা আমেরিকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে এবং শেয়ার ব্যবসায় দারুণ সফলতা লাভ করে। একজন আমেরিকান তরুণ তার স্কুলজীবন থেকে শুরু করে কলেজ-জীবন ও বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে যা যা প্রত্যাশা করতে পারে, পিটার তার সব কিছুই পেয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ে তার পড়াশোনা শেষ করে সে বাবার ফার্মেই কাজ শুরু করে। তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারে, ব্যবসা তার জন্যে না। তার রোমঞ্চপ্রিয় মন ও অবারিত দিগন্তের প্রতি ছুটে বেড়ানো এবং মানুষের সেবা করার ব্রত ব্যবসা থেকে তাকে দূরে ঠেলে দিল। শেয়ার ব্যবসা ছেড়ে সে খ্রিস্ট ধমীর্য় কাজে মন দিল। ইলিনয় অঙ্গরাজ্য ছেড়ে সে ভারতে চলে আসল। তার মিশনারি তাকে পাঞ্জাবে শিখ ক্ষেতমজুরদের মধ্যে যিশুখ্রিস্টের নীতি গল্পগুলো প্রচার করার নির্দেশ দিল।
হানসেন মানচিত্র দেখে গ্রামের যে অংশটাতে যাবে সেখানে ছোট্ট একটা পতাকা ঠুকে রাখল। ইনডেক্স বের করে গ্রামের কোন লোকগুলোর সাথে দেখা করবে, তাদের নাম টুকে রাখল। তাদের বিষয়ে যতটুকু সম্ভব বিস্তারিত লিখে রাখার চেষ্টা করল। আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটা পুরাতন মোটর সাইকেলে করে সে গ্রামে ঘুরতে লাগল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পাদ্রি হানসেন ও তার ভটভটি সেই অঞ্চলে বেশ পরিচিত হয়ে গেল।
হানসেন ছিল ধর্ম প্রচারক। কিন্তু সে একটু ব্যতিক্রম ছিল। সে ধর্ম প্রচার করার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়নি; বরং একধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত সংস্কার, নৈতিক সংস্কারের দিকে সে মনোযোগ দিয়েছিল। ধর্ম প্রচারে তার পদ্ধতিটাও ছিল ব্যতিক্রম। সে ব্যক্তিগত সাক্ষােক প্রাধান্য দিত।
‘তুমি যদি তাদের বিষয়ে জানতে চাও তাহলে তাদের মতোই সবকিছু তাদেরকে করতে দাও।’ হানসেন প্রায়ই বলত।
দৈবক্রমে হানসেনের সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। আমার হূদয়েও মানবিকতা ছিল, যদিও মুখের কথা ছাড়া আমি তেমন কিছুই করিনি। আমি ধার্মিক ছিলাম না, মার্কসবাদ ছিল আমার আদর্শ। তবে এইসব হানসেনকে তেমন বিরক্ত করেনি। সমাজতন্ত্রের প্রতি তার মধ্যেও কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আমি যেসব জায়গায় বিভিন্ন বৈঠকে তাকে যেতে বলতাম, সে প্রায়ই ওই জায়গাগুলোতে যেত।
‘বিপ্লবের জন্য দেশটা মুখিয়ে আছে। এখন সামনে এগিয়ে যাবার জন্য দরকার পরিপূর্ণ নেতৃত্ব। গ্রামের এই সব লোকজন সহজে বুঝবে না। তবে আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবেই তাদের সাথে যোগাযোগ করে সেটা করতে হবে। পুলিশি নির্যাতন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আর এই সবকিছুর বাইরে এই মানুষগুলোকে ভালোভাবে জানতে হবে, আপনি যখন তাদেরকে ভালোভাবে জানতে পারবেন তখন তাদেরকে দিয়ে যেকোনো কিছু করিয়ে নিতে পারবেন।’
হানসেন আর আমি একসাথে কাজ করার জন্য হাত মেলালাম।
মে মাসের এক গরম সকালে আমাদের পরিকল্পনার একটা মহড়া দিতে চাইলাম। হানসেন তার পর্যটকের পোশাক পরল, পায়ে সেন্ডেল, আর আমি একটা খদ্দর পরে হানসেনের মোটরবাইকে বসলাম।
অমৃতসার গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম।
শহর থেকে পনেরো মাইল দূরে রাস্তার ডান পাশ দিয়ে একটা খাল বয়ে গেছে। আমরা সেতু পার হয়ে মহিষের গাড়ি টানার এবড়োথেবড়ো রাস্তায় উঠলাম। রাস্তার মাটিতে মহিষের গাড়ির চাকার দাগ পড়ে আছে। হানসেন রাস্তার ভাঙা অংশগুলো তেমন লক্ষ করছিল না। ফলে, একবার দুজনেরই কিছুটা অসাবধানতায় আমি বাইক থেকে পড়ে গেলাম। হানসেন আমাকে টেনে তুলল, তারপর টুথপেস্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপনের মতো দাঁত কেলিয়ে হাসতে থাকল।
হাসতে হাসতে সে মোটরসাইকেলটা খালের পাশে গাছের নিচের নিয়ে রাখল। সে তখনো হাসছিল। আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসগুলো গুছিয়ে নিলাম। শুকনো গলায় পানি ঢাললাম। তারপর সেই গাছের নিচে আরাম করে বসলাম।
সেখান থেকে আমাদের গন্তব্য সূর্যাপুর গ্রাম দূরে গাছের সারির ভিড়ের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল। মাঝে বিস্তীর্ণ গমের ক্ষেত। গম পেকে গেছে। যেকোনো সময় শস্য কাটা শুরু হয়ে যাবে। সোনালি ফসলের ক্ষেত থেকে মিষ্টি একটা বাতাস ভেসে আসছিল। গাছের নিচে রাখাল আর গরু দুজনেই শুয়ে আছে। গ্রীষ্মের দুপুরে পাঞ্জাবের গ্রামের খুব স্বাভাবিক সুন্দর একটি দৃশ্য।
বিপ্লবের জন্য চিন্তা করার অত্যন্ত শান্ত পরিবেশ। আমার ইচ্ছে করছিল সূর্যাপুরকে তার এই অবস্থায় রেখেই চলে যাই। কিন্তু হানসেন নাছোড়বান্দা। আমি শান্তিতে যখন চোখ বুজে ছিলাম তখনও সে হরবরিয়ে কথা বলেই যাচ্ছিল।
‘সবশেষ আমি যখন এই গ্রামে এসেছিলাম তখন এখানে সমস্যা হয়েছিল। শিখরা তখন খ্রিস্টানদেরকে তাদের মন্দিরে ঢুকতে দিচ্ছিল না। কারণ খ্রিস্টানরা হলো সুইপার, ডোম এবং ওরা মৃত মহিষের চামড়া ছাড়ায়।’
তার কথা শুনে আমি বেশ নরমভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও তা-ই নাকি? তারপর কী হলো?’
‘আমি খ্রিস্টানদের বললাম, তোমরা শিখদের কাছে যাও আর তাদের গিয়ে বলো যে, যদি আমাদেরকে মন্দিরের ভেতর ঢুকতে দেয়, তাহলে আমরা মৃত মহিষের চামড়া সরিয়ে দিব।
ঠিক সেই সময়ে কাছেই কোথাও একটা মহিষ মারা গিয়েছিল। কেউ সেটাকে স্পর্শ করতে চাচ্ছিল না। মহিষটা যেখানে মারা গিয়েছিল সেখানে প্রচুর পরিমাণে শকুন ও কাক ছিল। আমার সাথের শিখ মুলা সিংকে বললাম, তুমি গ্রামের মুরুব্বি শিখদের গিয়ে বলো, আমরা মহিষটা পরিষ্কার করে দিব যদি আমাদেরকে মন্দিরের ভেতর ঢুকতে দেয়। তারা আমাদের কথায় রাজি হলো। খ্রিস্টানরা এখন বিশ কি ত্রিশ রুপিতে মৃত মহিষের চামড়া খুলে দেয়। আবার মন্দিরেও ঢুকতে পারে। এই সবকিছুই মুলা সিংয়ের জন্য হয়েছিল। ব্যক্তিগত যোগাযোগ খুব কার্যকরি বিষয়। মুলা সিংও খুব ভালো লোক ছিল। চলো উঠি, আমাদেরকে যেতে হবে।’
আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। দেখলাম, এই অঞ্চলটাতে হানসেন বেশ জনপ্রিয়। যেই হানসনকে দেখছে, উঠে এসে তার বিষয়ে জিজ্ঞেস করছে। সেও দেখলাম সকলের নাম মুখস্থ করে রেখেছে। গ্রামের রীতি অনুযায়ী বুকের কাছে হাত এনে সে সকলের সাথে কথা বলছে। লক্ষ করলাম, কেউ আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
আমি আর হানসেন মোটরসাইকেলটাকে টানতে টানতে সরু একটা রাস্তা দিয়ে গ্রামের মধ্যে চলে আসলাম। একটা বেষ্টনীর পাশে মোটরসাইকেলটা রেখে আমরা মুলা সিং-এর বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। মুলা সিং-কে আমরা বেশ অপ্রস্তুত অবস্থায় পেলাম। তার বাড়িতে ঢুকে দেখি, মুলা সিং-এর দুজন স্ত্রী বাড়ির বেষ্টনীর পাশে বসে আছে। একজন আরেকজনের মাথায় তেল মাখছে। আমাদের পাশে গ্রামের লোকজনের বেশ একটা জটলা ছিল। হঠাত্ করেই জটলাটা শান্ত হয়ে আসল। দেখলাম, দীর্ঘ দেহের মুলা সিং বের হয়ে আসছে। মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত নামানো। তার বয়স হবে ষাট। কিন্তু চোখে মুখে এখনো তারুণ্যের ঝিলিক।
হাত বাড়িয়ে সে হানসেনকে বন্ধুত্বসুলভ বুকে জড়িয়ে ধরল। এর মধ্যেই হানসেন আমার নাম বললে মুলা সিং এক হাত দিয়ে হানসেনকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে আমাকে ধরল। মুলা সিং মদে চুর হয়ে আছে। তার মুখ থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। দাড়ি দিয়ে মদের ফোঁটা পড়ে হানসেনের বাদামি চুল ভিজে যাচ্ছিল। হানসেন সরে যাওয়ার চেষ্টা করল।
তখন হিন্দুস্তানি ভাষায় মুলা সিং বলল, ‘বহুত শারাব বহুত শারাব।’
তারপর নিজের কানদুটো হাত দিয়ে ধরে বলল, ‘সাহেব, আর কখনো এমনটা করব না। তওবা তওবা। আপনি আমার বাড়িতে এসেছেন আর আমি বলদের মতো মদ খেয়েছি। আপনি যদি আমাকে এখন ক্ষমা করে দেন আর প্রতিজ্ঞা করেন যে, আমার বাড়িতে আবার আসবেন, তাহলে আমিও প্রতিজ্ঞা করছি আর কখনো আমি মদ স্পর্শ করব না।’
হানসেন তাকে ক্ষমা করে দিয়ে আবার আসার প্রতিজ্ঞা করল। আমরা কিছুটা হতাশ হয়ে মুলা সিং-এর বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলাম। বুঝতে পারলাম, আমাদের সংস্কারের সংগ্রাম কিছুটা হলেও বাধার মুখে পড়েছে। হানসেন তার রুমাল দিয়ে মাথার চুল মুছতে মুছতে মুলা সিংকে কিছুক্ষণ ধুয়ে দিল। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়টাকে হাত দিয়ে নেড়ে চলে যেতে বলল।
আমরা দুজনেই মিশনারি স্কুলের দিকে হাঁটা দিলাম।
খ্রিস্টানদের বসবাসের এলাকাতে ঢুকে বেশ খুশি হলাম আমরা। মিশনারি স্কুলের শিক্ষক মি. ইউসুফ মাসিহ আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। সুইপার মেয়ে আর শিশুরা আমাদের চারপাশে সালাম দিয়ে দাঁড়াল। হানসেন শিশুদের আদর করল। শিশুদের মায়ের সাথে হাত মেলাল।
শিখদের এলাকা থেকে অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন। গ্রামের প্রায় সবগুলো ঘরেই ছোট-বড় হিন্দুদের দেব-দেবীর ছবি সাজানো। হানসেন বিষয়টা লক্ষ করল। তবে তেমন কিছু বলল না।
আমরা সেখান থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে আমাদের গন্তব্য গ্রাম অমৃতসারের দিকে রওনা দিলাম।
আমরা অনেকটুকু রাস্তা কোনো কথা না বলেই পার হলাম। হানসেনকে কিছুটা হতাশ মনে হচ্ছে। গ্রামের কুয়োর পাশে আসার পর হানসেন কথা বলল।
‘অদ্ভুত একটা দেশ! তুমি বুঝতেই পারবে না কোত্থেকে শুরু করতে হবে। যখন তুমি শুরু করবে তখনও বুঝবে না আসলে তুমি ঠিক জায়গা থেকেই শুরু করেছ কি না। পথ চলতে চলতে মনে হবে তুমি অনেক জায়াগ পার করে চলে এসেছ। কিন্তু পেছন ফিরে আবার সামনে তাকাবে দেখবে ঠিক আগের জায়গাতেই আছ। এটা যেন মরুভুমিতে ছোট্ট একটা পানির ধারা শুরু হওয়ার মতো। পানির প্রবাহ শুরু হতে না হতেই শুকিয়ে যাচ্ছে, ফলে তুমি বুঝতেই পারছ না কোত্থেকে পানির ধারাটা আসছে।’
আমি কিছু বললাম না।
সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছে। সূর্যাপুর গ্রামের ফসলের মাথায় লাল একটা আভা।
‘শুধু মাত্র খ্রিস্টানধর্মই পারে তাদেরকে এই সব কুসংস্কার থেকে দূরে রাখতে। যদি তারা যদি... যদি...’ হঠাত্ করেই হানসেন তার কথা বন্ধ করে দিল। মনে হলো তাকে বিদ্যুত্ স্পর্শ করছে।
মুলা সিং-এর বাড়ির উঠোন থেকে ষোল বছরের একটা মেয়ে বের হয়ে আসল। তার মাথায় দুটো কলস। আমরা যে কুয়োটার পাশে বসেছিলাম সেদিকেই সে আসছিল। মেয়েটা যে জামা পরেছে তার বুকে কোনো বোতাম ছিল না। বুকটা ভি চিহ্নের মতো খোলা ছিল। মেয়েটার উত্তপ্ত বুকের আকৃতি বোঝা যাচ্ছিল। বেশ কয়েকবার মেয়েটা আমাদের সামনে দিয়েই কুয়ো থেকে পানি নিয়ে গেল।
হানসেনের চোখ আটকে গেল। মুখ খোলা। মনে হলো হানসেনের মন থেকে হতাশা দূর হয়ে সূর্যাপুর গ্রাম যেন তাকে পূর্ণিমার আলো দিয়ে মনকে প্রেমে ভরপুর করে দিয়েছে। মেয়েটা হাঁটতে হাঁটতে মুলা সিং-এর বাড়ির উঠোনে হারিয়ে গেল।
হানসেন যেন পৃথিবীতে ফিরে আসল।
‘ও খোদা, এ তো দারুণ! ও তো মুলা সিং-এর মেয়ে। তুমি বিশ্বাস করতে পারো? ওকে দেখে মনে হচ্ছে মরুভূমির ফুল। যে ফুলের ঘ্রাণ মনমাতানো। মরুভূমির এই ফুলটাকে নিয়ে আমি এখনই কবিতা লিখতে পারব।’
আমরা কুয়োটার পাশে দীর্ঘক্ষণ সুখি অনুভুতি নিয়ে বসে থাকলাম। হানসেন তার এই অনুভূতিটুকু কবিতায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকল।
অনেক সময় পর সে বলল, ‘আমি পেয়েছি।’
তারপর সে আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে আঙুল নেড়ে বলতে থাকল,
‘মেয়েটা যেন রাতের মতো সুন্দর করে হেঁটে যায়।’
