খুব ছোটবেলায় বই পড়তে শুরু করি। আর আমাদের পরিবারে রেওয়াজ ছিল কুষ্ঠি লেখার। বাবা কুষ্ঠিতে লিখলেন যে, আমি সাহিত্যিক হবো। আর আমি যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি, সেদিন থেকেই বাবাকে বলতে শুনেছি—কেন আমি লিখছি না? এই জিজ্ঞাসা বারবার আমাকে বইয়ের কাছে নিয়ে যায়। বলা যায়, বাবাই সুযোগ করে দেয় বইপড়ার। বাবা এক বিচিত্র ধরনের মানুষ। বাবা ছিলেন এক রহস্যপুরুষ! সরকারি চাকুরে সুদর্শন বাবা মাঝে মাঝে কোথায় চলে যেতেন, কেউ বলতে পারত না। একা একা চলে যেতেন, আমাদের কোনো খোঁজ-খবর রাখতেন না। বাবার জন্য কষ্ট হতো, থাকত জেদ। একদিন এসব অতৃপ্ত হাহাকারে আমি ৪র্থ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় প্রথম ছড়া লিখি; এবং পড়ি। ছন্দ জানতাম না। আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শিখেছি। পরে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে লেখা ছড়া বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পত্রিকা ‘শিশু’র প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়। পরের সংখ্যায় লিখি গল্প। খুব সুন্দরভাবে ছাপা হলে, আমি এতে অভিভূত হই।
কিছুদিন পর লেখার সাথে পড়তে শুরু করি—রূপকথার বই, পরীর ডানা, বোরাকের ডানা এসব। এই এক অলৌকিক জগত্। এই জগতের বইয়ের মধ্যে ‘ডানা’ বিষয়টি অত্যন্ত বেশি টানত। ভালো লাগত। আমি গভীর আগ্রহে পড়তাম। অদ্ভুত জগতের ডানা আমাকে আটকে রাখত।
’৭১ সালে আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পরিবেশ খুব পীড়া দিত মনে। মা-বাবাকে ছেড়ে ৯ মাস থাকতে হয়েছে। কষ্ট পেতাম খুব। শিখিয়েছে বেদনা কী? ফলে শৈশবে হয়ে যাই ‘স্নায়ুবাজ মানুষ’। অসহায় মানুষদের স্পর্শ করতে পারতাম। পড়ি ‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘পথের পাঁচালী’। ওয়ালীউল্লাহ্-র ‘চাঁদের অমাবস্যা’, মানিকের বিখ্যাত ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ আমার ভেতর একেবারে উল্টেপাল্টে দেয়। ভিন্নভাবে জানি জীবনকে। পরে আলেক্সান্দর বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’ পড়েছি। ‘দেবদাস’ বইটি পড়ে আমার খু্ব হাসি পেয়েছে। কারণ, আমি পথের পাঁচালী পড়ে দুঃখকে বুঝে ফেলেছি। মূল বিষয়টি আমার কাছে ধরা দিয়েছে। তাই দেবদাসের কাহিনি অতটা নাড়া দেয়নি। খুব সহজ বলে মনে হয়েছে!
জীবনে প্রচুর বই পড়েছি। সমৃদ্ধ করেছি মনকে। তবে বেছে বেছে বই পড়েছি। সামনে যা পেয়েছি, তা সব পড়িনি। সব পড়লে খাবারের মতো বদহজম হয় জেনে এড়িয়ে চলেছি। এখনো যে বইগুলো বারবার পড়তে ইচ্ছে করে—দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’, কাফকার ‘মেটামরফোসিস’, মার্কেজের ‘সরলা এরেনদিরা ও অন্যান্য গল্প’ এডগার এলানপোর ‘কালো বিড়াল’, রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’, জীবনান্দের ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’।
লিখছি গল্প, উপন্যাস। জনপ্রিয় পাক্ষিক ‘অন্যদিন’-এর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনার দায়িত্বে আছি ১৭ বছর ধরে। এছাড়া ঘরই আমার অফিস। একটি মাত্র মেয়ে নিয়ে ঘরই আমার পৃথিবী। ঘরই আমার সব।
বেশ কিছুদিন ধরে লিখতে পারছি না। ভেঙে গেছে বাঁ হাতের আঙুল। আর হাতই আমার লেখার অবলম্বন। কম্পিউটারে লেখার অভ্যাস নেই। তাই লিখতে না পারায় খুব ভালো নেই। যন্ত্রণায় আছি অনেকদিন ধরে। লিখতে পারলে ভালো লাগত। তবে কয়েকদিনের মধ্যে আঙুলের চিকিত্সার জন্য কলকাতায় যাচ্ছি। আশা করি ভালো হয়ে ফিরব এবং লিখব। এসে বড় ধরনের একটা উপন্যাস লিখার কথা ভাবছি।
গ্রন্থনা : ইমরান মাহফুজ
