রৌদ্রদগ্ধ কলকাতাকে পেছনে ফেলে কাচের হিমঘরে ঢুকে পড়লাম। নেতাজী সুভাষচন্দ্রবসু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। হাতে বেশ সময়। চেক ইন এবং ইমিগ্রেশন-এর কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে একটু পড়াশোনা করব। ঢাকায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কেটিং-এর এক্সাম। ভাস্ট সিলেবাস। ঢাকা মোম্বাই কোলকাতা। শুটিং-এর কাজে ব্যস্ত থাকায় কিছুই পড়া হয়নি, ফলে এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। জব করার পাশাপাশি লেখাপড়া করলে খুচরো সময়কে এভাবেই কাজে লাগাতে হয় । চেক ইন ডেস্কে গিয়ে দেখি, আমিই প্রথম পেছনেও কেউ নেই। ঝটপট শেষ করে ইমিগ্রেশনের দিকে পা বাড়াই। ইমিগ্রেশনেও তেমন ভিড় নেই। সব কাজ শেষ করে সামনে চোখ পড়ল—শূন্যতায় হাহাকারের মিছিল করছে অনেকগুলো নিঃসঙ্গ চেয়ার। একটিতে বসে ল্যাপটপ খুলে চোখ রাখলাম ক্লাস নোটের সফট কপিতে। শীতল ঘরের শিথিল সময়ের ডানায় চড়ে ই-মার্কেটিং-এর জটিল সব স্ট্র্যাটেজি বোঝার চেষ্টা করছি।
: এক্সকিউজ মি
শুনে চোখ তুলে তাকাতেই এক অপরূপ স্নিগ্ধ আগুনে ভস্মীভূত হলাম। কিন্নরী কণ্ঠে স্মার্ট টানা ইংরেজিতে বললেন,
: কিছু ভাববেন না। কোথায় থাকেন? কী করেন?
সরাসরি প্রশ্নটা শুনে মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করি, এরকম কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে? সবিনয়ে আবারও বললেন,
: আমি দুঃখিত। এভাবে কেউ কাউকে প্রশ্ন করে না। করা উচিত নয়। আমি একজনকে খুঁজছি দশ বছর ধরে। অবিকল, ঠিক আপনার মতো। এরকম বিন্যাসহীন বড় বড় চুল। এলোমেলো। এতদিনে মাথার চুল সাদা-কালো হয়েছে কি-না জানি না। দূর থেকে আপনাকে দেখে আমার বুকটা ছাঁত্ করে উঠল। এরকম কেউ কারোর মতো হয়? একদম ঠিকঠাক।
কাজল মাখা চোখ দিয়ে অবাধ্য জল বেরিয়ে গেল মেয়েটার। আঙুলের ডগা দিয়ে কিছু একটা লুকাতে চাইলেন। বললাম,
: আমি বাংলাদেশের, মানে ঢাকায় থাকি। কাজ করি টেলিভিশনে। প্রোডিউসার।
আমি শেষ করতেই একটু নিঃশাস টেনে মসৃণ বাংলায় বলে যেতে লাগলেন,
: আমি যাকে খুঁজি তার নাম অভিমন্যু ঝাওয়ার। আমি আমার মতো করে ডাকতাম অভি।
সরাসরি প্রশ্ন করি,
: সে কোথায়?
দীর্ঘশ্বাস টেনে বলল,
:সে আকাশের ঘুড়ি হয়ে উড়ে গেছে।
এরকম উত্তর শুনে একটু ধাক্কা খেলাম। মনে হলো কোনো কিছু নিয়ে চরম হতাশায় আছে। সেই ভাবে তার সাথে আলাপ করতে শুরু করি।
ওলের কাঁটায় সুয়েটার বুনার মতো স্বপ্ন বুনত দুই জন। একই সঙ্গে লেখাপড়া। কত যে ঝলসানো অনিঃশেষ সময়! স্মৃতি! যেন বিস্মরণের জলছাপ। সারাক্ষণ নিজের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকত, অদ্ভুত স্বভাবের। কবিতা লিখত, কিন্তু কোথাও ছাপতে দিত না। যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক, মাথায় কোনো কবিতা এলেই মোবাইল ফোনে মেয়েটাকে লিখতে বলত। পাতাভর্তি খাতার পর খাতা কবিতা লিখেছে দুই জনে। এখন এই কবিতাগুলোই তার সব। মাঝে মাঝে এই কাগজগুলোর সাথে কথা বলে। স্বজনে বিজন মানুষ। বড় একা। আমি থ হয়ে শুনছি। নিঃশ্বাসের কাছে জীবনকে বন্ধক রেখে ক্রমশই পাথরের মূর্তি হয়ে যাচ্ছি। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। কী করব ভাবতেও পারছিলাম না। এ সময়ে কী করা উচিত একটা মানুষের, জানি না। ঝকঝকে মৃত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। নির্নিমেষ। মূঢ়। নিজেকে নিজে সামলিয়ে নিয়ে আবারও দুঃখ প্রকাশ। মানুষের ভিড়ে প্রতিদিনই অভিমন্যুকে খোঁজেন। এ তার প্রিয় প্রাত্যহিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কয় বছরে দু-একজনকে এ রকম ভুল ভেবেছেন, কিন্তু সামলিয়েছেন সন্তর্পণে। আজকের মতো এরকম আউটব্রাস্ট কোনোদিন হয়নি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথা বলছেন আর নিজেকে লুকাতে চাইছেন। আমি দুঃখ প্রকাশ করলাম তার প্রেমাংশুর ভুল প্রতিকৃতি হয়ে তাকে কষ্ট দেবার জন্যে।
: আপনার দোষ কোথায়? আজ আমি খুব ইমোশনাল হয়ে গেছি।
তাকে অন্যদিকে নিতে চেয়ে পরিচয় জানতে চাইলাম। ভাঙা গলায় জানালেন, নাম মিশু লাহিড়ী। বিদেশ মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম—পৃথিবীতে এমন কি কিছু আছে যা ওর নেই? তবুও কেন হাহাকার বয়ে বেড়ায়? অভিমন্যুর সাথে একদিন ঝগড়া হয়েছিল মিশুর। অনেক রাগারাগি—এ তো সম্পর্কেরই একটি অংশ! তারপর থেকে লাপাত্তা। নেই। কোথাও নেই। আত্মীয়-স্বজন বন্ধুরা কেউ জানে না কোথায়? নিখোঁজ। কেটে গেছে দশটা বছর, এখনো ফেরেনি, তবে ফিরবে একদিন। হাসতে হাসতে গল্প শোনাতে চাইবে, মনে হবে গতকাল শুধু দেখা হয়নি। এরকম পাগল মিশু জীবনেও দেখেনি আর দেখতেও চায় না। আবারও মেয়েটার মুখের দিকে তাকালাম, মনে হলো এক মায়াবী পাথর। হঠাত্ করেই ম্যাচের শলার মতো জ্বলে উঠলেন মিশু লাহিড়ী।
: বুঝলেন! মাঝে মাঝে মাথাটা বিগড়ে যায়। ইচ্ছে করে অভিটাকে হাতের নাগালে পেলে থাপ্পর মেরে গাল ফাটিয়ে দিই। এত সময় কেউ অভিমান করে? রাগ করে? কী খায়? কেমন আছে? কোথায় আছে?
ধরে আসা গলায় বলতে থাকে। নিজস্ব নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে দুই পা পিছিয়ে যাই। মিশু হেসে উঠে বলে,
: আরে, আপনিও তো দেখছি আরেক পাগল । আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন?
আমি সহজ করার জন্যে বললাম
: পরিচয় যেভাবেই হোক তো হলো। ফোন নম্বরটা দেওয়া যাবে?
সরাসরি উত্তর,
: না। যাকে দেখে যন্ত্রণা বাড়ে, দহন হয় তার সঙ্গে কথা কেন? কিসের যোগাযোগ?
: অভি যদি ফিরে আসে, দুজন মিলে যোগাযোগ করবেন আমার সাথে।
মলিন হাসিতে মুখটা ফর্সা হয়ে উঠল ।
: আর কোনো দ্বিতীয় পাগলের পাল্ল¬ায় পড়বো না জীবনে।
যাক মেয়েটাকে হাসাতে পারলাম। খোলা জানালা ভেবে কেউ যদি আকাশ দেখতে চায়, আমার ক্ষতি কী? তাও তো ক্ষণিকের। হঠাত্ শুনলাম আমাকে কে যেন নাম ধরে ডাকছে গলা ফাটিয়ে। দেখি, এয়ার লাইনসের লোক। হাত বাড়িয়ে জানান দিলাম আমি। রেগে গেলেন খুউব।
: আরে মশাই! কী করেন আপনি? আপনার জন্যে ফ্ল্লাইট দাঁড়িয়ে আছে। এক্ষুনি ফ্লাই করবে, তাড়াতাড়ি চলুন তো।
মিশু লাহিড়ীর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর এগিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম, পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে মেয়েটা। এয়ারপোর্টের বোর্ডিং শেষ। আমার মাথায় ঘুরছে লাইট। ক্যামেরা। অ্যাকশন। আলো। অন্ধকার। মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি। এখনো অপেক্ষা। ১০ বছর। যে শিশুর জন্ম ১০ বছর আগে তার জন্যে পুরো জীবন। অভি কি বেঁচে আছে? যদি না থাকে তবুও অপেক্ষা মেয়েটার? পৃথিবীর সব পাল্টে গেলেও ভালোবাসা পাল্টায় না। হাঁটতে হাঁটতে রানওয়েতে এসে দাঁড়ালাম শাটল বাসে উঠতে হবে। আকাশে চোখ পাতলাম, দেখি কোনো ঘুড়ি দেখা যায় কিনা? দৃষ্টির জাল আরও দূরে মেলে দিলাম। কোনো কালো দাগ? না নেই। কোথায় আছে অভিমন্যু ঝাওয়ার? বিমানে চড়তে চড়তে কতবার যে মেঘের রাজ্যে ঢুকে গেছি পাসপোর্টবিহীন। মেঘেদেরও চূড়া আছে। ভূতলে বসে মিশু লাহিড়ী যে মেঘ দেখে সেই মেঘের চূড়ায় বসে তাহলে অভিমন্যু ঝাওয়ার অন্য আকাশের মেঘ খোঁজে? বিমানটা হা করে আছে আমাকে গিলে শূন্যে উড়াল দেবে বলে। কালো মেঘের দাপটে নীল আকাশ নিজেকে লুকিয়েছে। অঝোর ধারায় বৃষ্টি। রানওয়েতে বৃষ্টির পাথুরে শব্দ। অচিন এক শুভ্রতায় ভেসে গেছে চরাচর...
