সুচিত্রা সেন : উত্তরণ ও অন্তরাল
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ :সৈয়দ ইকবাল
প্রকাশক :নবযুগ প্রকাশনী
মূল্য :১৮০ টাকা
‘ওই মুখের জন্য ভেসেছে যুদ্ধ জাহাজ’! পঙিক্তর গভীরতা বোঝাতে স্বহস্তে একটি ব্যাখ্যা টেনেছেন অধ্যাপক থেকে সাংবাদিক বনে যাওয়া রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘ছবিতে আপনার ক্লোজআপের এমন আধিক্য। আপনার এই মুখের জন্য বাঙালির হূদয়সমুদ্রে ভেসেছে হাজার হাজার যুদ্ধজাহাজ, যেমন ভেসেছিল ট্রয়ের যুদ্ধে হেলেনের জন্য। ‘বিপাশা’ ছবির একটি দৃশ্যে শুধু আপনার চোখের ক্লোজআপ পর্দাজুড়ে! কোনোদিনও ভুলতে পারব?’ এ উক্তি শেষ পর্যন্ত পেয়েছে সর্বজনীন ভালোবাসা। ফলে গত হবার অল্প সময়ের ব্যবধানে দীর্ঘদিনের লিখিত সঞ্চয় বই আকারে রূপদান করেছেন। সুচিত্রা সেন : উত্তরণ ও অন্তরাল’ শীর্ষক উপন্যাসটি বাংলাদেশে নবযুগ প্রকাশনী ২০১৪ একুশে বইমেলায় প্রকাশ করে আমাদের সহযোদ্ধা হিসেবে কিছুটা হলেও ঋণী করেছে। আর বইটির ওপর আলোচনার জন্য উপযুক্ত সময় মনে হয়েছে ৬ এপ্রিল। ১৯৩১ সালের এদিনটিতে মহানয়িকার জন্মতিথি।
প্রচ্ছদে সুচিত্রা সেনের অন্তর্ভেদী চাহনির ক্লোজআপ লেখকের স্বহস্ত পঙিক্তর সার্থকতা দিয়েছেন শিল্পী সৈয়দ ইকবাল। ক্লোজআপে সুচিত্রার মোহনীয় সৌন্দর্য বোঝাতে সুচিত্রা-ধীরেন দেবের কথোপকথন বিশেষ দ্রষ্টব্য। ধীরেন, ‘আপনার ছবি তুলতে এতো ভালো লাগে কেন জানেন? আপনার চেহারায়, মুখের অ্যাঙ্গেলে রঙ অ্যাঙ্গেল বলে কিছু নেই। সব অ্যাঙ্গেলই রাইট অ্যাঙ্গেল’। ধীরেনের কথার সার্থক প্রমাণ মেলে উপন্যাসজুড়ে সুচিত্রার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের কিছু দুর্লভ ও সাহসী ফটো সংযোজনের মধ্যে।
গ্রন্থটিকে জীবনী ভেবে অনেকেই ভুল করেন। বরং জীবনস্মৃতি যে কত সুখপাঠ্য হতে পারে, উপন্যাসের স্বাদ দিতে পারে তার জ্বলন্ত প্রমাণ এই গ্রন্থ। এ ক্ষেত্রে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন তা এক কথায় অসাধারণ। সদ্যপ্রয়াত সুচিত্রা সেনকে নিয়ে তাঁর চিন্তাধারা আসলেই উত্সাহব্যঞ্জক।
উপন্যাসে লেখক মিসেস সেনের জন্মস্থান, তাঁর বেড়ে ওঠা, বিয়ে, সন্তান, আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ, বিমল রায়ের সঙ্গে আলাপ, রুপালি পর্দায় আগমন, অর্জন, সংক্ষিপ্তভাবে স্পর্শ করে গেছেন। সেখানে সুচিত্রা প্রসঙ্গে দেবদাস-এ দিলিপ কুমারের মন্তব্য, ‘হ্যাব কাম অ্যাক্রস ফর দ্য ফাস্ট টাইম অ্যান আইডিয়াল ব্লেন্ড অব বিউটি অ্যান্ড ব্রেনস’ কিংবা ‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ ছবিতে ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ চরিত্র দিয়ে পাহাড়ী স্যান্যালের ভবিষ্যদ্বাণী, ‘তুমি বিষ্ণুপ্রিয়া হয়ে উঠেছো সুচিত্রা। এ-ছবি তোমাকে চিরকালের নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেবে, তুমি দেখে নিয়ো।’ এগুলো পড়তে গেলে যেন মনে হয় ইতিপূর্বে কিছু ঘটেনি, চরিত্র বর্ণনাকে লেখক নিজগুণে বলে যাচ্ছেন, যা হয়ে উঠেছে সাক্ষাত্ চিত্রনাট্য!
গ্রন্থটিতে সুচিত্রার আভ্যন্তরীণ ও রহস্যঘেরা জীবনের ব্যক্তিত্ব নিয়ে যে ভাব-ব্যাঞ্জনা আর ভাষার রসায়নের ব্যবহার করেছেন তাতে রঞ্জন বাবু জীবনীকার হয়ে উঠেছেন। এতে কেউ তাঁকে অতিনাটকীয় অথবা সুচিত্রা সেনের সবচেয়ে কাছের সাংবাদিক গোপালকৃষ্ণ অপেক্ষা বেশি জানা ভাবতে পারেন। আদতে লেখক উপন্যাসের সার্থকতা দিতে গোপাল বাবুকে ফ্রেমে ফেলে কাজটি করেছেন। এটা করতে গিয়ে উপন্যাস অপেক্ষা চিত্রনাট্যের রূপ দিয়েছেন।
ছবিসহ ৯০ পৃষ্ঠার উপন্যাস মিসেস সেনের সবটাই নয়; চিরকালীন শ্রী রামকৃষ্ণে আত্মসমর্পিত ছায়ালোকের সুচিত্রারূপী রমা দাশগুপ্তের পিতৃভূম বাংলাদেশের দর্শক-পাঠক থেকে গেল আমৃত্যু উপেক্ষিত। এ অধ্যায়, রমা যেমন রহস্য রেখে অন্তরালে গেলেন, ঠিক তেমনি লেখকও তা এড়িয়ে গেলেন। এ উপেক্ষিত রহস্যের কারণে উপন্যাসের চিত্রনাট্যকে দুর্বল করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
