মেয়ের উত্ত্যক্তকারী ব্যক্তি খুনের ঘটনায় যশোর সদর উপজেলার দেয়ারা ইউনিয়নের ভেকুটিয়া গ্রামের গৃহবধূ খাদিজা বেগম (৪৫) নিজেকে হত্যাকারী ঘোষণা করে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও সরজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন তথ্য।
প্রসঙ্গত, গত ১২ মার্চ সন্ধ্যায় খাদিজার বাড়িতে গিয়ে তার ৯ম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়ে হাফিজাকে (১৪) উত্ত্যক্ত করার সময় মফিজুর রহমান মফি (৪৭) ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওইরাতেই পুলিশ খাদিজাকে তার বাড়ি থেকে ৫৪ ধারায় আটক করে।
হত্যা ঘটনার ৫ দিন পর মফির পিতা বাদি হয়ে খাদিজাসহ ৭ জনকে আসামি করে কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার পরপরই খাদিজার স্বামী কৃষক নূর ইসলাম, মামলার এক নম্বর আসামি এলাকার মেম্বার বদরুল ইসলাম বুদোসহ এলাকার অনেকেই গ্রামছাড়া হয়েছেন। গ্রেফতারকৃত একমাত্র আসামি হিসেবে গত ২২ মার্চ খাদিজা এই মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি আদালতকে বলেন, মেয়ের সম্ভম রক্ষায় তিনি মফিকে হত্যা করেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল ভেকুটিয়া গ্রামের শেখপাড়ায় গিয়ে জানা যায় ঘটনার ভিন্ন বিবরণ। ৩টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই প্রতিবেদকের কাছে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেন গ্রামবাসীরা। গ্রামবাসীদের ভাষ্যমতে, লম্পট প্রকৃতির মফি তপসীডাঙ্গা গ্রাম থেকে শেখপাড়ায় গিয়ে প্রায়ই হাফিজাকে উত্ত্যক্ত করতেন। সন্ধ্যার কিছুটা আগে বা পরে নানা ছুতোয় হাফিজাদের বাড়িতে প্রবেশ করতেন তিনি। এসময় ওই বাড়িতে ও এলাকায় পুরুষ মানুষ থাকে না। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছিল মফির এই অসভ্যপনা চর্চা। হাফিজার মা খাদিজা (সম্পর্কে মফির খালা শাশুড়ি) অনেকবার নিষেধ করেও মফিকে নিবৃত করতে পারেননি। অতিষ্ঠ হয়ে এক সময় তিনি গ্রামবাসী বিভিন্ন জনের কাছে এ ব্যাপারে সহযোগিতাও চান। এ বিষয়ে এলাকার নারীরা এগিয়ে গেলে মফি তাদের ভয়ভীতি দেখান এবং অস্ত্রও প্রদর্শন করে বলে অভিযোগ। গত ২৮ জানুয়ারি হাফিজার বাবা মো. নূরুল ইসলাম এ বিষয়ে যশোর কোতোয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরিও (নম্বর-১২২৯) করেন। কিন্তু পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ায় মফি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
গ্রামবাসীদের দেয়া তথ্যমতে, ১১ মার্চ সন্ধ্যায় মফি এই বলে খাদিজাকে শাসিয়ে যান যে, ২৪ ঘন্টার মধ্যে হাফিজাকে তার হাতে তুলে দিতে হবে। এসময় তিনি খাদিজাকে একথাও বলে যান যে, ‘মেয়েকে না দিতে পারলে তুই আমার সাথে যাবি।’ মফির এ হুমকিতে খাদিজা তাকে শায়েস্তা করার প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। ১২ মার্চ সন্ধ্যায় মফি হাসুয়া নিয়ে খাদিজার বাড়ির কুঁড়েঘরের সামনে এসে হুংকার দিতে থাকেন। খাদিজা ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের দেবরের বাড়িতে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা মরিচের গুড়া এনে কৌশলে মফির চোখে ছিটিয়ে দেয়। চোখ জ্বালাপোড়ায় মফি চিত্কার চেঁচামেচি শুরু করলে গ্রামের গৃহবধূরা ছুটে এসে তাকে গণধোলাই দেন। নারীদের সঙ্গে টানাহ্যাঁচড়ার একপর্যায়ে নিজের সঙ্গে থাকা হাসুয়ায় মফি মারাত্মকভাবে জখম হন। পুলিশ উদ্ধার করে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে।
তিন মানবাধিকার সংগঠনের পরিদর্শন
গতকাল সকালে ৩টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ভেকুটিয়া গ্রামের শেখপাড়ায় যান। তারা গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলে তাদের পাশে থাকার এবং প্রয়োজনীয় আইনগত সহযোগিতার অঙ্গীকার করেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ যশোর জেলা শাখার লিগ্যাল এইড সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুননাহার কনা, ব্লাস্টের স্টাফ ল’ইয়ার অ্যাডভোকেট মোস্তফা হুমায়ুন কবীর এবং আইইডি’র ম্যানেজার বিথিকা সরকার। অ্যাডভোকেট মোস্তফা হুমায়ুন কবীর জানান, খাদিজা বেগমসহ এই মামলার আইনি সুরক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব ব্লাস্ট পালন করবে।
অপর দুটি সংস্থার নেতৃবৃন্দ সন্তানের সম্ভ্রম রক্ষায় খাদিজার সাহসী ভূমিকার জন্য তাকে অভিবাদন জানান। তার পাশে থেকে তারা লড়ে যাবার অঙ্গীকার করেন।
প্রসঙ্গত, ২৩ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে ‘বিচার না পেয়ে ঘাতক হয়েছি: মেয়েকে উত্ত্যক্তকারীকে হত্যার দায়ে গ্রেফতারকৃত মা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ২৫ মার্চ যশোর জেলা মহিলা পরিষদ কার্যালয়ে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে খাদিজার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় মহিলা পরিষদ। অপর দুটি সংস্থাও একইভাবে এগিয়ে আসে। ইত্তেফাকের সংবাদের সূত্র ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি হাফিজা ও তার মা খাদিজাকে নানাভাবে সহযোগিতার ইচ্ছা ব্যক্ত করে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
