পাঁচ বছরের আগে নির্বাচন নয়

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৪, ২৩:০৭
বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের কেউ কেউ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী কোনো কোনো বিদেশি সংস্থা ও দেশ সবার অংশগ্রহণে দ্রুত একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংসদ নির্বাচনের কথা বলছে শুরু থেকেই। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল এবং প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) গুরুত্বপূর্ণ নেতা-নেত্রীরা অভিন্ন কণ্ঠে বলছেন, পাঁচ বছরের আগে কোনো নির্বাচন নয়। দশম সংসদের চলতি প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর এই পর্যন্ত আলোচনায় অংশ নেয়া ১৪ দল ও জাপার সংসদ সদস্যদের প্রত্যেকের বক্তব্যের মূল বার্তা হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ী সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পর, অর্থাত্ ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তারা বিএনপিসহ দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে যারা কথা বলছেন, তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় গত ২৯ জানুয়ারি। ওইদিন সংসদে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এডভোকেট। সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর মোট ৪৫ ঘণ্টা আলোচনা হবে। এছাড়া চলতি অধিবেশন আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে বলেও কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত রয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ মার্চ মঙ্গলবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর প্রায় ৩৬ ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনার প্রধান বার্তাই ছিল, বিএনপি-জামায়াতসহ ১৯ দলীয় জোট যতোই আন্দোলনের হুমকি দিক না কেন, পাঁচ বছরের আগে দেশে কোনো সংসদ নির্বাচন হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যরাও আগামী সপ্তাহে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বক্তব্য রাখবেন বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে তাঁর বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির গোষ্ঠীর সকল প্রকার সহিংস তত্পরতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অপচেষ্টার বিপক্ষে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের এই নির্বাচনের ফলাফলকে একটি ইতিবাচক অর্জন হিসাবেই গ্রহণ করেছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, রাশিয়া, চীন, ভারত, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামসহ এ পর্যন্ত অনেক দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান দশম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ মোট ১১টি সংস্থার প্রধানগণও নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাঁকে অভিনন্দন জানান। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)সহ বিভিন্ন বন্ধুপ্রতীম দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের ধারাকে সচল রাখতে একযোগে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে অবস্থিত সকল মিশনের প্রধানদের মাধ্যমে ওইসব দেশের কাছে সরকারের অবস্থান ব্যাখা করেছে। ২৯ জানুয়ারি সংসদে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও বলেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। রাজনীতির নামে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির সবধরনের অপচেষ্টা দমন করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী গত ১৮ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর রাখা বক্তব্যে বাংলাদেশে দ্রুত আরেকটি নির্বাচনের পক্ষে কথা বলা কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিকের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ২০০০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদে যাকে জনগণ ভোট দিয়েছিল, আদালতের রায়ে তিনি রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি। এতে কী জনগণের রায় প্রতিফলিত হয়েছে? এর কী জবাব দেবে যুক্তরাষ্ট্র? আসলে তাদের দেশের ব্যাপারে এক নীতি, আমাদের দেশের বেলায় অন্য নীতি নিয়েই কথা বলেন এসব কূটনীতিক। গত ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। বিএনপিসহ ১৯ দলের দ্রুত সংসদ নির্বাচন দাবির বিষয়ে তিনিও বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হয়েছে। আবার সংবিধান অনুযায়ীই ৫ বছর পর, অর্থাত্ ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হবে। এর একদিন আগেও নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জাপার প্রেসিডিয়ামের সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদও পাঁচ বছরের আগে নির্বাচনের দাবি ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, দু’একটি দল না গেলে নির্বাচন থেমে থাকতে পারে না। কখন নির্বাচন হবে, সেটি সংবিধানেই বলা আছে। দলটির প্রেসিডিয়ামের আরেক সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদও বলেছেন, নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করতে হয়েছিল। সুতরাং পাঁচ বছরের আগে কিসের নির্বাচন? আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও বলেছেন, ‘বিএনপি নেত্রীকে বলবো, নিজের দল গুছান, নির্বাচনের প্রস্তুতি নিন, পাঁচ বছর অপেক্ষা করুন।’ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে একই কথা বলেছেন সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ। এছাড়া বিএনএফ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের নেতা ও ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মো. সেলিমও বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর পরেই নির্বাচন হবে।