খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৪, ২০:০৪
প্রবাদ আছে, মাছে-ভাতে বাঙালি। শহুরে বাঙালিরা তা থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। তাদের ভাত-মাছ ছাড়াও মাংস, ডিম, সবজি, ডাল, দুধ, প্রাণিজ খাদ্য, খনিজ লবণ, ফল, চিনি, বিশুদ্ধ পানি সবই লাগে। তাদের আয় আছে এবং প্রতিবছরই তা বেশ বাড়ছে। তাই তারা অনায়াসে এসব খাদ্যপণ্য কিনতে পারছে। গ্রামের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের মাছ-ভাতের যোগান দিতেই গলদঘর্ম হতে হয়। তাও অনেকের ভাগ্যে নিয়মিত জোটে না। গত কয়েক বছর গ্রামমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের ফলে গ্রামের অর্থনীতিতে গতিশীলতা এসেছে। ফসল, মত্স্য ও পোলট্রির বিকাশের সাথে সাথে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠেছে। ফলে গ্রামীণ মানুষের উত্পাদনশীল কর্মসংস্থান বেড়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ নারী ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সরকার বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। তারপরও দেশের ২৬ শতাংশ মানুষ জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাদের কাছে দু’বেলা ভাত-মাছের সংস্থান করার নামই খাদ্য নিরাপত্তা। কেউ কেউ ভাতের ব্যবস্থা হলেই বলে- খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তার অর্থ হচ্ছে সুষম খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান। এর মধ্যে শর্করা হিসেবে ভাত ও রুটি থাকবে। প্রাণিজ প্রোটিন ও চর্বি হিসেবে মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি থাকবে। ভেষজ প্রোটিন হিসেবে সবজি, ডাল থাকবে। স্নেহজাতীয় খাবার হিসেবে দুধ, ঘি,পনির থাকবে। পর্যাপ্ত ক্যালরি থাকবে। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট তথা বিভিন্ন ভিটামিন, আয়োডিন, আয়রন ইত্যাদির উত্স হিসেবে তেল, শাক, ফল, বিশুদ্ধ পানি ইত্যাদি থাকবে। তবেই হবে সুষম খাবার। পুষ্টিসম্পন্ন খাবার না খেলে মানুষ প্রোটিন, ভিটামিন ইত্যাদির অভাবে শরীর অসুস্থ হয়। রক্তস্বল্পতায় ভোগে। দূষিত পানি খেলে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড প্রভৃতি পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পুষ্টিকর খাবার না খেলে কোনো কাজে সামর্থ্যের পুরোটা প্রয়োগ করা যায় না। মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটে না। আরও বড় ক্ষতি হয় নারীর ক্ষেত্রে। একজন অপুষ্ট মা অপুষ্ট শিশুরই জন্ম দেয়। তাদের ওজন কম হয়। তারা রক্তস্বল্পতায় ভোগে। উচ্চতা কম হয়। এভাবে পুষ্টিহীনতার দুষ্টচক্র তৈরি হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ৩৬ শতাংশ শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ৪৩ শতাংশ শিশু রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। ২৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর বড় কারণ এই পুষ্টিহীনতা। যারা পুষ্টিহীনতা নিয়ে বড় হয় তাদের মেধা, কর্মশক্তি ও সামর্থ্য কম হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে পুষ্টিহীনতার কারণেই মানুষ খাটো হয়। বাংলাদেশে এই খাটো হওয়ার হার আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়েও বেশি। পাঁচ বছর আগেও এ হার ছিল ৪৪ শতাংশ। এখন তা ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। খাটো হওয়ার বর্তমান হারও দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি কঠিন ও নীরব প্রতিবন্ধক। কারণ, এতে জাতীয় উত্পাদনশীলতা প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছে না। তাই সবার জন্য সুষম খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র স্কুলে খাবার দেয়া, ফুড স্ট্যাম্প, বাজারে সুষম খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিতে ভর্তুকি দেয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রভৃতি কার্যক্রম চালিয়েও তাদের প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ পুষ্টিহীনতায় আছে। ইউরোপের এ হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। তাই সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা একটি বিশ্ব সমস্যায় পরিণত হয়েছে। চারটি বিষয়ের ওপর বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করে: (১) দেশীয় উত্পাদন বা আমদানির মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা; (২) এসব পণ্য পুরো বছর সর্বস্তরের জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখা; (৩) খাবার তৈরিতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং (৪) ভেজাল ও দূষণযুক্ত খাদ্যপণ্য উত্পাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধে কঠোর আইন ও নীতি প্রণয়ন এবং এগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণ। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়। এনজিওগুলো এ ব্যাপারে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু তারা এসব জনহিতকর কাজকর্ম বাদ দিয়ে রাজনীতিবিদদের জ্ঞান দেয়াকেই তাদের করণীয় হিসেবে বেছে নিয়েছে। সস্তা শ্রমের মাধ্যমে অধিক আয়ের পথ থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করার শক্তি কারো নেই। উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত সব দেশের সরকারই এ দায়িত্বটি নিষ্ঠার সাথে পালন করে। যারা ব্যর্থ হয় তাদেরকে বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হতে হয়। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হয়েও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তায় বেশ এগিয়েছে। প্রধান খাদ্য চাল উত্পাদনে বাংলাদেশ অত্যন্ত সফল। নিয়মিত না হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে চাল উত্পাদন বেড়েছে। ১৯৭০ সালে প্রায় এক কোটি টন চাল উত্পাদিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে তা ৩ কোটি ৪২ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। শুধু গত পাঁচ বছরেই বেড়েছে প্রায় ৬৫ লাখ টন। বিগত সরকারের এটি একটি অন্যতম সাফল্য। ৪৩ বছরে মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণ। চাল উত্পাদন বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। চাহিদা অনুযায়ী চাল উত্পাদন হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী তা ভোগ করতে পারছে কিনা তার ওপরই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নির্ভর করছে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। তাদের প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সাথে জড়িত। তাদের বড় অংশই আবার বর্গাচাষী। ইদানিং গ্রামাঞ্চলে মত্স্য চাষ ও পোলট্রি শিল্প বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীও এ পেশায় ঝুঁকছে। গ্রামাঞ্চলে উত্পাদিত হয় বলে নিম্নআয়ের মানুষগুলো অপেক্ষাকৃত কমদামে চাষের মাছ, ডিম ও মুরগি পাচ্ছে। এটি তাদের প্রোটিন চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখছে। এ দুটি শিল্পের প্রসারের ফলে মাছ ও মুরগির খাবার হিসেবে ভুট্টা চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সরকার অবশ্য এ তিনটি ক্ষেত্রেই আর্থিক ও কারিগরি প্রণোদনা দিচ্ছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী মাছ, ডিম, মুরগি, বিশুদ্ধ পানি ইত্যাদি প্রতিদিন কিনতে পারার মধ্যেই সার্বজনীন সুষম খাদ্যের নিশ্চয়তা নির্ভর করছে। দেশে ভূমিহীন এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক অর্থাত্ যাদের আড়াই একরের কম আবাদী জমি আছে তেমন ভূমিহীন কৃষক পরিবারই প্রায় ৮০ শতাংশ। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ কৃষক পরিবার আড়াই একর বা তার বেশি জমির মালিক। এই ৮০ শতাংশের অধিকাংশই বর্গাচাষী। তাদের কৃষিকাজে কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো কারণে ফসল না হলে বা কম হলে পুরো লোকসানটা তাদেরই গুণতে হয়। সার, বীজ, সেচসহ যাবতীয় উত্পাদন ব্যয় মেটাতে গিয়ে এমনিতেই কৃষকরা খুব বেকায়দায় থাকে। তার উপর ফসল না পেলে তারা আরও অসহায় হয়ে পড়ে। দারিদ্র্য আরও জোরে দরজায় কড়া নাড়ে। সরকার অবশ্য আগামী বছর থেকে দেশের ১২ হাজার কৃষককে কৃষিবীমা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। জাপান এতে সহায়তা করবে। দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ কৃষক পরিবার আছে। বীমার আওতায় আসবে একটি ক্ষুদ্র অংশ। ধাপে ধাপে সব কৃষককে বীমার আওতায় আনতে পারলে এটিও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রণোদনা যোগাবে। অপরদিকে বর্গাচাষীরা ফসল পেলেও জমির মালিকের ভাগ দেয়ার পর বাকি ফসলের প্রায় পুরোটাই বিক্রি করে দিতে হয় উত্পাদন ঋণ মেটানোর জন্য। ফলে তারা উত্পাদিত ফসল নিজেদের খাওয়ার জন্য রাখতে পারে না। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য তারা বাজার থেকে কিনে আনার ওপরই নির্ভর করে। আয়-রোজগার কম বলে তারা চাল-আটার বাইরে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ এসব চাহিদা অনুযায়ী কিনতে পারে না। ফলে পরিবারের সদস্যরা অপুষ্টিতে ভোগে। যাদের আয়-রোজগার ভাল তাদের নবজাতকরাও অপুষ্টি নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। অনেকে বামন হচ্ছে। এর প্রধান কারণ অসচেতনতা। সর্বস্তরের জনগণের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমেই বামন হওয়ার প্রকোপ রোধ করা সম্ভব। ভিটামিন, আয়োডিন, আয়রন এসব বিষয়ে অজ্ঞতাই প্রধান বাধা। সরকার অনেক চেষ্টার পর প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষের জন্য সুপেয় জলের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু আরসেনিক সমস্যার কারণে এখন তা ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে গ্রামে পাকা পায়খানার সরবরাহ করায় দেশের ৯২ শতাংশ এলাকায় স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। এতে পানিবাহী রোগের প্রকোপ হ্রাস পাবে। যা খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখবে। দেশে সবজি উত্পাদন অনেক বেড়েছে। এখন টমেটো, শাকসহ কিছু সবজি সারা বছরই উত্পাদিত হয়। ফলে খরা মৌসুমেও সবজির প্রাপ্যতা বেড়েছে। তবে পর্যাপ্ত চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। মাছ ও ডিমের উত্পাদন চাহিদার কাছাকাছি পৌঁছেছে। যদিও ডিমের দাম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। দুধের উত্পাদন চাহিদার অর্ধেকও নয়। এছাড়া গরু-ছাগল, গম, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা সবই দেশীয় উত্পাদন দিয়ে চাহিদার সামান্যই পূরণ হয়। এসব পণ্য সারা বছরই আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে দাম ওঠানামার কারণে দেশেও এসব পণ্যের দাম ঠিক থাকে না। এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ ক্রেতাকে। আমদানি পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারের শুল্ক রেয়াত ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের সুফল অনেক সময়ই ভোক্তারা পায় না। এজন্য বাজার মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন। ভোক্তা অধিকার আইন হয়েছে। কিন্তু এর প্রয়োগ তেমন একটা চোখে পড়ে না। মাঝে-মধ্যে শহর-নগরের বাজারগুলোতে ভ্রাম্যমান আদালতের উপস্থিতি এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীকে আর্থিক জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার রক্ষা করা যাবে না। ভেজাল ও দূষণযুক্ত পণ্য বিক্রি বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ দেশের সর্বত্র নিশ্চিত করতে হবে। গত পাঁচ বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ৪০০ ডলারের বেশি বেড়েছে। এর খুব সামান্যই গ্রামের মানুষের ভাগে পড়েছে। যদিও সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতি বছর প্রায় ১২,৫০০ কোটি টাকা খরচ করছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির সাফল্যের অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় সিস্টেম লসের কারণে। বিশ্বব্যাংক জরিপ করে দেখেছে যে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে তারা বিশ্বব্যাপী যে সহায়তা দেয় তার মাত্র ২০ শতাংশ মূল টার্গেট তথা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিকট পৌঁছে। ৮০ ভাগই খরচ হয়ে যায় মাঝপথে। বাংলাদেশ সে পথ থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। ইতোমধ্যেই অনেক কর্মসূচি স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের খবরদারি রয়ে গেছে এবং এতে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট মধ্যস্বত্ত্বভোগী ও আমলাতন্ত্রের যোগসাজশে অপচয় হচ্ছে। সবাই প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে চায়। বাস্তবায়ন মনিটরিং করার কেউ নেই। বাস্তবায়নকারীরাই মনিটরিং এর দায়িত্ব পালন করছে। ফলে অপচয়কে জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের প্রত্যাশিত আয় ও কর্মসংস্থান হচ্ছে না। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাল, শাক-সবজি, ডাল, তেলবীজ, মাছ, মাংস, পোলট্রি, দুধ ইত্যাদির উত্পাদন বাড়াতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে উত্পাদন বাড়ালে হবে না। এর চেয়েও বেশি উত্পাদন করতে হবে। কারণ, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। জনগণের মধ্যে পুষ্টি সচেতনতাও বাড়ছে। তাই জনগণের পণ্য চাহিদা বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা যতো বেশি দেশীয় উত্পাদন দ্বারা পূরণ করা যাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ততো সহজ হবে। পর্যাপ্ত সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে। এখন সরকার টেস্ট রিলিফ, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রি, ইত্যাদি নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে অবদান রাখছে। সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারলে একটি বাড়ি একটি খামার কর্মসূচি এলক্ষ্যে একটি উত্তম উদ্যোগে পরিণত হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য প্রাপ্তি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ করতে তাদেরকে স্বাবলম্বী করতে হবে। খাদ্যপণ্য দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। টেকসই আয় বৃদ্ধির পথ নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় টেকসই করতে স্থানীয় পর্যায়ে উত্পাদনশীল খাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তাদের আয়টা ভাল হয় এবং তা নিরবচ্ছিন্ন হয়। এজন্য শিল্পখাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপিত হলে কৃষকরা লাভবান হবে। তারা উত্পাদন বাড়াতে অনুপ্রেরণা পাবে। গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপনের পথ উন্মুক্ত হবে। তাতে গ্রামের নারীদেরও শিল্পখাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে পুষ্টিসম্পন্ন খাবারের নিশ্চয়তার পাশাপাশি শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার আরও দ্রুত হ্রাস পাবে। ছেলে-মেয়েরা ভাল লেখাপড়া শিখতে পারবে। সুস্থ ও শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে। মানব সম্পদ উন্নয়ন সহজ হবে। তারা অধিক উত্পাদনশীল কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত হতে পারবে। তাদের খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই হবে। দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে যাবে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথ প্রশস্ত হবে।