বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, পৃথিবীতে ১৫ বছর বয়সের ওপরের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ হলো ধূমপায়ী। এদের মধ্যে বেশির ভাগেরই অবস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এবং পুরুষ ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু এই ধূমপানই অনেক জটিল রোগকে আমন্ত্রণ করে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার ক্যান্সার (যা হতে পারে ফুসফুস, অন্ননালি, কিডনি, পাকস্থলী, অগ্নাশয়, মূত্রথলি ও মুখে), শ্বাসনালির রোগ, হূিপণ্ডের রোগ, মস্তিষ্কের স্ট্রোক, রক্তবাহী নালির রোগ, পেপটিক আলসার ইত্যাদি। গর্ভকালীন যারা ধূমপান চালিয়ে যায় তাদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত, অপরিপক্ক সন্তান প্রসব, কম ওজনের সন্তান প্রসব, শিশুর হঠাত্ মৃত্যু কিংবা গর্ভে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তা ছাড়া ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ব্যবহারগত পরিবর্তন ঘটে, যেমন উদ্ব্বিগ্নতা পরিহারে অধিক ধূমপান, অনিদ্রা, খাবারে অনীহা, উগ্র মেজাজ ইত্যাদি পরিলক্ষিত হতে পারে। তবে যারা ধূমপায়ী না, কিন্তু যে পরিমণ্ডলে তারা থাকে, যেখানে অনেকেই অবাধে ধূমপান করছে, সে ক্ষেত্রে
অধূমপায়ীরাও এর ঝুঁকিতে পড়বে। তাই এসব মারাত্মক ও জটিল ঝুঁকি বা রোগ এড়াতে চাই মাত্র একটা পরিবর্তন- আর তা হলো ধূমপান পরিহার করা। অনেকেই চিন্তা করেন, অনেক বছর ধরে তো ধূমপান চালাচ্ছি, এখন ছাড়লেই বা কী হবে? এর উত্তর হলো- যিনি যত দিনই ধূমপান করুন বা যত বেশি ধূমপান করুন না কেন, যেদিন ওই ব্যক্তি ধূমপান ছেড়ে দেবেন, সেদিন থেকে ওই রোগগুলো হওয়ার ঝুঁকি দ্রুত
কমতে শুরু করবে। তাই এ মুহূর্তেই ছেড়ে দিন ধূমপানের অভ্যাস। কারণ এ অভ্যাস কাউকে ভালো কিছু দিতে পারে না। ধূমপান ত্যাগ করার পর প্রতিটা সময় অতিক্রম করার সাথে আপনি নিচের সুবিধাগুলো অর্জন করতে শুরু করবেন:
১. বিশ মিনিট পর; রক্তচাপ স্বাভাবিকে আসবে, নাড়ির স্পন্দন স্বাভাবিক গতিতে চলে আসবে, শরীরের তাপমাত্রা কমে স্বাভাবিক হবে।
২. আট ঘণ্টা পর; ধূমপানের ফলে রক্তে যে কার্বন মনোঅক্সাইডের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল তা স্বাভাবিক মাত্রাতে আসবে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকে হয়ে আসবে।
৩. চব্বিশ ঘণ্টা পর; তাত্ক্ষণিকভাবে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি কমতে শুরু করবে।
৪. দুই দিন পর; স্নায়ুর শেষ প্রান্তগুলো আবার সতেজ হতে শুরু করবে, যা ধূমপানের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং মুখের স্বাদ ও ঘ্রাণক্ষমতা বাড়তে শুরু করবে।
৫. দুই সপ্তাহ পর; রক্তের সঞ্চালণ প্রক্রিয়ার উন্নতি হতে থাকবে, হেঁটে চলাফেরা সহজ মনে হবে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ৩০ ভাগ বাড়বে।
৬. এক মাস পর ; সিগারেট না খেলে যে খারাপ লাগার অনুভূতি বোধ, তার বেশির ভাগ দূর হবে।
৭. তিন মাস পর; ফুসফুসের কার্যক্ষমতা অনেক বাড়বে, ধূমপানে যে কাশি সৃষ্টি হয়েছিল তা দূর হবে এবং শ্বাসনালিতে যে ক্ষয়টুকু হয়েছিল ধূমপান করার ফলে তা স্বাভাবিকে চলে আসবে এবং সংক্রমণের হার কমবে।
৮. নয় মাস পর; মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি কমে এসে প্রায় অধূমপায়ীদের মতো হয়ে যাবে।
৯. এক বছর পর; এখনো যারা ধূমপান করছেন তাদের তুলনায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমে অর্ধেক হয়ে যাবে এবং সময়ের সাথে সে ঝুঁকি ক্রমেই কমবে।
১০. নয় বছর পর; যারা এখনো ধূমপান করছেন তাদের তুলনায় ফুসফুসে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অর্ধেক কমে যাবে, মস্তিষ্কে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও অর্ধেকে কমে আসবে এবং তা ছাড়া মুখ, গলা ও অন্ত্রনালিতে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে অর্ধেক হয়ে যাবে।
১১. দশ বছর পর; ফুসফুসের ক্যান্সারসহ অন্যান্য ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে অধূমপায়ীদের সমানে এসে পৌঁছবে। প্রি-ক্যান্সারাস কোষগুলো দূর হয়ে যাবে, সেখানে নতুন সুস্থ কোষ তৈরি হবে।
১২. পনেরো বছর পর; হূিপণ্ডের অসুখের ঝুঁকি কমে অধূমপায়ীদের সমান হবে। তা ছাড়াও ১৫ বছর ধূমপান না করলে দেখা যাবে অনেক অর্থ সাশ্রয় হয়েছে। ব্যবহারগত পরিবর্তন এসেছে এবং একটা আন্তরিক পরিবেশে জীবনযাপন অতিবাহিত হচ্ছে, যা এই ধূমপানের জন্য ব্যাহত হচ্ছিল। তাই ধূমপায়ীদের উচিত, ঠিক এ মুহূর্ত থেকেই এটাকে ত্যাগ করা এবং তার মাধ্যমে উপরিউক্ত সুবিধাগুলো ভোগ করা। এতে নিজের, পরিবারের এবং সমাজের কল্যাণ সাধন সম্ভব।
ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল
আবাসিক সার্জন, সার্জারি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
চেম্বার:পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা
