মানব দেহের অভ্যন্তরে প্রবাহমান অস্বচ্ছ লাল তরল পদার্থ হচ্ছে রক্ত। মানুষ ভেদাভেদে পুরুষ দেহের মোট রক্তের পরিমাণ ও মহিলা দেহের রক্তের পরিমাণে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ছেলেদের ক্ষেত্রে শরীরের ওজনের প্রতি কেজিতে রক্ত থাকে ৭৬ মিলিলিটার। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ৬৬ মিলিলিটার। হূদপিণ্ড মানব দেহের অভ্যন্তরে শিরা ও ধমণী দিয়ে সমগ্র শরীরে রক্ত প্রবাহ করে। সুস্থ স্বাভাবিক হূদপিণ্ড ২৪ ঘণ্টায় ৮ গ্যালন রক্তকে পাম্প করে থাকে। ধমণী ও শিরার দৈর্ঘ্য পরিমাপ করলে ২৪ ঘণ্টায় তা দাঁড়ায় ১২ হাজার মাইল। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে শরীরে স্থিত রক্তের মাত্র ৬০ ভাগ ব্যবহূত হয়। বাকিটা থাকে ক্রিয়াহীন অলস।
রক্তকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—রক্ত কণিকা ও রক্তরস। মোট রক্তের ৪৫ ভাগ থাকে রক্তকণিকা আর ৫৫ ভাগ রক্ত রস বা প্লাজমা। এই রক্তরসে ৯২ শতাংশ জল। রক্তকণিকার ৪৫ ভাগের আবার ৩ ধরনের জীবপদার্থ বিদ্যমান। ১২০ দিন আয়ু নিয়ে থাকে লোহিতকণা, ২ থেকে ১০ দিনের আয়ু নিয়ে প্রাণশক্তিকে চলমান রাখে শ্বেত রক্ত কণিকা। মাত্র ২ দিনের আয়ু নিয়ে প্রবহমানতাকে গতিশীল করে অণুচক্রিকা। এতসব কাজের পরও সুস্থ সবল ৫০ কেজি ওজনের একজন ব্যক্তির দেহে ১ হাজার ৩ শ মিলিলিটার রক্ত বাড়তি থাকে।
দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং অপারেশন, রক্তক্ষরণ, প্রসূতির রক্তক্ষরণ , রক্তরোগ চিকিত্সায়, রক্তস্বল্পতা রোগ চিকিত্সা, থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া ইত্যাদি রোগ চিকিত্সা ও জরুরি সেবা প্রদানে বর্তমানে দেশে বাত্সরিক রক্ত চাহিদার পরিমাণ ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ ব্যাগ।
এই বিপুল পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২০৫ টি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের কিছু সংক্রামক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হেপাটাইটিস বি,সি, ম্যালেরিয়া, সিফলিস, গনোরিয়া, এইডস, জণ্ডিস ইত্যাদি পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে এমন স্থানে রক্তকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই সময়ে রক্ত সংগ্রহ করে মাইনাস ৫-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৩০-৩৫ দিন পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
রক্তই একমাত্র পদার্থ যার বিকল্প আবিষ্কার এখনো সম্ভব হয়নি। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রক্তদানকে উত্সাহ ও পুণ্যের কাজ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রতিটি মানুষ যাদের ওজন ১০০ পাউন্ড ও রক্তচাপ স্বাভাবিক তারাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতি ৩-৪ মাস পর পর শরীরের বাড়তি অলস এক ব্যাগ রক্তদান করতে পারেন।
এক্ষেত্রে যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক নয়, জণ্ডিস আছে, শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, একজিমা রোগ রয়েছে, ডায়াবেটিস, হূদরোগ, কিডনি সমস্যা, গর্ভবতী মা, মেয়েদের মাসিক চলাকালীন, মায়ের দুধ পান করে যাদের ১ বছরের নিচের শিশু আছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে রক্তদানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে তারা ১৯তম জন্মদিন পালনের আগে একব্যাগ রক্ত স্বেচ্ছায় দান করবেন। এভাবেই পূরণ হবে রক্ত গ্রহীতার স্বার্থ ও অধিকার।
চট্টগ্রাম
