সুদূর অতীতে এ দেশে হাজার হাজার স্থানীয় জাতের ধান আবাদ হতো। কিন্তু একথাও সত্য যে বিশেষ বিশেষ গুণসম্পন্ন হলেও এ জাতগুলোর ফলনশীলতা ছিল নিতান্ত কম। তবে এর গুণাগুণ আমাদের গবেষণা ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। এসব দেশি ধানের জাত এবং এর গুরুত্ব অনুধাবন করে ব্রি তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ জাতসমূহ সংরক্ষণ করে আসছে এবং প্রায় আট হাজার ধানের জাত ব্রি জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত আছে। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা এবং আর্থ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এদেশে ১৯৬৪ সালে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধানের প্রবর্তন করা হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) প্রতিষ্ঠার পর দেশীয় বিজ্ঞানীরা স্থানীয় জাতসমূহের ভালো গুণগুলো ব্যবহার করে উফশী ধানের জাত উদ্ভাবনের গবেষণায় ব্রতী হয় এবং এ সমস্ত ধানের চাষাবাদ কৌশল নিয়েও গবেষণা শুরু করে। এ গবেষণার ধারাবাহিক সফলতার জন্যই দেশ আজ খাদ্য সয়ম্ভরতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পাথেয় হিসেবে সময়ের প্রয়োজনে কৃষকের জমি থেকে স্থানীয় জাতের ধানের আবাদ হয়তো হারিয়ে গেছে কিন্তু এর সঞ্জীবনী অনন্ত ফল্গুধারর মতো আধুনিক উফশী ধানের অন্তরে বহমান। উদাহরণস্বরূপ, লতিশাইল এককালে বাংলাদেশে বহুল আবাদী একটি স্থানীয় জাত ছিল। বর্তমানে প্রচলিত উফশী অধিকাংশ ধান এ ধানের উত্তরসুরি। কালের আবর্তে এবং সময়ের প্রয়োজনে কৃষক আবাদ না করলেও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের জিন ব্যাংক সযত্নে রক্ষিত আছে এসব মূল্যবান স্থানীয় জাত। ব্রির বিজ্ঞানীরা জাত উদ্ভাবন গবেষণায় এ জাতসমূহ প্রায়শই ব্যবহার করে থাকেন।
উফশী ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়ার জন্য এর আবাদে সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ সার ও কীটনাশকের প্রয়োগ কখনোই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয় না। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সম্প্রতি ইত্তেফাকের এক সম্পাদকীয়তে যা প্রকাশিত হয়েছে তা মূলত মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কুফল। কোনমতেই এজন্য উফশী ধানের জাতকে দায়ী করা সমীচীন নয়, বরং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অপ্রতুলতাই বহুলাংশে এ জন্য দায়ী।
উফশী ধানের গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু ফলনকে প্রাধান্য দিলেও বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। আধুনিক ধানের জাতগুলো শুধু এখন উফশীই নয়, এগুলো বিশেষ বিশেষ গুণসম্পন্ন। যেমন কোনটি লবণাক্ততা সহিষ্ণু, কোনোটি খরা সহিষ্ণু, কোনোটি আবার জলমগ্নতা সহিষ্ণু। সুগন্ধি উফশী ধান কিংবা পুষ্টি সমৃদ্ধ উফশী ধানের জাতও ইতোমধ্যে অবমুক্ত করা হয়েছে। দেশি ধানের পুষ্টিগুণ ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের আধুনিক ধানের জাতের চেয়ে উত্তম—এ কথাও সত্যি। কিন্তু দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে আধুনিক ধানের চাষাবাদের বিকল্প খুব কম। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ব্রি বর্তমানে অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ধানের জাত উদ্ভাবনে অতীব গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় অধিক জিঙ্ক সমৃদ্ধ ধানের জাত ব্রি ধান ৬২ উদ্ভাবন করা হয়েছে। অচিরেই ভিটামিন এ উত্পাদনকারী বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ ধানের জাতও আসছে। কাজেই দেশি ধানের জাত সংরক্ষণ কার্যক্রম চলমান এবং দেশি ধানের গুণাবলী ব্যবহার করে উফশী ধান জাত উদ্ভাবন কাজও চলমান। এ বিশেষ গুণসম্পন্ন জাতগুলো কৃষকদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এ সব বিশেষ গুণ স্থানীয় জাত থেকেই বিশেষ পদ্ধতিতে উফশী ধানে সংযোজন করা হয়েছে। এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য উফশী ধানের আবাদের কারণে ফসলের নিবিড়তা কমেনি বরং বেড়েছে। ফলে আগের দিনের এক ফসলি জমি আজ দু’ফসলি, তিন ফসলি কিংবা চার ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
গাজীপুর
