দেশে প্রথমবারের মতো চিংড়ি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। দেশের হিমায়িত মত্স্য রপ্তানির শতকরা ৯০ ভাগ চিংড়ি থেকে আসলেও বহু বছর ধরে চিংড়ি নীতিমালা করার কাজ ঝুলে আছে। গত সপ্তাহে চিংড়ি নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা ২০১৪ হিসাবে তা প্রকাশ করা হবে বলে জানা যায়। চিংড়ি নীতিমালার ফলে আধুনিক পদ্ধতিতে চিংড়ি উত্পাদন যেমন বৃদ্ধি পাবে, একইসাথে চিংড়ি উত্পাদনের ও রপ্তানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ বিভিন্নমুখী সুযোগ সুবিধা পাবেন।
দেশের প্রায় দেড় কোটি লোক চিংড়ি উত্পাদন, সরবরাহ ও রপ্তানির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত রয়েছে। চিংড়ি হ্যাচারি, চিংড়ি নার্সারি, চিংড়ি খামার, চিংড়ি চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ডিপো, আড়ত, অবতরণ কেন্দ্র, চিংড়ি খাদ্য ও আহরণ সামগ্রী তৈরি ও পরিবহন কাজে এ বিশাল সংখ্যক লোক নিয়োজিত রয়েছেন। জানা যায়, আশির দশকে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চিংড়ি চাষ কার্যক্রমের সূচনা হয়। ক্রমান্বয়ে চিংড়ি চাষ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও প্রসারের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও গুরুত্বের প্রেক্ষিতে চিংড়ি সম্পদের ব্যাপক উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ ঘটছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এর ব্যাপক পরিবর্তন সাধন হয়। পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে চিংড়ি খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি আয় উত্তরোত্তর বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। তারই সাথে কারিগরি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা জোরদার, লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সমপ্রসারণ কৌশল গ্রহণ একান্ত জরুরি বিবেচনা করে জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। দেশে উত্পাদিত চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ রপ্তানি করে সরকার বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এর শতকরা ৯০ ভাগ আসে বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি রপ্তানি করে।
জাতীয় চিংড়ি নীতির মূল উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে এর উত্পাদন ও ব্যবস্থাপনা। যার মাধ্যমে পরিবেশ ও প্রতিবেশ অনুযায়ী লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করে পরিকল্পিত চিংড়ি চাষ কার্যক্রমের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় চিংড়ি উত্পাদন বৃদ্ধি। নীতিমালায় চিংড়ির প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী চিংড়ি ও চিংড়ি পণ্যের মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিপণন এবং রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নীতিমালায় রয়েছে চিংড়ি উত্পাদনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের বিভিন্ন দিক। তাছাড়া জাতীয় চিংড়ি নীতির পরিধি, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রসমূহ ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। চিংড়ির বাস্তবায়ন কৌশলের আওতায় থাকছে চিংড়ির উত্পাদন ও ব্যবস্থাপনা। উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদী ও জলাশয়ের প্রাকৃতিক চিংড়ি সংরক্ষণ ও আহরণ উপকূলীয় এলাকায় সমন্বিত চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনা। সামুদ্রিক চিংড়ি সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও আহরণ। চিংড়ি হ্যাচারি ও চাষের জন্য উপকরণ সরবরাহ, চিংড়ি সংক্রান্ত পরিবেশ, ভূমি অঞ্চলিকরণ ও চিংড়ি সম্পদ উন্নয়নে উদ্বুদ্ধকরণ ও সমপ্রসারণ কার্যক্রম, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ। চিংড়ি সম্পর্কে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা, চিংড়ি চাষে নিয়োজিতদের ঋণ প্রদান ও বীমা সুবিধার আওতায় আনা। তাছাড়া চিংড়ি বিষয়ক তথ্যাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিনিময়সহ সার্বিক বিষয়ে মত্স্য অধিদপ্তরের চিংড়ি উইং-এ একটি ডাটাবেজ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ হিমায়িত মত্স্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. আমিন উল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, দীর্ঘদিন পর আমরা চিংড়ির জন্য একটি নীতিমালা পাচ্ছি। এ নীতিমালার মাধ্যমে চিংড়ির উত্পাদন, বিতরণ এবং রপ্তানি পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে একটি সিস্টেম চালু হবে। এতে করে চিংড়ির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মহল উপকৃত হবে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন।
