চিকিত্সক ধর্মঘটের কারণে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিত্সা না পেয়ে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে হাসপাতালের ৮ নং ওয়ার্ডে রোগী আশরাফুল ইসলাম (৩৫) মারা যান। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি হন।
নিহত রোগীর ছোট ভাই আরিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ধর্মঘটের কারণে চিকিত্সক না থাকায় তার ভাই সুচিকিত্সা পাননি। নার্স ও ইন্টার্নি চিকিত্সকরা যা জানেন তাই করেছেন। তবে ওই ওয়ার্ডের ইন্টার্নি চিকিত্সক তাহামিনা সুলতানা দাবি করেন, সিনিয়র চিকিত্সক না থাকলেও চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হয়নি। প্রয়োজনে তারা সিনিয়র চিকিত্সকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের পরামর্শে রোগীর চিকিত্সা দিচ্ছেন।
এদিকে ভুল চিকিত্সায় এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগে কারাগারে আটক চিকিত্সক ও স্থানীয় ডলফিন ক্লিনিকের মালিক শামিল উদ্দিন আহমেদ ওরফে শিমুলের মুক্তির দাবিতে জেলার সকল বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাশাপাশি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোতেও চিকিত্সকদের কর্মবিরতি চলছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শুধু বহির্বিভাগের সেবা বন্ধের ঘোষণা দেয়া হলেও কার্যত পুরো হাসপাতালেই ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে। হাসপাতালে চিকিত্সা না পেয়েই আশরাফুল ইসলাম মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন অন্য রোগীর স্বজনরা। এছাড়া চিকিত্সক ধর্মঘটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন রোগীরা। রাজশাহীর বাইরে থেকে চিকিত্সার জন্য এসেও ফিরে যাচ্ছেন অনেক রোগী।
রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ডা. শিমুলের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা থেকে জেলা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের এই ধর্মঘটের ডাক দেয়। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) রাজশাহী শাখা এবং স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদসহ চিকিত্সদের সব সংগঠন ধর্মঘটের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। তাকে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত তারা ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বিএমএ রাজশাহী শাখার সভাপতি ডা. এস আর তরফদার জানান, তাদের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা বলেছেন, কারাগারে আটক চিকিত্সকের জামিন হলেই তারা কেবল চলমান ধর্মঘট প্রত্যাহার করবেন। রোগীদের দুর্ভোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ুক এটা তারাও চান না। তবে শুক্রবার রাতের মধ্যে কারাবন্দী ডা. শিমুলের জামিন না হলে শনিবার থেকে এই আন্দোলন বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগে ছড়িয়ে পড়বে।
জানা গেছে, গত বছর ৯ ডিসেম্বর জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা পিটিয়ে চাঁপাইনবাগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শেখটোলা গ্রামের আজগর আলীর ছেলে ব্যবসায়ী আনোয়ারুল হক টিপুর (৩৫) পা ভেঙ্গে দেয়। দ্বিতীয় দফা চিকিত্সার জন্য গত ২৯ জানুয়ারি তাকে ডলফিন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। পরদিন রাত ১০টায় পায়ে অস্ত্রোপচারের জন্য টিপুকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এর পর ক্লিনিকটির মালিক, ডাক্তার ও কর্মচারীরা গা ঢাকা দেন। এ ঘটনায় ওই রাতেই মৃতের স্ত্রী শারমিন আক্তার ক্লিনিক মালিক ডা. শিমুল ও অজ্ঞাত দুই চিকিত্সকসহ চারজনের বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ক্লিনিকের মালিক ডা. শিমুলকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে আদালত বাদির আবেদনের প্রেক্ষিতে আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করে পুলিশের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে সিআইডিকে মামলার পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, ডা. শিমুল বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) রাজশাহী শাখার যুগ্ম-সম্পাদক এবং সরকার সমর্থক স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) রাজশাহী জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক।
রোগীদের ভোগান্তি:এদিকে চিকিত্সক ধর্মঘটে জেলার রোগীদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহত্ চিকিত্সাকেন্দ্র রামেক হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। শুক্রবার সকালে কয়েকশ’ রোগীকে হাসপাতালটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। হাসপাতালটির চিকিত্সা শুধুমাত্র ইন্টার্নি (শিক্ষানবিশ) চিকিত্সক নির্ভর হয়ে পড়ায় সঙ্কটাপন্ন রোগীর অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুরের সাহেব আলী রামেক হাসপাতালের ৩১ নং ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন। তার অভিভাবক মনিরুল ইসলাম বলেন, সাহেব আলীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। চিকিত্সকদের কর্মবিরতির কারণে তারা উদ্বিগ্ন।
নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, সকল বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও নার্সিং হোম বন্ধ রয়েছে। রোগী আসলেও সংশ্লিষ্টরা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। যারা ভর্তি রয়েছেন তারাও যথাযথ চিকিত্সাসেবা পাচ্ছেন না বলে রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেছেন।
