গণহারে লুটপাট, হামলা বাড়িছাড়া অসংখ্য মানুষ

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৪, ২৩:৩৯
গত ২৩ মার্চ উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও পুলিশি আতঙ্কে গজারিয়া উপজেলার চর বাউশিয়া ইউনিয়নের ফরাজিকান্দি গ্রাম এখন প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসীরা ভাংচুর, লুটপাট করা ছাড়াও আকস্মিক হামলা চালিয়ে নারী-শিশুদেরও আহত করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভয়ে গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে গ্রামটিতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া ৮/১০ জন বৃদ্ধা গ্রামে এসেছেন পরিস্থিতি দেখতে। কিন্তু তারা এসে দেখেন তাদের হাস-মুরগি-কবুতর লুট হয়ে গেছে। তালাবদ্ধ ঘর ভেঙ্গেও মালামাল লুট করা হয়েছে। কিছুক্ষণ আহাজারীর পর আবার তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৬০ বছরের এক নারী বলেন, ‘হাঁস-মুরগি-কইতর সব নিছেগা, লোকজন নাই যামুগা।’ ৮০ বছরের আরেক বৃদ্ধা বলেন, ‘নাম জানলে সমস্যা আছে কইলজা পিঠের মিধে বাইন্দা আইছি।’ আরেক বৃদ্ধা বলেন, ‘আমি একলা হেনে থাকমুনা। সব নিছেগা, কিচ্ছু নাইগা, গরু-বাছরও নিছেগা। নাম বললে আমার খারপ হইব।’ তারা জানান, এমন ধরনের হামলা-ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা প্রায় পুরো গ্রামেই ঘটেছে। গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে খালেক মিয়ার ৩টি গরু, জনু মিয়ার ২টি, মাহফুজের ২টি, জমিনা বেগমের ১টি, জরিমন বেগমের ২টা গরু লুট করা হয়েছে। ভাংচুর করা হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর। লুট করা হয়েছে বাড়িতে থাকা আসবাবপত্র। বরিশালের নজরুল নামের ব্র্যাকের এক শ্রমিক এই গ্রামে ১০ বছর ধরে ভাড়া বাড়িতে বাস করতেন। কিন্তু তিনি মালামাল নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, পাশের মধ্যমকান্দি গ্রামের লোকজন তাকে আজকের মধ্যে এই গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তাই জীবন বাঁচাতে চলে যাচ্ছি। প্রায় সব ভাড়াটিয়াই এখান থেকে চলে গেছে বলে তিনি জানান। এদিকে নিরীহ গ্রামবাসীকে সহায়তা করতে পুলিশও কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। রহস্যজনক কারণে তারা নিরব ভূমিকা পালন করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষে মাহাবুব আলম জোটন নামের এক ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকার নিরীহ মানুষদেরও আসামি করা হয়েছে। আর পুলিশ গ্রামের যাকে পাচ্ছে তাকেই গ্রেফতার করছে। এসব কারণে গ্রামটি প্রথমে পূরুষশূন্য হয়ে পড়ে। এরপর পুরুষদের না পেয়ে নারী ও শিশুদের উপরও সন্ত্রাসীরা হামলা চালালে গোটা গ্রামই জনশূন্য হয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের দিন চর বাউশিয়া মধ্যমকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়। এই কেন্দ্রে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল মান্নান মনা বেশি ভোট পায়। এতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক মধ্যমকান্দি গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরদিন মধ্যমকান্দি ও ফরাজিকান্দি গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হয়। আহতদের মধ্যে মাহাবুব আলম জোটন নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র চিকিত্সাধীন অবস্থায় ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে মারা যান। এরপরই মধ্যমকান্দি গ্রামের লোকজন ফরাজিকান্দি গ্রামে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। জোটন হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফরাজিকান্দি গ্রামের মিজান প্রধানের তালাবদ্ধ ভবনে বৃহস্পতিবার রাতে ভাংচুর করে লুটপাট চালায় সন্ত্রাসীরা। এ ব্যাপারে গজারিয়া থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি মো. ফরিদউদ্দিন জানান, গ্রামটিতে নির্বাচনোত্তর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। ওই এলাকায় একটা খুন হওয়ার কারণে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।