বিজেপিতে ‘ওল্ড ইজ নট গোল্ড’!

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২২:১৪
বিজেপি’র কয়েকজন বর্ষীয়ান ডাকসাইটে নেতাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা গেছে। বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দলে নতুন মেরুকরণে এসব নেতা এখন খাদের কিনারে। যারা এতদিন দলে ছিলেন অপরিহার্য অঙ্গ, তারাই যেন এখন বিজেপিতে হয়ে উঠেছেন সবচে বড় অপাংতেয়! ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে হয়তো প্রথমবারের মতো এক ধরনের অভ্যুত্থান দেখা যাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি)। গত কয়েকদিনে বিজেপি’র কয়েকজন বর্ষীয়ান ডাকসাইটে নেতাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা গেছে। বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দলে নতুন মেরুকরণে এসব নেতা এখন খাদের কিনারে। যারা এতদিন দলে ছিলেন অপরিহার্য অঙ্গ, তারাই যেন এখন বিজেপিতে হয়ে উঠেছেন সবচে বড় অপাংতেয়! আগামী ৭ এপ্রিল থেকে লোকসভার নির্বাচন শুরু। নির্বাচনের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগেই মনে হচ্ছে, মোদীর নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি দলে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে আর তাদের গ্রুপে নেই এমন নেতারা দিন দিন কোণঠাসা হচ্ছেন। দলের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় বয়স্ক নেতা হলেন এল কে আদভানি। দলকে আজকের অবস্থানে আনার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল বিশাল। বিজেপি’র নাম মুখে এলেই আদভানির নামটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসে সবার মনে। সেই এল কে আদভানি এখন দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নেই। চলে গেছেন অবাঞ্ছিতদের পর্যায়ে। মধ্য প্রদেশের ভুপাল আসন থেকে এবারের লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দল তার আগ্রহের দাম দেয়নি। এর পরিবর্তে পশ্চিম গুজরাটের গান্ধীনগর থেকে তাকে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে এক প্রকারে বাধ্য হয়েই। দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিংকে পশ্চিম রাজস্থানের বারমের আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ যশোবন্ত সিং এক প্রকার বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঐ আসনে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দলে এ ধরনের অনেক ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ হচ্ছে এবং সবাইকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা অনেক কমে গেছে। যশোবন্তের এমন সিদ্ধান্তে মোদী ক্ষুব্ধ হন। আর মোদী ক্ষুব্ধ হলে যা হতে পারে তাই হয়েছে। শনিবার তাকে দল থেকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। কিছুদিন আগেও দলের অন্যতম নেতা হিসেবে বিবেচিত হতেন মুরালি মনোহর যোশী। তিনি অটল বিহারী বাজপেয়ী ও আদভানির সবচে ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন। উত্তর প্রদেশের বারানসি আসন এতোদিন তারই দখলে ছিল। সমপ্রতি তাকে এ আসন থেকে শিষ্টাচার বিহর্ভূতভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। যাতে এ আসন থেকে নরেন্দ্র মোদী নিজেই নির্বাচন করতে পারেন। মোদীর এই সিদ্ধান্তে ‘মরণদশা’ উপস্থিত হয়েছে মুরালির। তিনি একই সাথে হতোদ্যম ও বিস্মিত হয়ে পড়েছেন। নিবেদিতপ্রাণ হয়ে দলের জন্য কাজ করার পরেও এমন ‘পুরস্কার’ তার কপালে জুটবে ভাবতেই পারেননি তিনি। পূর্ব আহমেদাবাদের এমপি ও বিজেপি’র প্রভাবশালী নেতা হারিণ পাঠকও বিজেপিতে অনেকটাই অবাঞ্ছিত। তার নিজের আসনে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। অথচ সেই আসন থেকে নির্বাচন করে তিনি সাতবার জয়লাভ করেছেন। তার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত তরুণ একজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আদভানির আরেক সহযোগী হলেন সুষমা স্বরাজ। তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবেও বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তার অবস্থাও অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতো। প্রার্থী নির্বাচনে সুষমা স্বরাজের মতামতকে গ্রাহ্য করছে না মোদীর নেতৃত্ব। সম্প্রতি তিনি যশোবন্ত সিংকে মনোনয়ন না দেয়ার বিষয়ে বলেন, দলের নির্বাচনী কমিটিতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। দলের এ সিদ্ধান্তে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই মর্মাহত। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা পছন্দের আসনে মনোনয়ন পাচ্ছেন না বা দলের মধ্যে কোণঠাসা অবস্থায় থাকাটা ভারতের রাজনীতিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। এমনকি তা বিজেপিতেও নতুন নয়। কিন্তু এবার বিজেপি’র ক্ষেত্রে এটা ব্যতিক্রম কারণ কিছুদিন আগ পর্যন্তও এসব নেতারা ছিলেন দলের প্রাণশক্তি। তারাই বিজেপিকে আজকের চেহারা দিয়েছেন। এমনকি মোদী নিজেই আদভানির উপর পুরোমাত্রায় নির্ভরশীল ছিলেন। এসব জ্যেষ্ঠ নেতারা তখন মোদীকে নিরাপত্তা না দিলে তিনি আজকের এ অবস্থায় আসতে পারতেন না। বিজেপি’র অভিভাবক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দৃঢ়ভাবেই মোদীর সঙ্গে রয়েছে এটা এখন অনেকেরই জানা। আর আসন্ন নির্বাচনে মোদীর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার জন্য তারা সবাইকে বাদ দেয়ার মতো বাজি ধরেছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের এভাবে অবজ্ঞার কারণকে অবশ্য আরএসএস-এর প্রধান মোহন ভগত বর্ণনা করেছেন পরিবর্তন হিসেবে। তার মতে, এ ধরনের পরিবর্তন জরুরি ছিল। দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি দলের পক্ষই নিয়েছেন। তার মতে, সময়ের চাওয়া অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে হবে। দলের যাত্রাকে সফল করার জন্য এটা জরুরি। একই ধরনের মত, আদভানির এক সময়ের সহচর ও বর্তমানে মোদীর গ্রুপের নেতা অরুন জেটলির। তার মতে, কোনো নেতাকে মনোনয়ন দেয়া না হলে বিষয়টি হাসিমুখেই মেনে নেয়া উচিত। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার এ এস পনিরসেলভানের মতে, বিজেপি’র সাম্প্রতিক কার্যক্রমে মনে হচ্ছে, তারা এবার অতি আত্মবিশ্বাসী। আর এজন্য চড়া মূল্য দিতে হতে পারে দলটিকে। তাদের ভাগ্য সম্ভবত সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে গিয়েছিল। আর এখন ক্রমাবনতি হচ্ছে। অনেকের মতে, জনমত জরিপে এগিয়ে আছে বিজেপি। কিন্তু নির্বাচনের ফল যদি জনমতের মতো না হয় সেক্ষেত্রে জোটের শরিকরা মোদীর বদলে সরকারে অন্য কোনো উদার ও সহিষ্ণু নেতার নেতৃত্ব চাইতে পারে। কারণ ভিন্নমতালম্বীদের অপছন্দকারী হিসেবে মোদীর পরিচিতি রয়েছে। সেক্ষেত্রে অন্য বর্ষীয়ান নেতাদের মধ্যে এল কে আদভানি হতে পারেন সবার প্রথম পছন্দ। হয়তো এ ধরনের সম্ভাবনা গুড়িয়ে দিতেই বর্ষীয়ান নেতাদের দূরে ঠেলে দিচ্ছেন মোদী। ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহের মতে, গত কয়েক মাসে বিজেপিতে মোদীর নেতৃত্বের প্রভাব স্পষ্ট। একজন কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে মোদী সব সময় চান সবাই তার সামনে ঝুঁকে থাকবে। তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী হয় সবাইকে তার অধীনস্ত হতে হবে নয়তো শত্রু। তিনি তার ইচ্ছানুযায়ী লোকের মাথা নোয়াতে চান। তার এ ধরনের বৈশিষ্ট্যকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার তুলনা করা যেতে পারে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। সে সময় কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি অনেক বেশি ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা কামরাজের মতো ব্যক্তি তখন কংগ্রেসের নেতৃত্বে ছিলেন। দলের কাছে জবাবদিহিতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এটা বুঝতে পেরে গান্ধী তখন বিভিন্ন উপায়ে সংগঠনকে দুর্বল করে ফেলেন। খুব শিঘ্রই তিনি কংগ্রেসকে বিভক্ত করে ফেলেন এবং তার বিশ্বস্তদের দিয়ে একটি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে, বিজেপি এখন একটি মতভিন্নতার দলে পরিণত হয়েছে। এক সময় অটল বিহারী বাজপেয়ী, আদভানি, যশোবন্ত সিংয়ের মতো নেতারা সমন্বিতভাবে দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাদের মধ্যে জবাবদিহিতার সম্পর্ক ছিল। ২০০৪ সালে বিজেপি’র নেতৃত্বাধীন জোট সরকার পরাজিত হওয়ার পর বাজপেয়ী অসুস্থ হয়ে পড়লে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। তার প্রধান সেনাপতি আদভানি দলের নেতা হন যদিও ২০০৯ সালে তারা জয়লাভ করতে পারেনি। ২০০৯ সালের পর থেকে নতুন নেতা হিসেবে আস্তে আস্তে উত্থান হতে থাকে মোদীর। যদিও গুজরাট দাঙ্গায় তার নেতিবাচক ভূমিকার অভিযোগ ছিল। এবারের নির্বাচনে যদি পূর্ব ধারণা অনুযায়ী বিজেপি জয়লাভ করে তবে কংগ্রেসের মতো সংগঠনে পরিণত হবে বিজেপি। যেখানে একজনই সব না হোক দলের বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।