প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি কংগ্রেসের

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২২:১৫
ভারতে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই। প্রার্থীরা বহুমুখী প্রচারণার পাশাপাশি জনগণকে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করতে শুরু করেছে। এই ইশতেহারকে বলা যেতে পারে জনগণকে দেয়া রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির লিখিত দলিল। ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দল তাদের এবারের ইশতেহারে জনগণের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে গরীব মানুষের বাসস্থান ও স্বাস্থ্য পরিসেবা বৃদ্ধিরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারতের সবচেয়ে পুরনো অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলটি। বুধবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী এই ইশতেহার প্রকাশ করেন। ভারতজুড়ে যখন মোদীজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তখন কংগ্রেসের মনে কাঁপুনি ওঠাই স্বাভাবিক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা খাদের কিনারে এসে পৌঁছেছে। আহত বাঘের মতো জোরালো কামড় বসানোর আশায় আছে। সেই আশার বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন শক্তপোক্ত ও আশার ফুলঝুরিতে সাজানো নির্বাচনী ইশতেহার দিয়ে। কংগ্রেসের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারের শ্লোগান হলো ‘আপনার কণ্ঠ, আমাদের প্রতিশ্রুতি’। রাহুল গান্ধী গত কয়েক মাসে দেশটির স্তরের প্রায় ১০ হাজার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের চাহিদার ভিত্তিতে এই নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করেছেন। অন্যদিকে, চলতি সপ্তাহেই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে পারে হিন্দুত্ববাদী বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আগামী ১০ বছরে ২৫ কোটি নতুন চাকরির সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করবে তারা। এছাড়া তাদের ১০০টি নতুন ‘স্মার্ট’ নগর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। কংগ্রেসের ইশতেহার প্রকাশের পর তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, যদি এসব প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনে জয়লাভের জন্য হয়, তাহলে ২০০৯ সালের চেয়ে এবার আরো বেশি আসন পাবে কংগ্রেস। কারণ এবারের ইশতেহারে প্রতিশ্রুতির হার গতবারের প্রতিশ্রুতির চেয়ে দ্বিগুণ বলতে হবে। কিছু আছে ভালো কিন্তু মেয়াদ উত্তীর্ণ। প্রতিটি বাড়িতে টয়লেট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। আবার সাহসী প্রতিশ্রুতিও রয়েছে যেমন, সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হবে না, কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ দূত নিয়োগের মতো প্রতিশ্রুতি তারা দিচ্ছে। তবে অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি রয়েছে; যা কংগ্রেসসহ অনেকগুলো দল অনেক আগে থেকেই দিয়ে আসছে। যা দিয়ে জনগণকে পর্যুদস্ত করার কোনো কারণই নেই। নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নীতি অনেক বড় ব্যাপার। তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় বিশ্বাস, আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। ইশতেহার প্রকাশের দিন রাহুল গান্ধী বলেন, পাঁচ বছর আগে দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতির ৯০ শতাংশ পূরণ করা হয়েছে। জনমত জরিপকে উড়িয়ে দিয়ে রাহুল বলেন, নির্বাচনের ফলাফল সবাইকে ‘অবাক’ করে দেবে। রাহুলের কথা সত্যি হলে কংগ্রেস আজ যে স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে থাকার কথা নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধীরগতি, দুর্নীতির অভিযোগ ও জনমত জরিপের ফলে দেখা যায়, কংগ্রেসের পিঠ দেয়ালে এসে ঠেকেছে। আবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদী ও আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মধ্যেই মূল লড়াইটা হতে যাচ্ছে। আর জনমনে ‘নামেমাত্র’ রয়েছে কংগ্রেস। ইশতেহারের বিষয়ে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য হলো গরীব, মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণির জনগণের কথা মাথায় রেখে এবারের প্রতিশ্রুতি। তবে গরীব জনগোষ্ঠী সব সময় গুরুত্বের দিক থেকে প্রথম। আগেও তাদের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি বেশি ছিলো এবারও একই রকম। গরীবদের জন্য দেয়া প্রুতিশ্রুতির মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাই অন্যতম। ভারতের মোট জিডিপির মাত্র এক শতাংশ ব্যয় হয় স্বাস্থ্য খাতে। এ ব্যয় তিন শতাংশ করা হবে বলে জানিয়েছে কংগ্রেস। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় লক্ষ্য। তবে বাস্তবায়ন অনেক কঠিন। শ্রমিকদের শোষণের হাত থেকে বাঁচাতে সরকার কন্ট্রাক্ট লেবার আইন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে কর্ম পরিবেশ উন্নত করার কথাও জানিয়েছে। অন্যদিকে, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নমনীয় শ্রম বাজার সৃষ্টিরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি খুবই বৈপরিত্যমূলক। আবার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়ার প্রক্রিয়াও সহজীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ দূত নিয়োগের মতো ফাঁকিবাজি প্রতিশ্রুতি তো আছেই। তবে এবারের ইশতেহারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিল পাসের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়েও কিছু বলা হয়নি। এতোসব পরেও ২০১৪ সালের ইশতেহারে অনেক বড় প্রতিশ্রুতিই নিয়ে এসেছে কংগ্রেস। এখন জনগণ কতটা সমর্থন দেবে সেটা নির্বাচনের পটই বলে দেবে।