মিডিয়া যে অনেক কিছুই পারে, তার প্রমাণ মিলেছে আবারও। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় থর মরুভূমি অঞ্চলে খরার কারণে দুর্ভিক্ষ চলছে, এ খবরটা সেদেশের মিডিয়া প্রচার করেছিল ফলাও করে। কিন্তু সেখানে বস্তুত যা ঘটছে, তাকে ঠিক দুর্ভিক্ষ বলা চলে না। কাতারভিত্তিক একটি মিডিয়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে ভিন্নরকম সব তথ্য। তাতে অবাক না হয়ে উপায় নেই। তবে এ কথাটি ঠিক যে, সেখানকার লোকজন অপুষ্টিতে ভুগছে। দুর্ভিক্ষের খবরটি একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রথম আসে গত ৭ মার্চ। এর ফলশ্রুতিতে যা ঘটার তাই ঘটছে। সিন্ধু প্রদেশের থরপারকার জেলাকে দুর্যোগ-কবলিত এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। জেলার সদর দপ্তর মিথি পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ। তারপর থেকে রাজনৈতিক নেতাদের স্রোত বইছে ওদিকে। পৌঁছে গেছে ২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ৩ হাজার ৫৮২ টন গম, ২০১ টন চাল, ১ হাজার ৪৮৩ টন জরুরী খাবারের প্যাকেট এবং অন্যান্য খাদ্য সাহায্য। লক্ষ্য একটাই, তথাকথিত দুর্ভিক্ষে থরপারকার জেলার লোকজনকে কাবু হতে না দেয়া। এসব তথ্য জানিয়েছে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
মিথিতে জরুরী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৫৮ জন ডাক্তার রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। তাঁদের নাওয়া-খাওয়া ভোলার উপক্রম হয়েছে। জরুরী চিকিত্সা ত্রাণ ক্যাম্পগুলোতে প্রথম দুইদিনেই চিকিত্সা প্রদান করা হয়েছে ৫ হাজার ৩১৮ জনকে। এসব দেখে শহরের স্বাস্থ্য সুবিধাবলীর পেছনে ৩০ মিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খরার কারণে মারা যাওয়া ৭০টি শিশুর প্রত্যেক পরিবারকে ২ লাখ পাকিস্তানি রুপি (২ হাজার মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। তথাপি প্রকৃত তথ্য হল, থরপারকার জেলায় কোনো খরা বা দুর্ভিক্ষ চলছে না; রয়েছে খাদ্যের পর্যাপ্ত মজুদ। তাহলে দুর্ভিক্ষের খবর প্রচার করা হচ্ছে কেনো? বিষয়টি নিঃসন্দেহে যথেষ্ট ভাবনার।
পাকিস্তানের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছরটি ৩০ শতাংশ বেশি শুষ্ক। তবুও এটিকে খরা বলা চলে না। থরপারকার জেলায় গত ডিসেম্বর থেকে কোনো বৃষ্টি হয়নি সত্য; কিন্তু সেখানে কোনো বছরই শুকনো মৌসুমে বৃষ্টি খুব একটা হয় না। তাদের মতে সেখানে ‘আর্থ-সামাজিক দুর্যোগ’ চলছে। তাদের কথার আসলে সত্যতা রয়েছে। বাজারগুলোতে খাবার কিংবা খাদ্যদ্রবের কোনো অভাব নেই। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের সেগুলো কেনার মতো অর্থ নেই। তারই ফলশ্রুতিতে থরপারকার জেলায় ৪৭ শতাংশ শিশু মারাত্মকভাবে অপুষ্টির শিকার। ইথিওপিয়া, সোমালিয়ার শিশুদের মতো হাড্ডিচর্মসার না হলেও তারা অপুষ্টিতে যে ভুগছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পাকিস্তানের থরপারকার জেলায় শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৮৭, যার জাতীয় গড় প্রতি হাজারে ৬৯। এসব তথ্য দিয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (ডব্লুএফপি)।
সরকার পরিচালিত মিথি সাধারণ হাসপাতালের ডাক্তার চেতন দাস জানিয়েছেন, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সিন্ধু প্রদেশের নিম্নাঞ্চলে (যেখানে থরপারকার জেলা অবস্থিত) অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু ও বয়স্ক লোকের সংখ্যা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু এ কথাটি বলা ঠিক হবে না, অপুষ্টির কারণেই মৃত্যু বেশি পরিমাণে ঘটছে। তাঁর হাসপাতালের নিউট্রিশান স্টেবিলাইজেশান ওয়ার্ডে গত সেপ্টেম্বর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি করানো হয় ৯১টি শিশুকে। এর মধ্যে মারা যায় কেবল একটি শিশু। কিন্তু নিউমোনিয়া অথবা পেটের পীড়াজনিত কারণে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা ৩১। ষাট বছর বয়সী গঙ্গা বিবি’র দেয়া তথ্যের সঙ্গে এর মিল রয়েছে, ‘আমাদের গ্রামে ২৫ থেকে ৩০টি শিশু অসুস্থ; কিন্তু আমি জানি না তারা কোন রোগে ভুগছে। অনেককে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে আসা যাচ্ছে না অর্থের অভাবে।’ গঙ্গা বিবি’র গ্রামটি মিথি থেকে ৫০ কিলোমিটার এবং করাচি থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মিথির বাসিন্দা রাজেশ কুমারের অভিমত, অপুষ্টি অবশ্যই রয়েছে। যেসব পরিবারের মাসিক আয় ৩ থেকে ৪ হাজার রুপি (৩০-৪০ মার্কিন ডলার), তারা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক খাবারও কিনতে পারছে না। কিন্তু এটিই একমাত্র সমস্যা নয়। পানির সমস্যায় হিমশিম খাচ্ছে পুরো জেলার লোক। লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে কূপের পানি। এ সমস্যা দূর করা না গেলে থরপারকার জেলায় স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরো ভয়ানক রূপ নিতে পারে।
দারিদ্র্য নির্মূল বিষয়ে ২০ বছর ধরে কাজ করা একটি বেসরকারি সংগঠনের প্রধান জাফর জুনায়েদ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি হঠাত্ করেই তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রূপ। পরিবর্তিত জলবায়ু থরপারকারের লোকজনকে চরম দারিদ্র্য ও অপুষ্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখানে অধিকাংশ লোকের পেশা হচ্ছে গবাদিপশু পালন। কিছুদিন আগেও শুষ্ক মাসগুলোতে দলে দলে লোক অভিবাসিত হত আশেপাশের এলাকাগুলোয়। সেখানে গিয়ে তারা দিনমজুরের কাজ করার পাশাপাশি নিজেদের পশুগুলো চরাতো। এ সুযোগটি দিনে দিনে কমে যাওয়াতেই দুর্দশা নেমে আসছে ওই পরিবারগুলোয়। তারা অভিবাসনের জায়গাগুলোতে গিয়ে দেখছে, পশু চরানোর মতো খালি জায়গা অবশিষ্ট নেই এবং কাজও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর আগের মতো। এগুলোর কথা চিন্তা করেই তারা কষ্ট করে হলেও পড়ে থাকছে নিজ এলাকায়। এদের জন্য বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করা গেলেই পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি ঘটবে এবং এটিই প্রকৃত সমাধান।
