৫২৯ জনের গণমৃত্যুদণ্ড

মিসরে নতুন অশান্তির শুরু!

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২২:১৬
মিসরে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির ৫২৯ জন সমর্থককে একই দিনে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ঘটনা গোটা বিশ্বে সোরগোল তুলেছে। তাদের বিরুদ্ধে একজন পুলিশকর্মী হত্যা, সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতের এই রায়ে মিসরে নতুন করে অশান্তির সূত্রপাত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিক্ষিপ্ত গোলমাল শুরু হয়েছে। এই রায়দানের পর আদালতের কাছেই একাধিক স্কুলে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হচ্ছে দেশজুড়ে। একজন মানুষকে হত্যার ঘটনায় এতগুলো মানুষের মৃত্যুদণ্ডের রায় আলোচনা হচ্ছে সব মহলে। বিভিন্ন জনে বিভিন্ন মতামত দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, মাত্র একজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় এতজন মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া ন্যায়বিচার হতে পারে না। অভিযুক্তরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন এমন কথা বলা যাবে না। বিচার প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতরা কল্পনাও করতে পারেননি এজাতীয় একটা রায় আসতে পারে। মিসরের সেনা সমর্থিত বর্তমান সরকার এ রায় কার্যকর করতে পারবে কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত সোমবার এই রায় যখন ঘোষণা করা হয় তখন আদালতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১৪৭ জন অভিযুক্ত। বাকিদের হয় গ্রেফতার করা হয়নি কিংবা গ্রেফতার করা যায়নি। তাদের গ্রেফতারের ব্যাপারে পুলিশের তেমন গরজ ছিল না এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। অর্থাত্ আসামিদের সবাই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়নি। মিনা শহরে গত বছরের আগস্টে মুরসি সমর্থকদের বিক্ষোভের সময় পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে নিহত হন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির সমর্থকদের কায়রোর দুটি স্থান থেকে উচ্ছেদ করতে নিরাপত্তা বাহিনী শক্তি প্রয়োগ করার জের ধরে মিনায় ওই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের ৩ জুলাই সেনাবাহিনী দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতিবাদে কায়রোর ওই দুটি স্থানে অবস্থান ধর্মঘট করছিলেন তার সমর্থকেরা। পুলিশ হত্যা ছাড়াও দণ্ডপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে আর যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল তাতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায় না। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে একটি থানায় প্রবেশ, হত্যা চেষ্টা, জনগণের শান্তি বিনষ্ট করা ইত্যাদি। একজন মার্কিন সাংবাদিক বলেছেন, আদালত গণমৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলানোর সম্ভাবনা একেবারে ক্ষীণ। মিসরের দীর্ঘ আপীল প্রক্রিয়া রয়েছে। আবার দেশের প্রধান ইসলামি কর্তৃপক্ষ গ্র্যান্ড মুফতির কাছ থেকেও এই দণ্ড কার্যকর করার অনুমতি নিতে হবে। সুতরাং সহজে এই রায় কার্যকর করা নিয়ে সংশয় আছে সব মহলে। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মাত্র দুটি সেশন বিচার কাজ চলার পরই ৫২৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে আসামিদের আইনজীবীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তারা বলছেন, অভিযুক্তদের জীবন নিয়ে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে এর মাধ্যমে। অপরদিকে, আইন বিষয়ক একজন ইতিহাসবিদ জানিয়েছেন, এর আগে কোনো আদালত এত কম সময়ে এত বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেননি। দণ্ডপ্রাপ্তদের পক্ষে আদালতে কাউকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের আইনজীবীদের আদালত কক্ষে ঢুকতেই দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ। অনেকে বলছেন, এক পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনায় ৫২৯ জন জড়িত ছিল এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর অন্য যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তার খেসারত কোনোভাবেই প্রাণ দিয়ে দেয়ার কথা নয়। আধুনিক মিসরের ইতিহাসে একসঙ্গে এত জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার নজির নেই। নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ মুরসির মোট ১২শ’ সমর্থকের বিচার চলছে। তবে, মাত্র শ’ দেড়েক অভিযুক্ত শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। বাকিরা ফেরার। তাদের অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন সাজাপ্রাপ্তরা। ‘গ্র্যান্ড মুফতি’র কাছে গেলে তিনি এই রায় খারিজও করতে পারেন। চূড়ান্ত রায় জানা যাবে আগামী ২৮ এপ্রিল। আদালতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাজাপ্রাপ্তদের আইনজীবীরা। তাদের অভিযোগ, বিচারকরা আইনের ন্যূনতম তোয়াক্কা না করে একপাক্ষিকভাবে রায় দিয়েছেন। তারা সওয়াল করার সুযোগ পাননি। ৩ হাজার পৃষ্ঠার বেশি তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়েছে। কিন্তু সেটি একঝলক দেখার সৌভাগ্যও হয়নি আসামিদের আইনজীবীদের। ফলে, ওরা কোন অপরাধে কী শাস্তি পেল সে ব্যাপারে সবাইকে অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে। উচ্চ আদালতে আবেদন করলেও, তাতে কতটা কাজ হবে, তা নিয়ে সন্দিহান আইনজীবীরা। গত বছর জুলাই মাসে মোহাম্মদ মুরসি সেনাবাহিনী দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হবার পর মিসরের কর্তৃপক্ষ ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযান চালিয়েছে। এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। গ্রেফতার হয়েছেন হাজার হাজার। মুসলিম ব্রাদারহুডের শীর্ষস্থানীয় নেতা মোহাম্মদ বাদিকেও আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছে। লন্ডনে মুসলিম ব্রাদারহুডের মুখপাত্র আব্দুল্লাহ আল-হাদ্দাদ বিবিসিকে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এটা শুধুমাত্র একটি হুমকি বলে মনে হচ্ছে। আদালতে আপীল হবে এবং এই রায়ের পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু এই সাজা প্রমাণ করে মিসর এখন একটি স্বৈরতন্ত্র। মুসলিম ব্রাদারহুডকে ভয় দেখানো হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সামরিক অভ্যুত্থানের পর এটাই হলো নতুন মিসর। নতুন মাত্রার স্বৈরতন্ত্র। রায় ঘোষণা উপলক্ষে অভিযুক্তদের স্বজনরা আদালতের বাইরে ভীড় করেন। বিক্ষোভ করতে গিয়ে সামান্য অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনে তারা হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করেন। তাদের কান্নার শব্দে আদালত পাড়ার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। মিসরের প্রখ্যাত আইনজীবী নাবিল আবদেল সালাম এই বিচারকে ‘দ্রুততম বিচার’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আইন বিভাগে অধ্যয়নরত দ্বিতীয় বর্ষের একজন ছাত্রও এমন রায় ঘোষণা করবে না। এই মামলায় এত খুঁত আছে যে তা গুনে বের করা কঠিন।’ এই গণমৃত্যুদণ্ডের রায়ে নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তারা বলেছে, এটা যে ন্যায়বিচার নয় তা বুঝতে কারো খুব কষ্ট হবার কথা নয়। সেনাবাহিনী মিসরে তার ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত করতে বিরোধী মত ধ্বংস করে দিতে এই বিচারের আয়োজন করেছে বলে তাদের অভিযোগ। তবে আসামিদের কিংবা মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে যতই অভিযোগ করা হোক না কেন, মিসরে সেনাশাসন এখন অনেক পোক্ত। ব্রাদারহুডকে আর পাখা মেলতে দিতে তারা রাজি নয়, এমনটাই সন্দেহ করছেন অনেকে। এই রায়ের মাধ্যমে হয়তো তাদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আর তা হলো- হয় মাথা নত করে থাকো, নইলে এমন পরিণতির জন্য তৈরি থেক!