‘জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক ও দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি’-এই বক্তব্যের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা ও তার কঠোর বিচার দাবি করেছেন সরকারি দল আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) ও ১৪ দল শরিক জাসদের জ্যেষ্ঠ নেতারা। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় তারা প্রত্যেকেই অভিন্ন কণ্ঠে বলেছেন, সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী খালেদা জিয়ার এই বক্তব্য রাষ্ট্র্রদ্রোহের শামিল। ইচ্ছাকৃতভাবে সংবিধান লঙ্ঘনের মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ করায় তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিতে তারা সংসদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব আনার এবং তাকে সংসদে তলব করে তার জবাব চাওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিকাল সোয়া ৫ টায় বসা অধিবেশনের শুরু থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত (মাঝখানে ২০ মিনিটের মাগরিবের বিরতি ছাড়া) প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই আলোচনায় তারা খালেদা জিয়ার ওই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। একইসঙ্গে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে লাখোকণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে গিনেজ বুকে বাংলাদেশের নাম ওঠানো নিয়েও খালেদা জিয়া যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিরও কড়া সমালোচনা করেন তারা। খালেদা জিয়ার পাশাপাশি তারা তার পুত্র তারেক রহমানেরও কঠোর সমালোচনা করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, খালেদ জিয়ার এই বক্তব্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিচারবিভাগের সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ’৭১ এর ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা ও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর ২৫ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন চলে। সেই অসহযোগ আন্দোলনই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। আজকে খালেদা জিয়ারা কেন এই বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান, সেটি বুঝতে হবে। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে একই চক্র বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করতে চেয়েছিল।
এর আগে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়াকে বলব, দয়া করে আপনি আর এসব কথাবার্তা বলবেন না। এসব কথাবার্তা বন্ধ করুন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আপনি বন্ধ করতে পারেননি। গণআন্দোলন তো দূরের কথা, এই বাংলাদেশে আপনি কোনো আন্দোলনই আর করতে পারবেন না। ৩০ মার্চ, দিনটি আপনার জন্য ভালো নয়। ১৯৯৬ সালের এইদিনে আপনার পতন ঘটেছিল। এবার আপনি নির্বাচন করেননি, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী। আপনার বক্তব্যে আপনি কী বলেননি! এমনকি ভারতের বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আপনার কোনো কথা নেই। আন্দোলনের নামে বাসে পেট্টোল বোমা মেরে মায়ের কোলে ঘুমন্ত নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করতেও আপনার বুক কাঁপেনি। এর বিচার বাংলাদেশে হবেই। এজন্য একদিন আপনাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কিছু মানুষ আছে, নানা কারণে যাদের স্মৃতিশক্তি লোপ পাচ্ছে, মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে পাগল হয়ে গেছে। টেনশনে, কষ্টে, দুঃখে তাদের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটছে। এজন্য তারা আবোল-তাবোল বকছে। সেটিই করছেন খালেদা জিয়া ও তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গ।
তোফায়েল আহমেদ আরও বলেন, কঠিনদিনে বঙ্গবন্ধু খালেদা জিয়াকে সাহায্য করেছিলেন। তার সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা উচিত ছিল। এবারের ২৬ মার্চ যখন গোটা বাংলাদেশের মানুষ এক কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাইলো, সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কটাক্ষ করে খালেদা জিয়া প্রমাণ করলেন-তিনি আসলে পািকস্তানকেই ভালোবাসেন। সেদিন ‘আমার সোনার বাংলা....আমি তোমায় ভালোবাসি’ না গেয়ে যদি ‘পাকসাদ.... জমিন বাদ’ গাওয়া হতো তাহলে হয়তো তিনি খুশি হতেন। আজকে (গতকাল) যে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা চলছে, এখানে যদি তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে তিনি বলেন, ‘আমি পাকিস্তানকে পছন্দ করি’। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়ার প্রিয় দেশ পাকিস্তান। তিনি যেসব কথা বলেছেন, এটা কোন কথা? স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এই বাংলাদেশে আজ আমাদের এসব কথা শুনতে হবে? উনি কোথা থেকে পেলেন যে, জিয়াউর রহমান দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন? তিনি তো ছিলেন সপ্তম রাষ্ট্রপতি। এ দেশের এবং স্বাধীনতার চেতনার মূল্যবোধের কেউ যদি ক্ষতি করে থাকেন, তাহলে সেটি করেছেন জিয়াউর রহমান।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, বিএনপি নেত্রীর বক্তব্যের ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক কোনো ভিত্তি নেই। বিএনপির ওয়েবসাইটেই আছে, জিয়াউর রহমান সপ্তম রাষ্ট্রপতি। একটা মিথ্যাকে ঢাকতে তারা আরেকটি মিথ্যার জন্ম দিচ্ছে। অপরাধী যতোই অপরাধ করে যাক না কেন, এর চিহ্ন রেখে যায়। বিএনপি, বেগম জিয়া ও তার পুত্র (তারেক রহমান) পদে পদে মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন। মিথ্যার মধ্যে তাদের জন্ম, মিথ্যার মধ্য দিয়েই তারা চলতে চায়। কিন্তু সত্যের ভিত্তি ও জ্যোতি এত তীব্রতর যে, মিথ্যা দিয়ে তা ঢাকা যায় না।
তিনি আরও বলেন, গ্রামাঞ্চলে একটি কথা বলে, কেউ অসংলগ্ন কথা বললে বলা হয় তার ছিঁড়ে গেছে। বিএনপি, এর চেয়ারপারসন ও তার পুত্রেরও তার ছিঁড়ে গেছে। ২৬ মার্চ জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে আমরা কেন ইতিহাস সৃষ্টি করলাম, সেটিই তাদের অন্তর্জ্বালা। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের চিরশত্রুতা।
মতিয়া চৌধুরীর আগে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন। সুতরাং দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাস বিকৃতির নামে খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যকে সংসদ ও সংবিধান প্রশ্রয় দিতে পারে না। এখনই তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ২৬ মার্চের জাতীয় সঙ্গীতের সমান্তরালে আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে আসা অনৈতিহাসিক।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ডাকমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বলেন, সংবিধানের ভিত্তিতে গঠিত এই সংসদকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাকে তলব করে জবাব চাওয়ার অধিকার এই সংসদের রয়েছে। পাগলের পাগলামি না থামালে তার পাগলামি আরও বেড়ে যায়। তার মাথা মুড়ে দিতে হয়। এতদিন আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিইনি বলেই তার সাহস বেড়ে গেছে। এখন তার মাথাটা একটু নামিয়ে দেয়া দরকার।
বিকেলে এই আলোচনার সূচনা করে জাসদের মাইনুদ্দীন খান বাদল বলেন, খালেদা জিয়া অর্বাচিনের মতো বাংলাদেশের অস্তিত্ব, জাতির পিতা ও স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে এই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সংসদ ও সংবিধানের বরখেলাপ, এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
তিনি বলেন, ’৭১ এর ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান কোনো ঘোষণা দেননি। ওইদিন সারাদিন আমরা হান্নান সাহেবের বক্তব্য শুনেছি। জিয়াউর রহমান রেডিওতে বক্তব্য পাঠ করেন ২৭ মার্চ। বেগম জিয়া, আপনার কাছে কি প্রমাণ আছে যে, আপনার স্বামী ২৬ মার্চ কর্ণফুলি নদী অতিক্রম করেছেন? ২৭ মার্চ জিয়া রেডিওতে যখন উল্টাপাল্টা কথা বলছিলেন, তখন এ কে খন্দকারসহ অনেকেই বলেছেন- এ কোন পাগলকে রেডিও স্টেশনে হাজির করা হয়েছে! তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর খালেদা জিয়া উন্মাদের মতো কথা বলছেন। কথায় বলে ‘পাগলে কী না বলে....., ছাগলে কী না খায়’।
তোফায়েল আহমেদের পর জাতীয় পার্টির (জাপা) কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, সাংবিধানিকভাবে নিষ্পন্ন হওয়া কিছু বিষয় নিয়ে বিএনপি নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করছে। তাদের উদ্দেশ্য দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা। ‘জিয়াউর রহমান প্রথম রাষ্ট্রপতি এতদিন পর একথা শুনে পাগলেও হাসে। তিনি বলেন, জাপা একটি স্বাধীন রাজনৈতিক দল। কার সঙ্গে, কোন ইস্যুতে কখন আমরা নির্বাচন করবো, সেটি আমাদের বিষয়। তা তো খালেদা জিয়ার কাছ থেকে জানতে হবে না। রাজনীতি একটি কৌশল। খালেদা জিয়া সেই কৌশলে হেরে গেছেন। আমরা আমাদের দল করি, আমরা কী তার কথায় পদত্যাগ করবো? আমরা কী তার দল করি! নাকি তার সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি আছে? পাঁচ বছরের এক ঘণ্টা আগেও আমরা পদত্যাগ করবো না।
ফিরোজ রশীদ আরও বলেন, আপনি আমাদের পিঠের চামড়া তুলে নেয়ার যে কথা বলেছেন, তা প্রত্যাহার করুন। ভবিষ্যতে আর আমাদের নিয়ে কখনও কটূক্তি করবেন না। জাপার পিঠের চামড়া তুলে নেয়ার সাহস কারও নেই। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জাতীয় নির্বাচনে না এসে বিএনপি দেশে এখন অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করছে। আমাদের চামড়া তুলে নেয়ার হুমকি দিলেন, একটি দলের চেয়ারপারসন কীভাবে আরেকটি দলের নেত্রী সম্পর্কে এভাবে কথা বলতে পারলেন?
তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমতি দিলে আমি নিজে বাদী হয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করতে চাই। দীর্ঘ এই অনির্ধারিত আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের ফারুক খান ও জাপার মুুজিবুল হকও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
