চলনবিল জাদুঘর, অযত্ন অবহেলার নিদর্শন

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৪, ২৩:০৩
চলনবিলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক চলনবিল জাদুঘর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও অযত্ন-অবহেলায় সব হারাতে বসেছে। দীর্ঘ ২৫ বছরে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ইতিমধ্যেই বিনষ্ট হয়ে গেছে অনেক দুর্লভ প্রাচীন নিদর্শন। বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি সরকারিকরণের পর অবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়েছে। বছরদুয়েক আগে জাদুঘরটি জমির জটিলতা ও রাজস্ব আদায় না হওয়ার ‘অজুহাতে’ স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও এলাকাবাসী সূত্র জানায়, ১৯৭৮ সালে চলনবিলের কৃতী সন্তান অধ্যাপক এমএ হামিদের উদ্যোগে এবং এলাকাবাসীর সহায়তায় চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার ব্রত নিয়ে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা খুবজীপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় চলনবিল জাদুঘর। প্রথম পর্যায়ে ৮ শতাংশ জায়গা রেজিষ্ট্রিমূলে জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়। সেইসাথে চলনবিল ও উপমহাদেশের অনেক দুর্লভ নিদর্শন সংগ্রহ করে আনা হয় এ জাদুঘরে। পরে জাদুঘরটি উন্নয়নের লক্ষ্যে নরওয়ে সরকারের প্রজেক্ট নরওয়ে এজেন্টি (নোরাট) ১ লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করে, যা দিয়ে জাদুঘরের পাকা দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। জাদুঘরটি আরো সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায় থেকে সরকারি পর্যায়ে স্থানান্তর করা হয়। এ সময় জাদুঘরটি বগুড়া মহাস্থানগড়ে অবস্থিত মহাস্থান জাদুঘরের অধীনস্ত করা হয়। নিয়োগ দেয়া হয় একজন কর্মকর্তা ও ৩ জন কেয়ারটেকার। ওই নিয়োগদান ছাড়া সরকারি আর কোন উন্নয়ন কার্যক্রম না থাকায় জাদুঘরটি বেহাল অবস্থায় পর্যবসিত হয়। গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুরে অবস্থিত চলনবিল জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, জাদুঘরের উপরের ৩টি রুমে থাকেন কেয়ারটেকার আর নিচের ৩টি রুমে চলে জাদুঘরের কার্যক্রম। একটি রুম ব্যবহার করে অফিস হিসেবে অপর ২টি রুমে রয়েছে নিদর্শনাবলী। অফিসে কর্মকর্তা পর্যায়ের কাউকে পাওয়া যায়নি। জানা যায়, তিনি মাঝেমধ্যে এখানে আসেন। মূলতঃ জাদুঘরটি পরিচালনা করছেন ৩ জন কেয়ারটেকার। ভবনটি দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। সর্বত্রই অযত্ন আর অবহেলার ছাপ। প্রবেশপথেই রয়েছে চলনবিলের কৃতী সন্তান প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকারের পোড়ামাটির মূর্তি। এছাড়াও সংগৃহীত দুর্লভ নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে তুলট কাগজ ও গাছের ছালে লেখা প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুঁথির পান্ডুলিপি, বিভিন্ন সময়ের স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র ও ধাতব মুদ্রা, সুলতান নাসিরউদ্দিনের নিজ হাতে লেখা পবিত্র কুরআন শরীফ, বিভিন্ন ধরনের প্রস্তর ও পোড়ামাটির ভাস্কর্য মূর্তি, রাজা, সম্রাট, সুলতান ও নবাবদের ব্যবহূত তরোবারিসহ যুদ্ধাস্ত্র, রাণী ভবানীর স্মৃতিচিহ্ন, মনসা মঙ্গলের বেদি ও ঘট, বগুড়ার কবি রুস্তম আলী কর্ণপূরীর দলিল-দস্তাবেজ ও উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে সংগৃহীত ঐতিহাসিক নিদর্শন। জাদুঘরটির পাশেই রয়েছে খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও এম.হক ডিগ্রি কলেজ। খুবজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. দোলন বলেন, জাদুঘরটি সরকারিকরণের সময় জাদুঘর স্থানান্তর করা যাবে না শর্তে হস্তান্তর করা হয়। জায়গা নিয়ে সমস্যা রয়েছে তা থাকবে না। তাছাড়া জাদুঘরে যাওয়ার জন্য সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নত হয়েছে। চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, জাদুঘরে প্রয়োজনীয় লোকবলসহ সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দর্শক হারাচ্ছে, হারাচ্ছে অস্তিত্ব। স্থানীয় মেধাবিকাশ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, চলনবিলে অনেক গুণীমানুষের জন্ম। চলনবিলের কৃষ্টি সংগ্রহণ করে চলনবিলকে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু জাদুঘরটি সরকারিকরণের পরে আরো শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। যে প্রত্যাশা নিয়ে এলাকাবাসী জাদুঘরটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছিল তার বিন্দুমাত্র পূরণ হয়নি। উন্নয়নের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। অথচ বেসরকারি থাকলে এর চেয়ে ভালোভাবে পরিচালিত হতে পারতো হয়ত। যে কোন মূল্যে এই সমৃদ্ধশালী জাদুঘরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বগুড়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক জানান, চলনবিল জাদুঘরের ভবনটি সংস্কারের আর কোন উপায় নেই। এ ছাড়া জাদুঘরের জন্য বাস্তবে কোন জায়গাও নেই। যে জায়গায় রয়েছে তা মূলতঃ স্কুলের জায়গা। এছাড়া স্থানটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় দর্শনার্থীরা খুব একটা এখানে আসেন না। ফলে কোন রাজস্বও নেই। খুবজীপুর এম হক ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. রসুল মৃধা বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পিছিয়ে পড়া চলনবিল জনপদের মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে ধারণা দেয়ার লক্ষ্যে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হলেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ ধ্বংস হতে বসেছে।