রাস্তা দিয়ে চলছেন। শহরের রৌদ্রোজ্জ্বল পথ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ঘটল অস্বাভাবিক ঘটনা। আচমকা উচ্ছল তরুণ-তরুণীর উদ্দাম নৃত্য। পাশে থাকা আরও কয়েক জন এসে যোগ দিয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে উচ্ছ্বাস। সবার মুখেই ‘চার ছক্কা হই হই’। আশপাশের পথচারীরা হতবাক। চারপাশে উত্সুক মানুষের ভিড়। সর্ব সাধারণের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হলেন সেই জনাকয়েক ব্যক্তি।
এর নাম ‘ফ্ল্যাশ মব’! যার অর্থ-আকস্মিক একটি স্থানে জড়ো হয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। চকিত এই নর্তন-কুর্দনকে বিশ্বব্যাপী ডাকা হচ্ছে ফ্ল্যাশ মব নামে। আইসিসি টি-টোয়েন্টি-২০১৪ এর থিম সং কে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করে এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। অফিশিয়াল ইভেন্ট সংটি তৈরি হওয়ার পর একটা ঘোষণা এসেছিল। বলা হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আয়োজন করা হবে ফ্ল্যাশ মবের। তারপর সেগুলোর ভিডিও আপ করা হবে ইউটিউবে। সেখানে সর্বাধিক ভোট পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ই হবে বিজয়ী। ঘোষণার পরপরই তাতে অংশ নেয় দেশের প্রায় ৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার পর ১৫ দিন পর বের হলো ফলাফল। আর এতে প্রথম হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। দ্বিতীয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হয়েছে তৃতীয়। এসব ফ্ল্যাশ মব তৈরিতে সমন্বয়কের কাজ করে এডভারটাইজিং প্রতিষ্ঠান গ্রে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাশ মব দলের একজন সাবরিনা ফারাহ। তিনি জানান- তার অনুভূতির কথা, ‘আইসিসির এ আয়োজনের কথা শুনেই আমরা সবাই খুব আগ্রহী হয়েছিলাম। আমাদের ফ্ল্যাশ মবে অংশ নিয়েছিল বিভিন্ন বিভাগ থেকে ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী। এতে ঈগল ড্যান্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল মূল কোরিওগ্রাফার। রাস্তায় অনেক যানজট থাকার পরও অনেক কায়দা করে আমরা স্যুটিং সম্পন্ন করেছি। অনেক কষ্টের এই ফ্ল্যাশ মব প্রথম হওয়ার পর আমরা খুব আনন্দিত’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাশ মবের আয়োজনে ছিলেন মেহেদী হাসান রনি, আবিদ হাসান, আল-আমিনসহ আরও অনেকে। তাদের এ আয়োজন সম্পর্কে মেহেদী হাসান রনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিভাগ থেকে ৫০ জনের অধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি জনপ্রিয় স্থাপত্য যেমন, রাজু ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, স্বাধীনতা সংগ্রাম, কার্জন হলকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আসলে আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে উত্সাহিত করতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছি।’
এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। দেশের প্রথম সারির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজস্ব ঢংয়ে তৈরি করেছে ফ্ল্যাশ মব। ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাশ মব-এর আয়োজক জাহিদ গগন জানান, ‘আমরা প্রায় দু’শ’ জন শিক্ষার্থীর অংশ গ্রহণে এটি তৈরি করি। এতে আমরা একটু দেশি ধাঁচ আনার চেষ্টা করেছি। পতাকার রং আর ক্ল্যাসিক নাচের সমন্বয় করেছি।’
এ আয়োজন আজ শুধু দেশেই নয়। দেশের সীমানা পেরিয়ে তা বহির্বিশ্ব পর্যন্ত পৌঁছেছে। সিটি কলেজ অফ নিউইয়র্ক, আর্লিংটনের ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস এবং ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অফ রাশিয়ার বাঙালি ছাত্রদের তৈরি ফ্ল্যাশ মবের ভিডিওগুলো ইউটিউবের দর্শক যা র্যাঙ্কিংয়ে যথাক্রমে সপ্তম, আঠার ও একুশতম স্থান দখল করে আছে।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অপেরা হাউজের সামনে ম্যাকাউরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি প্রায় ৩০ শিক্ষার্থী একটি ফ্ল্যাশ মবে অংশ নেয়। প্রবাসে অবস্থান করে ফ্ল্যাশ মবে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন বাণিজ্যে স্নাতকে অধ্যয়নরত রওনক জাহান নিশা, আমরা এক সপ্তাহ অনুশীলন করেছি। বিদেশে বসে বহুজাতিক পরিবেশে এ রকম একটি কাজে অংশ নিয়ে গর্ব বোধ করছি। আরও ভালো লেগেছে এই দেখে যে, ভাষার তফাত্ থাকার পরও ভিনদেশিরাও এটা উপভোগ করেছে ভালোভাবে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ইভেন্ট সংয়ের সঙ্গে ফ্ল্যাশ মব তৈরির উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিল বিজ্ঞাপনী সংস্থা গ্রে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক এম এ মারুফ বলেন, ‘দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়েছিলাম বেশি প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য। আর ফলাফল নির্ধারিত হলো ইউটিউবে সর্বাধিক সংখ্যক ভোটের ভিত্তিতে। প্রথম হওয়া ভিডিওটি ম্যাচ চলার সময় দেখানো হচ্ছে। আইসিসির ওয়েবসাইটেও থাকছেই।’
বাংলাদেশের মাটিতে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির সুবাতাস বইছে সারা বিশ্বে । আর সেই বাতাসে আরও সুঘ্রাণ লাগিয়েছে দেশের তরুণদের করা ফ্ল্যাশ মব। উত্সাহ দিয়েছে ক্রিকেটারসহ এর প্রতিটি প্রেমিককে। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে উন্মোচন করেছে ভিন্ন আঙ্গিকে।
