ছয় মাসেই দর অর্ধেকে বেশিরভাগ কোম্পানির

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৫৭
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানির যে দর থাকে ৬ মাসের মধ্যে তা অর্ধেকে নেমে আসে। আর এক বছরের মধ্যে তা আরও কমে তলানিতে চলে আসে। গত তিন বছর ধরে তালিকাভুক্ত হওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির ক্ষেত্রেই এ প্রবণতা দেখা গেছে। কোম্পানির শেয়ার দর নির্ধারণে বিনিয়োগকারীদের আনাড়ি সিদ্ধান্তকে এজন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার থেকে টাকা সংগ্রহের পর কোম্পানির আয় কমে যাওয়াকেও দায়ী করা হচ্ছে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কোন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির মৌল ভিত্তি বিবেচনা করে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনা দরকার। অতিরিক্ত দামে শেয়ার না ক্রয় করার পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, গুজবে কান না দিয়ে বুঝে শুনে শেয়ার কেনা উচিত। গেল বছরে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বরকতুল্লা ইলেক্ট্রো ডায়নামিকসের তালিকাভুক্তির দিন শেয়ার দর ছিল ৭৩ টাকা। ৬ মাসে কোম্পানির দর নেমে আসে ৩৬ টাকায়। প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল তালিকাভুক্তির পর শেয়ার দর ৪৫ টাকায় শুরু হয়ে তর তর করে ৭২ টাকায় চলে যায়। বর্তমানে ৪৪ টাকায় নেমে এসেছে। এপ্রিলে তালিকাভুক্তির দিন ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার দর ছিল ৭৫ টাকা। কয়েকদিনের মধ্যে তা ৮৫ টাকায় উঠে যায়। তবে ৬ মাসের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ার দর ৫৩ টাকায় নেমে আসে। গত ২৪ ডিসেম্বর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় এ্যাপোলো ইস্পাতের শেয়ারের দাম ছিল ৪০ টাকা। তিন মাসের মাথায় কোম্পানির শেয়ার দর নেমে এসেছে ২৭ টাকায়। ৪ মার্চে তালিকাভুক্তির সময় গোল্ডেন হারভেস্টের শেয়ার দর ছিল ৭৬ টাকা। ৬ মাসের মধ্যে দাম নেমে আসে ৪৫ টাকায়। এক বছরের মধ্যে দাম ৩৮ টাকায় নেমে আসে। তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানির শেয়ার দর ভালো থাকলেও পরবর্তীতে কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা হতাশ। তারা বলছেন, আইপিওতে শেয়ার পেয়ে তা রেখে দিলে লাভবান হওয়ার পরিবর্তে ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা আইপিওতে শেয়ার পাওয়ার পর তা রেখে দেয়াকে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন। এদিকে শেয়ার তালিকাভুক্তির ৬-৭ মাস পর বড় দর পতনের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আইপিওতে পাওয়া শেয়ার ধরে রাখার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। এব্যাপারে গ্লোবাল সিকিউরিটিজে লেনদেনকারী কামাল হোসেন বলেন, তালিকাভুক্তির পর একটি কোম্পানির শেয়ার দর যা হওয়া উচিত বিনিয়োগাকারীরা তা বিবেচনা না করেই অতিরিক্ত দামে কিনে পরে ক্ষতির শিকার হন। কিন্তু যখন দাম কমে যায় তখন অনেক কমে গেলেও আর ওই শেয়ার কেনার আস্থা পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় তালিকাভুক্তির পর শেয়ারের দাম কত হওয়া উচিত তা কোম্পানির মৌল ভিত্তি বিবেচনা করেই কেনা উচিত। ২০১২ সালে তালিকাভূক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই বছর ৯ এপ্রিল তালিকাভুক্তির দিন জিএসপি ফাইনান্সের শেয়ার দর ছিল ৫২ টাকা। ৬ মাস পর দাম নেমে আসে ৩০ টাকায়। এক বছরের মাথায় এ কোম্পানির শেয়ার দর ২৩ টাকায় নেমে আসে। একই মাসে তালিকাভূক্তির সময় জিপিএইচ ইস্পাতের শেয়ার দর ছিল ৮০ টাকা। ৬ মাসের মধ্যে ৬০ টাকা আর এক বছরের মধ্যে শেয়ার দর নেমে আসে ৩৫ টাকায়। তালিকাভুক্তির পর পর আমরা টেকনোলজির শেয়ার দর ৮৪ টাকায় লেনদেন হয়। এরপর ৬ মাসের পর শেয়ার দর নেমে আসে ৩০ টাকায়। বর্তমানে ৪০ টাকার নিচেই লেনদেন হচ্ছে কোম্পানিটির। জুলাইয়ে তালিকাভুক্তির পর ইউনিক হোটেলের শেয়ার দর এক মাসের মধ্যে ১৫৭ টাকায় উঠে যায়। আট মাস পর শেয়ার দর নেমে আসে ৬৯ টাকায়। পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের তালিকাভূক্তির সময় ১৮ এপ্রিল শেয়ার দর ছিল ১৬১ টাকা। মাত্র আড়াই মাসের মাথায় শেয়ার দর ৮০ টাকায় নেমে যায়। বর্তমানে এর দাম ৭৮ টাকা। এদিকে তালিকাভূক্তির ৬/৭ মাস পর শেয়ার দর কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে বিবেচনা করতে পারছেন না। একটি কোম্পানির শেয়ার দর কত হওয়া উচিত তা সঠিকভাবে বিবেচনা না করে অনেকেই শেয়ার ক্রয় করেছেন। পরবর্তীতে মৌল ভিত্তি অনুযায়ী শেয়ারের চাহিদা কমে দাম কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বাজারে আসার আগে ভালো আয় দেখালেও তালিকাভুক্তির পর আয় কমে যাওয়ায় শেয়ার দর কমে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে কোম্পানির দুর্বলতাই দায়ী। ২০১১ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই বছরের ১৭ জানুয়ারি দেশবন্ধু পলিমারের শেয়ার দর তালিকাভুক্তির দিন ছিল ৭৪ টাকা। কয়েকদিনের মধ্যেই শেয়ার দর ৯৩ টাকায় উঠে যায়। এরপর শুরু হয় দর পতন। এক বছরের মাথায় শেয়ারের দাম নেমে আসে ২৪ টাকায়। ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি তালিকাভুক্তির দিন রংপুর ডেইরি ও ফুড প্রোডাক্টসের শেয়ার দর ছিল ১৩৩ টাকা। এক বছরের মধ্যে শেয়ার দর নেমে আসে ৬২ টাকায়। তবে এরপর শেয়ার দর কিছুটা ঊর্ধ্বমূখী হয়। তবে চারটি কোম্পানি ছিল ব্যতিক্রম। এগুলোর দাম কমার চেয়ে বরং বেড়েছে।