তিনি প্রকৃতই নক্ষত্র। নিজের অভিনয় দ্যুতি দিয়ে দশকের পর দশক আলোকিত করে রেখেছেন এ দেশের নাট্যাঙ্গন। ক্যামেরায় যদি শুধু মাত্র তারই মুখ ধরা থাকে, তিনি যদি কোনো কথা না বলে শুধু এক্সপ্রেশন দিয়ে যান, পাঁচ-দশ মিনিট কখন যে চলে যাবে বুঝতেই পারবেন না। আর এ কারণেই তার পুরোনো সহকর্মীদের কেউ কেউ তাকে বলেন, ‘শি ইজ লাইভ রিপ্রেজেন্টেটিভ অব এক্সপ্রেশন।’ বলুন তো কে এই কাব্যের রানি? নিশ্চয়ই আপনি ভাবছেন আপনার প্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার কথা! হ্যাঁ, সত্যিই তাই। আমরা গর্ব করে বলি ‘আমাদের সুবর্ণা মুস্তাফা’। চিরসবুজ এই অভিনেত্রীকে নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
একসময় টেলিভিশন নাটকে নায়িকার ভূমিকায় সুবর্ণা মুস্তাফা ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনাই করা যেত না। এখনও অভিনেত্রী হিসেবে তিনি অত্যন্ত উজ্জ্বল। চলনে-বলনে, হাসি-কান্নায় তার অভিনয় স্বকীয়তায় ভাস্বর। তিনি ‘বুঝে অভিনয় করেন’। ফলে তার অভিনয় অত্যন্ত স্বাভাবিক, অতি অভিনয়ে দুষ্ট নয়। অভিনয়ের সময় সুবর্ণা মুস্তাফার অভিব্যক্তি ক্ষণে ক্ষণে বদলায়, না বলা কথাকে বাঙ্ময় করে তোলে। বিশেষ করে তার ডাগর ডাগর দুটি চোখ, সে চোখের দৃষ্টি চরিত্রের প্রয়োজনে সদা ঘুরে বেড়ায় অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে। অনেক সিনিয়র কিংবা খুব জুনিয়র—সহশিল্পীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে ও ক্ষমতা সুবর্ণাকে করেছে অতুলনীয়। শুটিংয়ের সময় সুবর্ণা মুস্তাফা শুধু নিজেই অভিনয় করেন না, নানা সহযোগিতায় সহশিল্পীদের অভিনয়ও উজ্জ্বল করে তোলেন। নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের কাছে সুবর্ণা মুস্তাফা একটি স্বপ্নের নাম। তার সহশিল্পীদের অনেকেই বলেন, ‘সুবর্ণা মুস্তাফা যদি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে জন্মাতেন, তিনি ওয়ার্ল্ড ফেমাস হতেন। একজন চিরসবুজ অভিনেত্রী, আমাদের সুবর্ণা মুস্তাফা, বাংলাদেশের অহংকার।’
তিনি ১৯৬০ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা গোলাম মুস্তাফা ছিলেন টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা। আবৃত্তিকার হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। মা হোসনে আরাও ছিলেন ভালো অভিনেত্রী, নাট্যকার ও রেডিও প্রযোজক। সুনিপুণ সাংস্কৃতিক পরিবেশের ভেতরই সুবর্ণা মুস্তাফা বেড়ে উঠেছেন। ভিকারুনন্নেসা নূন স্কুল এবং হলিক্রস কলেজে পড়ার সময় তিনি ছিলেন সবার মধ্যমণি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন, ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন আমাদের টিভি নাটকের দর্শকপ্রিয় মুখ। এর আগে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বেইলি রোডের মঞ্চে সীমিত পরিসরে। জনপ্রিয় অভিনেতা ও নাট্যপরিচালক আল মনসুর তাকে থিয়েটারে নিয়ে আসেন এবং অভিনয়টা শিখেছেন নাট্যজন ও চিত্রপরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফের কাছে। মূলত সত্তরের দশকের শেষ দিকে তিনি অভিনয়ে নিয়মিত হয়ে ওঠেন। নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে ধীরে ধীরে জাদুর মতো টানতে শুরু করেন এদেশের সর্বস্তরের টিভি দর্শককে। একবাক্যে বলা যায়—টেলিভিশনের এক এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেত্রী এখন পর্যন্ত সুবর্ণা মুস্তাফাই।
ছোটবেলায় সবার স্বপ্ন থাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই সুবর্ণা মুস্তাফা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অভিনয়ে ক্যারিয়ার গড়বেন। আর এই স্বপ্ন দেখাটা হয়েছিল একমাত্র মায়ের অনুপ্রেরণাতেই। পরবর্তীতে কলেজের চৌকাঠ পেরুতে না পেরুতেই তিনি অভিনয়ে নিয়মিত হন। এর পরের গল্পটা আরও উজ্জ্বল। অভিনয় দিয়েই রাজকন্যার মতো দেশের তরুণ হূদয়ে ঝড় তোলেন। আমাদের দেশে দশকের পর দশক ধরে কয়েক প্রজন্মের প্রিয় অভিনেত্রী হয়ে থাকার বিরল কৃতিত্ব একমাত্র সুবর্ণা মুস্তাফারই। তিনি অভিনয়ই শুধু নয়, আবৃত্তিতেও অসাধারণ। নিতান্তই আবেগের বশে যে কলা তিনি শিখতে শুরু করেন, অল্প দিনের মধ্যেই সেই আবৃত্তি তার সবচেয়ে প্রিয় শখ হয়ে ওঠে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, উইলিয়াম শেক্সপিয়র, জসীমউদদ্ীনের কবিতা তার সবচেয়ে পছন্দের। উনিশ শতকের আধুনিক ইংরেজ কবি টিএস এলিয়টের কবিতা তাকে দারুণভাবে টানে। তার লেখা ‘দি ওয়েস্টল্যান্ড’ বহুবার আবৃত্তি করেছেন। পাশাপাশি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান এবং মহাদেব সাহা তার বেশি ভালো লাগে।
আবৃত্তি, মঞ্চ, চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকের সুবর্ণা মুস্তাফা প্রায় চার দশক ধরে কাজ করেছেন। বেশ কিছু মানসম্মত বাংলা চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। নানা কারণে চলচ্চিত্রে তিনি বেশি সময় দেননি। মঞ্চে তিনি দাপটের সঙ্গে থাকলেও সেখানে তার দর্শক ছিল সীমিত। ফলে টিভি নাটকের মাধ্যমেই তিনি এদেশের মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। সুবর্ণা মুস্তাফা অভিনীত প্রথম মঞ্চনাটক ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’। এছাড়া ‘কীর্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘শকুন্তলা’, ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘হাত হদাই’, ‘বনপাংশুল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’ ইত্যাদি নাটকে সুঅভিনয়ের জন্য সবার প্রশংসা পেয়েছেন। প্রয়াত খ্যাতিমান নির্মাতা আবদুল্লাহ আল মামুনের আগ্রহেই ছোট পর্দায় তার অভিষেক ঘটে। প্রথম টিভি নাটক ছিল ‘বরফ গলা নদী’। তার অভিনীত অন্যান্য জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘দূরবীণ দিয়ে দেখুন’, ‘কূল নাই কিনার নাই’, ‘আজ রবিবার’, ‘তবুও জীবন’, ‘চোখের বালি’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’, ‘সেদিনও বৃষ্টি ছিল’, ‘আকাশ কুসুম’, ‘চেহারা’, ‘অলৌকিক’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘পারলে না রুমকি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘সংশপ্তক’, ‘কাছের মানুষ’, ‘খেলাঘর’, ‘অস্থির পাখিরা’, ‘ডলস হাউস’ প্রভৃতি। ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি অভিনয়ের বড় ক্যানভাসে কাজ শুরু করেন। তবে তিনি নিয়মিত গড়পরতা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। বরাবরই কিছু জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। তবে মূলধারার কয়েকটি চলচ্চিত্রেও তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। ‘নয়নের আলো’ ছবিতে তার অভিনয় সব শ্রেণীর দর্শককে নাড়া দিয়েছিল ব্যাপকভাবে। তার অভিনীত আলোচিত অন্যান্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—‘লাল সবুজের পালা’, ‘সুরুজ মিয়া’, ‘নতুন বউ’, ‘ফুলের মালা’, ‘স্ত্রী’, ‘অপহরণ’, ‘বাংলার কমান্ডার’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘ফাঁসি’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘১৯৭১’। সুবর্ণা মুস্তাফাকে ১৯৮২ সালে ‘নতুন বউ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়ার হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। কারণ এই ছবিতে তিনি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। অথচ তাকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছিল পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে। সুবর্ণা মুস্তাফাকে মানুষ বারবার টিভি নাটকের কারণেই বেশি পছন্দ করেছেন। তাই অভিনয় জীবনে অসংখ্য টিভি নাটক দিয়ে তিনি জয় করেছেন দর্শকচিত্ত। এখনও সেই সাফল্যের গতি চলমান। দেশীয় শোবিজের নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রায় সবারই মডেল ও পছন্দের তালিকায় রয়েছেন তিনি। ১৯৮৬ সালে সুবর্ণা মুস্তাফা বাংলা নাটকের নন্দিত অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার সাথে বিচ্ছেদের পর নাট্যপরিচালক ও অভিনেতা বদরুল আনাম সৌদকে বিয়ে করেন। বর্তমানে অভিনয়ের পাশাপাশি সুখের সংসারে দিন অতিবাহিত করছেন চিরসবুজ এই অভিনেত্রী। আগামী ৮ এপ্রিল অভিনয়ের এই বর্ণিল প্রজাপতিকে আজীবন সম্মাননা জানাবে কালচারাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ (সিজেএফবি)। আজীবন সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি প্রসঙ্গে সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন, ‘সিজেএফবি আমাকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করছে, সেজন্য সংগঠনটিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ ধরনের সম্মাননার জন্য এর আগেও আমার কাছে প্রস্তাব এসেছিল, তখন আমার মনে হয়েছে আমি রেডি না। এবার আমি স্থিরভাবে চিন্তা করে দেখলাম যে, আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আজ অবধি আমি অভিনয়ের সাথেই আছি। আগামী বছর আমার মিডিয়াতে কাজ করার ৪০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এ সময় এই রকম সম্মাননা পেতে ভালোই লাগছে।’
কি ছু ক থা
১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি অভিনয়ের বড় ক্যানভাসে কাজ শুরু করেন। তবে তিনি নিয়মিত গড়পরতা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। বরাবরই কিছু জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। তবে মূলধারার কয়েকটি চলচ্চিত্রেও তার উপস্থিতি লক্ষণীয়।
