প্রায় হাজার কোটি টাকার ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ঠেকাতে পারেনি জাল ভোট-কেন্দ্র দখল। এ পর্যন্ত পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার কোন গুরুত্বই ছিল না। অথচ ভুয়া এবং জাল ভোট ঠেকাতে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল। নাগরিকদের ধারণা দেয়া হয়েছিল, এ তালিকা হলে একজনের ভোট অন্যজন দিতে পারবে না। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচন কমিশন ভোটার আইডি কার্ড দেয়ার কথা বলে ৫শ’ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। বর্তমানে এক হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অনেকটা একই ধরনের অন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আগে বিচারপতি আব্দুর রউফের নেতৃত্বাধীন কমিশন গ্রহণ করেছিল ভোটার আইডি কার্ড সংক্রান্ত প্রায় একশ’ কোটি টাকার পাইলট প্রকল্প। কিন্তু কোন কিছুই জাল ভোট, কেন্দ্র দখল বন্ধ করতে পারেনি। এবারের উপজেলা নির্বাচনে কোথাও কোথাও সরকারি কর্মকর্তা ও প্রিজাইডিং অফিসার-পোলিং অফিসারদের ব্যালট পেপারে ইচ্ছামতো সিল মারতে দেখা গেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এমনই যদি হয়, তাহলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কেন এ ধরনের প্রকল্প নেয়া হলো। নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোটি টাকার প্রকল্প দিয়ে নয়; নির্বাচন সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণ করতে হলে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ-দক্ষ হতে হবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মানসিকতা থাকা দরকার।
বিগত বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে বিচারপতি এম এ আজিজ কমিশন নতুন করে ভোটার তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ নতুন করে ভোটার তালিকা প্রণয়নের ব্যাপারে আপত্তি জানায়। তারা দাবি করে আইন অনুযায়ী কমিশনের কাজ হচ্ছে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ২০০১ সালে প্রণীত ভোটার তালিকাকে মূল হিসেবে ধরে ভোটার তালিকা হালনাগাদের নির্দেশ দেয়। আজিজ কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ সম্পন্ন করার পর এ নিয়ে বিতর্ক ওঠে। আওয়ামী লীগ দাবি করে ওই তালিকায় এক কোটি ২৫ লাখ ভুয়া ভোটার রয়েছে। তত্কালীন সরকারি দল ওই ভুয়া তালিকা ব্যবহার করে জালভোট দেবে এমন অভিযোগও ওঠে সে সময়। আওয়ামী লীগসহ সুশীল সমাজ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়নের দাবি জানায়। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর ভোটার আইডি কার্ড প্রণয়নের কারণ দেখিয়ে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেয়। তত্কালীন ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন থেকে জানানো হয়, সারাদেশের যোগ্য ভোটারকে ভোটার আইডি প্রদান করতে আঠারো মাস সময় লাগবে। ভোটার আইডি কার্ডের মাধ্যমে জাল ভোট বন্ধ ও ভুয়া ভোটার বাদ দেয়ার উদ্দেশ্যে ৫শ’ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ভোটারদের আইডি কার্ড না দিয়ে দেয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র। সে সময়ে নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়, ভোট দিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন পড়বে না। যদিও ভোটের প্রয়োজনে এটা করা হয়েছিল। কিন্তু ভোটার আইডি কার্ড না দিয়ে করা হয় ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা। ওই তালিকা আবার সবাইকে দেয়া হয় না। এমনকি ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদেরও দেয়া হয় না। ভোটের সময় এটি শুধু থাকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের কাছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন এসে আগের প্রকল্পকে বর্ধিত রূপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১১ সালের জুলাইয়ে শুরু হয় নাগরিকদের স্মার্ট কার্ড প্রদানের প্রকল্প। আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেমস ফর এনহেন্সিং অ্যান্ড এক্সেস টু সার্ভিস (আইডিয়া) প্রকল্পের আওতায় দেশের সব নাগরিককে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের মতই একটি স্মার্ট কার্ড দেয়া হবে। আড়াই বছর আগে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ বছর। কিন্তু যে মূল উদ্দেশ্যে এ প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হচ্ছে সেটাই ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও বিতর্কমুক্ত করার জন্য ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হলেও জাল ভোট কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। বরং এবারের উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক হারে জাল ভোট পড়েছে। জাল ভোটের কারণে অনেক ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেননি। একাধিক অভিযোগ করার পরও কোন প্রতিকার পাননি তারা।
এবার প্রথম ধাপে অধিকাংশ উপজেলায় উত্সবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় ধাপে সহিংসতা কিছুটা বৃদ্ধি পায়, জাল ভোটের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু তৃতীয় ধাপ থেকে শুরু হয় কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের মহড়া। পঞ্চম ধাপে এসে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ধাপে ধাপে সহিংসতা ও জাল ভোট বাড়তে থাকে। কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতি রোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসন অনেক স্থানেই সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল। প্রথম ধাপে ৯৭টি উপজেলায় নির্বাচন হয়। এর মধ্যে ১৬টি উপজেলার ৬৫টি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দ্বিতীয় ধাপে ১১৫টি উপজেলায় নির্বাচন হলেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল প্রায় ১০০ কেন্দ্রে। মৃত্যু হয় একজনের। তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে মূলত সহিংসতা-কেন্দ্র দখল এবং ব্যাপক হারে জাল ভোট প্রদানের ঘটনা ঘটে। তৃতীয় ধাপে তিনজন এবং চতুর্থ ধাপে নির্বাচনের দিন চারজন ও পরে আরো তিনজন মারা যায়। পঞ্চম দফায় মোট কেন্দ্রের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। ভোটকেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারা, নির্বাচনের সরঞ্জাম ছিনতাই, এজেন্টদের বের করে দিয়ে ভোট জালিয়াতি, দুপুর গড়ানোর আগেই ভোটের বাক্স ভর্তি করে ফেলার ঘটনা আগের চেয়ে বেশি ঘটে। পাঁচ হাজার ৪৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় এক হাজার ১০০ কেন্দ্রে এ ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ২৫টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। মোট পাঁচ ধাপের নির্বাচনে নোয়াখালী সদরের ১১৭টিসহ ২৫৭টি কেন্দ্র ভোট স্থগিত করা হয়েছে। ৭৯টি উপজেলায় ভয়াবহ আকারে জাল ভোট পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাল ভোটের খণ্ড চিত্র
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য শ্বশুরবাড়ি রাজেন্দ্রপুর থেকে বাবার বাড়ি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া বেপারীপাড়া কেন্দ্রে এসেছিলেন শিরিন আক্তার। তার ভোটার নম্বর ছিল ৬৩৫। নম্বর স্লিপ নিয়ে ঘুরছিলেন শিরিন আক্তার, এ বুথ থেকে ওই বুথে। শেষ পর্যন্ত হতাশ হলেন। কারণ, তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছেন। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা বিভাষ চন্দ্র সাহা বললেন, এমন তো ঘটার কথা নয়। মুখ থেকে বোরকার নেকাব সরিয়ে শিরিন বললেন, প্রমাণ চান? আমার চেহারার লগে আইডি কার্ড আর ভোটার নম্বর মিলাইয়া দ্যাখেন। এই যে দ্যাখেন, আমার বুইড়া আঙ্গুলে কালির ছাপ নাই। চুপ করে গেলেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা। শুধু কেরানীগঞ্জ উপজেলা নয়, এবারের চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনে অনেক উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্রের চিত্র ছিল এ রকম।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞের অভিমত
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, সুক্ষ্ম কারচুপি রোধ করার জন্য ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার দরকার ছিল। কিন্তু এখনতো প্রকাশ্য কেন্দ্র দখল করে ভোটারবিহীন নির্বাচন হচ্ছে। ফলে ছবিযুক্ত ভোটার দিয়ে কি হবে ? এটা এখন থেকেও লাভ নেই। তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। আইন সংস্কার করলেও নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী ভূমিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কোনভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তা বিনষ্ট করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার যা বললেন
নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা থাকার পরও উপজেলা নির্বাচনে কিছু জালভোট, কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে বলে স্বীকার করেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের নির্দেশ মেনে কাজ করেননি বলে এমনটা হয়েছে। তবে যারা নির্বাচনী অনিয়মে জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
