দীর্ঘ কয়েকমাস পর ঢাকা থিয়েটার গত ২৯ মার্চ, ২০১৪ তারিখে ঢাকার সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে আবারও শো করল উইলিয়াম শেক্শপিয়রের রচনা, রুবাইয়াত্ আহমেদের রূপান্তর ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর নির্দেশনায় নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’। লন্ডনের অলিম্পিক উত্সব কেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ‘গ্লোব থিয়েটার’-এ শেক্শপিয়র উত্সবে ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকটি বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করার জন্য প্রযোজিত। এ উত্সবে ৩৭টি ভাষায় শেক্শপিয়রের ৩৭টি নাটক উপস্থাপিত হয়েছে। উপনিবেশ ও জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসনমুক্ত হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশজ বাংলা নাট্যআঙ্গিকে ঢাকা থিয়েটার এ নাটক উপস্থাপন করছে। ‘দ্য টেম্পেস্ট’ ঢাকা থিয়েটারের ৩৬তম প্রযোজনা।
‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটক প্রযোজনা ব্যাখ্যানে দুটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এ নাটকের অন্তঃব্যঞ্জনার নিরিখে চৌদ্দ শতকে এভাবেই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ভারতভূমে ইউরোপীয়রা উপনিবেশ সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয়ত—ঔপনিবেশিক জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য ও সৃষ্ট ইতিহাস বিভ্রান্তির বিপরীতে হাজার বছরের বহমান বাংলা নাট্যবৈশিষ্ট্যের পুনরুদ্ধার নিরীক্ষামূলক উপস্থাপন। কাহিনি, নৃত্য, গীত-অভিনয়ের অদ্বৈত বৈশিষ্ট্যান্বিত বাংলা নাট্য। উপনিবেশ বিযুক্তিকরণ চিন্তা বর্তমান বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা-ক্ষেত্র। বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রেই স্বাধীনতার ৪৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও অদৃশ্যগত এক উপনিবেশের অনুকৃতি এখনো ক্রিয়াশীল এবং ‘বাংলাদেশ’ অদৃশ্য শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত। এ উপনিবেশ জ্ঞানতত্ত্ব ও সৃষ্ট ইতিহাসের বিপক্ষে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যআঙ্গিকে ঢাকা থিয়েটার উপস্থাপন করেছে এ নাটক।
গ্রুপ থিয়েটারে মুভমেন্টের ধারায় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, আরণ্যক, ঢাকা থিয়েটার, থিয়েটার প্রভৃতি নাট্যদলগুলোর যখন প্রতিষ্ঠা তখন স্বকীয় দেশজচিন্তন ধারার অঙ্গীকার নিয়ে ‘ঢাকা থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যান্য নাট্যদলগুলোর মধ্যে ‘ঢাকা থিয়েটার’ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। উপনিবেশ পরিবেশনা তত্ত্বের বিপরীতে স্বভূমিজ, স্ব-উত্তরাধিকারী, ঐতিহ্যবাহী নাট্য প্রযোজনার প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে ‘ঢাকা থিয়েটার’। প্রথম দিকে নিরীক্ষাধর্মী নাট্য উপস্থাপন করলেও উত্তর সময়ে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারাতেই পূর্ণ অভিনিবেশ স্থাপন করে। ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় হাজার বছরের বহমান বাঙালি জীবন, ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনবোধ, সংস্কৃতি, সংস্কার, সমাজ ও সংগ্রামী চেতনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকা থিয়েটারের আঙ্গিক ও উপস্থাপন কৌশল নিরীক্ষায় আবহমান বাংলার বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি, চারদিকের খোলামঞ্চ, অদ্বৈতশিল্প বৈশিষ্ট্যে পরস্ফুিট হয়ে ওঠে। বাংলা নাট্যআন্দোলনে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর উপস্থাপন নিরীক্ষা, সেলিম আল দীনের ইতিহাসচেতনা ও নাট্যরচনা, সৈয়দ জামিল আহমেদসহ অনেকের কর্ম প্রচেষ্টায় ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটার বাংলার জাতীয় নাট্যবৈশিষ্ট্যের আন্দোলনী ভূমিকায় ক্রমধাবমান হয়ে ওঠে। দলীয় আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঢাকা থিয়েটার সুভ্যিনিয়রে উল্লেখ করে, ‘আমাদের লক্ষ্য জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণ। ঔপনিবেশিক অবলেপসমূহ ঝেড়ে ফেলে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতি ও শিল্পরীতির গভীর পর্যবেক্ষণ, শিক্ষণ, চর্চা ও প্রয়োগের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা নাটক নির্মাণ আমাদের মূল লক্ষ্য।’ নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও সেলিম আল দীন, দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসনে হারিয়ে যাওয়া, আমাদের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিক ইতিহাসকে অর্থাত্ দু’শ বছরের মধ্যখণ্ডনকে পাশ কাটিয়ে তুলে ধরেন বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি ও বাংলা নাট্যঐতিহ্য। সংস্কৃত ও পাশ্চাত্যের নন্দনতত্ত্বের প্রভাব কাটিয়ে বাঙালি নাট্য-সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে চান। কিন্তু ঢাকা থিয়েটারের ইদানিং প্রযোজনাগুলো নিয়ে ভাববার বিষয় রয়েছে। দীর্ঘ দিনের ঢাকা থিয়েটারের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য আন্দোলনের আদর্শচ্যুতি আমাদের কাম্য নয়।
নাট্যকার উইলিয়াম শেক্শপিয়রকে ইউরোপীয় উপনিবেশ এমনভাবেই আমাদের মনন-মগজ ও পরম্পরায় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, নতুন করে তাঁকে নিয়ে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ অতবেশি দাবি করে না। যা হোক, শেক্শপিয়র একজন বৈশ্বিক নাট্যকার। মানুষের মানবিক অন্তর্ঘাতই তাঁর অধিকাংশ নাটকের বিষয়বস্তু। গ্রিক ধ্রুপদী আঙ্গিককে নিজস্ব সৃজন ক্ষমতায় সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রতিটি নাটক। উইলিয়াম শেক্শপিয়র ১৫৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করে ১৬১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হচ্ছে—ম্যাকবেথ, হ্যামলেট, কিং লিয়ার, রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট, ওথেলো, জুলিয়াস সিজার, মার্চেন্ট অব ভেনিস, কোরিওলেনাস ইত্যাদি। ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকটি শেক্শপিয়রের জীবনের শেষদিকের রচনা। নাট্যকাহিনি গড়ে উঠেছে একটি দ্বীপকে কেন্দ্র করে। মিলানের অধিপতি প্রসপেরো শিশুকন্যা মিরান্ডাকে নিয়ে আপন সহোদরের ষড়যন্ত্রে নির্বাসিত হয়ে ভাসতে ভাসতে এসেছিলেন এ দ্বীপে। এ দ্বীপে আপন সাধনা, শক্তি ও কূটকৌশলে তিনি প্রাকৃতিক নানা শক্তি, এমনকি অশরীরী শক্তিকেও অধিগত করেন। ধীরে ধীরে কূটকৌশলে দাসে পরিণত করে ফেলেন দ্বীপবাসীকে। অশরীরী এরিয়েলকে দিয়ে সমুদ্রের বিশাল ঝড় তুলে শত্রুপক্ষকে নিয়ে আসেন প্রসপেরো। মিরান্ডা-ফার্ডিন্যান্ডের প্রেম-পরিণতি, প্রতিশোধ ইত্যাদি নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে উপনিবেশমুক্ত হয় দ্বীপবাসী। উপনিবেশের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে দ্বীপবাসী স্বাধীনতার মুখ দেখে। এভাবেই ঘটনা এগিয়ে চলে।
‘দ্য টেম্পেস্ট’ প্রযোজনাটি উত্সর্গ করা হয়েছে শ্রদ্ধেয় সেলিম আল দীনকে। প্রযোজনাটি গ্লোব থিয়েটারে মঞ্চায়নের উদ্দেশ্যে নির্মিত বলে প্রসেনিয়াম মঞ্চব্যবস্থাপনার মধ্যে বাংলা নাট্যমঞ্চ বৈশিষ্ট্যের আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে। বাংলা নাট্যের পরিবেশনা বৈশিষ্ট্যে প্রতিটি চরিত্র ও অনুষঙ্গই সর্বক্ষণ মঞ্চে উপস্থিত। অর্থাত্ আসরের মতো মঞ্চের কলা-কুশলী মঞ্চের আপস্টেজে অপেক্ষমাণ। ঘটনা প্রবহমানতায় স্ব স্ব চরিত্ররূপ নিয়ে নাট্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। পেছনে সায়াক্লোমায় ৩টি সমুদ্রগামী জাহাজের সাজেটিক ডিজিটাল প্রিন্ট রাখা হয়েছে। সাথে রয়েছে পালের নৈর্ব্যক্তিক সজ্জা। জাহাজের সম্মুখভাগে অঙ্কিত ‘রাজা’ কেন্দ্রিক মুখায়বের মধ্যদিয়ে আধিপত্য সৃষ্টিকারী অনুষঙ্গের প্রতীকী চিত্র রাখা হয়েছে। নাট্যটি উপস্থাপনে গদ্য ও পদ্যের ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। দৃশ্যান্তরে বাংলার মণিপুরী নৃত্যের ব্যবহার করা হয়েছে। অভিনয়শিল্পীর চরিত্ররূপ সজ্জা ব্যবহারের জন্য গ্রিনরুম ব্যবহার না করে স্ব স্ব পেটিকা বা পেটরা থেকে পোশাক পরিবর্তনের উপাদান বের করে পরিবর্তনীয় চরিত্রে রূপদান করেছে। বাংলা নাট্যের শুরু বন্দনাপর্ব অক্ষুণ্ন রেখে পাঁচালি পরিবেশন রীতির নিরিখে নাট্যটি উপস্থাপিত হয়েছে। পোশাক পরিকল্পনায় নৈর্ব্যক্তিকতার চমত্কার ব্যবহারের মাধুর্যে স্থান-কাল-প্রেক্ষিত উপেক্ষা করে চরিত্র ও বিষয় হয়ে উঠেছে সর্বকালের। আলোক পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য অসাধারণ। সংগীত ও নৃত্য পরিকল্পনায় বাংলা ঐতিহ্যবাহী নৃত্য-সংগীত কুশলতায় অনন্য সাধারণ হয়ে উঠেছে নাটকটি। তবে নৃত্যের ক্ষেত্রে মণিপুরী নৃত্যকেই অধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মঞ্চচলন ক্রিয়ায় অভিনয়শিল্পীরা ছান্দিক গতিতে বিচরণ করেছে। চলনছন্দেও এক অব্যক্ত ভাবের ইঙ্গিত রয়েছে। নৃত্য-গীত-অভিনয়-সংলাপ সবকিছুই এক অভেদ্য সুরে একাকার অর্থাত্ অদ্বৈত বৈশিষ্ট্যে একীভূত। ঢাকা থিয়েটার এ নাট্য উপস্থাপনে দলের বাইরের ৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বগুড়া থিয়েটারের রুবল লোদী, মণিপুরী নটপালার নীলমণি সিনহা ও বিধান সিনহাকে।
প্রচলিত শেক্শপিয়রিয়ান নাট্য উপস্থাপনা যাঁরা দেখতে অভ্যস্ত ও শেক্শপিয়রিয়ান নাট্যতত্ত্ব বা এলিজাবেথিয়ান নাট্যরীতির অনুসারী, তারা এ প্রযোজনাটি দেখে সম্ভবতই তীব্র বিরক্ত ও বিরোধিতার সম্মুখবর্তী হতে পারেন। কারণ, তাদের কাঙ্ক্ষিত চিত্ররূপ ও তত্ত্বের সমন্বয় ‘দ্য টেম্পেস্ট’ প্রযোজনায় কতটুকু, তা আরেক নিরীক্ষার বিষয়। প্রতীকী ক্যালিবানের জাগরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাট্যের শেষ দৃশ্যে ক্যালিবান চরিত্রটি শত বছরের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, শক্ত-সমর্থ ও উচ্চশির হয়ে দাঁড়ায়। চারদিকের হাজার বছরের জীবন-সংস্কৃতি শঙ্খধ্বনির প্রতীকে ফুটে ওঠে। উপনিবেশমুক্ত হয় দ্বীপবাসী। অত্যন্ত নান্দনিক উপস্থাপনা এটি। অভিনয়-আলো-সংগীত থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি বিষয়ই অসাধারণ। এমন নান্দনিক প্রযোজনায় ঢাকা থিয়েটার নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
বাঙালি নাট্যের পাঁচালি ধারায় এ সমকালীন নাট্য বৈচিত্র্যে উপস্থাপিত। পাঁচালি মধ্যযুগের একটি অন্যতম নাট্যাঙ্গিক। পাঁচালি শব্দটি ‘পঞ্চাল’ ‘পঞ্চলিকা’ বা ‘পঞ্চাবলি’ শব্দ থেকে উত্পত্তি। পাঁচালি নামকরণের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের যৌক্তিকতা রয়েছে। তারমধ্যে ‘পা চালিয়ে চালিয়ে অভিনয় করা’, ‘পাঁচজন গায়ক’ ‘পাঁচ অঙ্ক বা বিভাজন বিশিষ্ট’ ছিল—এরূপ কারণে নামকরণ বলে অনেকে অভিহিত করে থাকেন। পাঁচালি আঙ্গিকে বিস্তরণ সাধারণত কথা, পদ, নাচাড়ি, বোলাম ও রাগাশ্রিত হয়ে থাকে। বাংলার মধ্যযুগে পরিবেশিত নাট্যের অধিকাংশই পাঁচালি আঙ্গিকে ছিল বলে নানা তথ্যে বিধৃত হয়। বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতির বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে মঞ্চ ছিল আসরকেন্দ্রিক। ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের শিল্প-নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। একই সাথে বর্ণনা, গান, নৃত্য, অভিনয়, কথা সবকিছুই এ নাট্যে একীভূত বা অদ্বৈত। বর্ণনা, সংলাপ ভিত্তিক পাঁচালি ও কথকতার ধারায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বাংলা নাট্য। সেলিম আল দীন দীর্ঘ পরিশ্রম ও গবেষণা দ্বারা বাঙালির নিজস্ব শিল্পবৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু স্যুভিনিয়রে উল্লেখ করেন, ‘দ্য টেম্পেস্ট’ বিষয় বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বা শাশ্বত, কিন্তু আঙ্গিক এবং রীতি সম্পূর্ণ ইউরোপীয়। শেক্শপিয়রের প্রায় সকল নাটকের বিষয় মানবজীবনের অন্তর্গত সত্যের বিষ্ময়কর উন্মোচন এবং তা জাতি, ধর্ম, কালভেদে আন্তর্জাতিক। শেক্শপিয়র প্রিয়, কিন্তু অত্যন্ত কঠিন কাঠামোর আঁটসাঁট তাঁর গড়ন। সেই শক্ত কাঠামো ভেদ করে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী আঙ্গিকের অভিজ্ঞতায় নতুন নাট্যভাষায় তাঁর নাটক মঞ্চে পুনর্নির্মাণ প্রায় দুঃসাধ্য। ...বিষয়ের দিক থেকে ‘দ্য টেম্পেস্ট’ শেক্সপিয়রের অন্য নাটকগুলো থেকে বেশ ভিন্ন চরিত্রের। শেক্সপিয়রের নাটকে হত্যা অবধারিত, কিন্তু এই নাটকে তা অনুপস্থিত। বিস্ময়করভাবে চারশ বছরেরও অধিককাল আগে শেক্সপিয়র ব্রিটিশ উপনিবেশের নিপীড়ন-নির্যাতন উপলব্ধি করেছিলেন এবং অত্যন্ত সাহসের সাথে তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘‘দ্য টেম্পেস্ট’’-এ প্রকাশও করেছেন। তিনি শৃঙ্খলিত জাতি-মানুষের বেদনা, কষ্ট, ঘৃণা উপলব্ধি করেছিলেন। যদিও ক্যালিবান চরিত্র পরিচিতিতে তিনি ‘‘সেভেজ’’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। হয়তো এটি রাজরোষ থেকে রেহাই পেতে কৌশলও হতে পারে। আমার নির্দেশনার মূল লক্ষ্য ছিল, ঔপনিবেশিকতার শিকার মানুষের ক্ষোভ-সংগ্রামকে সম্যক উদ্ভাসন করা। সেলিম আল দীনের ‘‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’’ তত্ত্বের আলোকে তা করার প্রয়াস নিয়েছি। নৃত্য, গীত, সংলাপ, অভিনয় সবকিছুর আলাদা অস্তিত্ব মান্য করে অভিন্ন এক শিল্পরূপ খোঁজার চেষ্টা রয়েছে আমার নির্দেশনায়। এ প্রযোজনায় আমি যুগপত্ বিস্ময় এবং আনন্দের সাথে প্রত্যক্ষ করেছি, ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যরীতির গ্রহণক্ষমতা দেখে। শেক্সপিয়রের মতো মহত্ কবি এবং নাট্যকারের শক্ত গাঁথুনির পঞ্চাঙ্কের নাটককে অনায়াসে আমাদের নাট্যরীতি ও ভাষায় মঞ্চায়ন সম্ভব।’
ঢাকা থিয়েটারে ৩৬তম প্রযোজনা ‘দ্য টেম্পেস্ট’। মূল রচনা : উইলিয়াম শেক্শপিয়র, অনুবাদ ও রূপান্তর : রুবাইয়াত্ আহমেদ, নির্দেশনা : নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, শিল্পনির্দেশনা : ঢালী আল মামুন, পোষাক পরিকল্পনা : শিমূল ইউসুফ, নৃত্য ও সংগীত পরিকল্পনা : শিমূল ইউসুফ, নীলমনি সিনহা, বিধান সিনহা প্রমুখ। অভিনয়ে—রুবল লোদী, শিমূল ইউসুফ, এশা ইউসুফ, চন্দন চৌধুরী, খাইরুল ইসলাম পাখি, সামিউন জাহান দোলা, কামাল বায়েজীদ, শহীদুজ্জামান সেলিম, রুবাইয়াত্ আহমেদ, সাজ্জাদ রাজীব, রফিকুল ইসলাম, নীলমনি সিনহা ও বিধান সিনহা।
