এথেনা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের আয়োজনে হামিদুজ্জামান খানের একক প্রদর্শনী

ভাস্কর্যের সাথে মানুষ ও প্রকৃতির যোগাযোগ

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪১
হামিদুজ্জামান খানের কাজে নানা বৈচিত্র্য ও লক্ষণ প্রতিভাত হয়। সৌন্দর্য সৃষ্টির সহজাত প্রক্রিয়ায় থেকেও তিনি ভাস্কর্যের বিষয়ে আনেন সরলতা, জ্যামিতি, কৌণিক উর্ধ্বমুখী ভাবনা। আকৃতিতে বিশিষ্টতা এনে সৃষ্ট ভাস্কর্যে দর্শকমনের সাথে শিল্পীর ভাবনা যুক্ত হয়। এবারের প্রদর্শনীতে ব্রোঞ্জ, মেটাল, অ্যাক্রিলিক, জলরঙ ছাড়াও একটি নতুন মাধ্যম যোগ করেছেন, সেটি হলো কাঠ। বাংলাদেশের শিল্পান্দোলনে বাস্তব রীতির ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি বিষয়ে জ্যামিতির আশ্রয়ে ভাস্কর্য গড়ার প্রবণতা তৈরি হয় ভাষা আন্দোলনপরবর্তী সময়ে ভাস্কর নভেরা আহমেদের কাজের মাধ্যমে। গড়নে সরল, উল্লম্ব আকৃতির গায়ে একটি সুড়ঙ্গ তৈরি করে দিয়ে ভাস্কর্যের সাথে যুক্ত করেন প্রকৃতিকে। হামিদুজ্জামার তাঁর নিজের কাজ প্রসঙ্গে মত প্রকাশ করেন এভাবে—‘ভাস্কর্য কোনো মায়াবী সৃষ্টি নয়। এটি হলো আলো, স্থান ও প্রকৃতির বন্ধন। আমি সৃষ্টি করেছি উত্সাহ ও উদ্দীপনাকে যেটি আমাদের নির্ভর করতে শেখায় প্রকৃতি ও পরম দয়ালুর প্রতি।’ প্রকৃতিতে বড় হতে থাকা বৃক্ষের একটি লুকানো গল্প আছে, তাতে শুধু লড়াই আর বেঁচে থাকার সংগ্রামই প্রধান হয়ে ওঠে। শিল্পী তাঁর এবারের সৃষ্টিতে প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক দেখিয়েছেন। এবারের প্রদর্শনীর শিরোনোম ‘আর্থলি ট্রেজারারস’। পৃথিবীর জল, হাওয়া আকাশের সাথে ভূমি ও জ্যামিতিক আকৃতির সম্পর্ক তৈরিই এই শিরোনামের প্রতিপাদ্য। তাঁর মোট কাজের সংখ্যা—ব্রোঞ্জ ১৭টি, কাঠ ৭টি এবং অ্যাক্রিলিক ও জলরঙ ১৫টি। ‘সিড অব হোপ’ কাজটি কাঠ মাধ্যমে গড়া। একটি বীজের আকৃতি আকাশের দিকে ছুটছে। বীজের মাঝে রেখা টেনে শূন্যতা সৃষ্টি করেছেন। আশা আর উত্কর্ষতা দেখিয়েছেন এ বীজ আকৃতিতে। প্রতিদিনের রুটিনে আমরা আশার বাণী শুনে যাই। এ বীজের মাঝে তারই প্রতিফলন দেখা যায়। কাঠে তৈরি আরেকটি ভাস্কর্যের শিরোনাম ‘রেসপন্সিবলিটি’। ঊর্ধ্বমুখী জ্যামিতিক উল্লম্ব আকৃতির মাথায় গোলাকৃতির অবস্থান। আকৃতির সাথে ভারসাম্য রেখে বৃত্তের অবস্থান নির্ণয় করেছেন। এ প্রদর্শনীতে হামিদুজ্জামান কিছু মানুষের অভিব্যক্তি ব্রোঞ্জে নির্মাণ করেছেন। শিরোনাম ‘ইমোশান হ্যাভ মেনি ফেসেস’। মুখাবয়বে রাগ, আনন্দ, বিষণ্নতা, স্থিরতা, উষ্মা, শান্ত অবস্থা নির্মাণ করে তার মাঝে একরকম ভাঙন বা জ্যামিতিক আকৃতি দেখিয়েছেন। শিল্পীর এ জাতীয় মুখাবয়বের অভিব্যক্তির প্রতি ঝোঁক ইতিপূর্বের জলরঙের কাজেও উপস্থিত হতে দেখা যায়। ‘সিড অব লাইফ’ শিরোনামের স্থাপনাশিল্পে সিলিং থেকে ঝুলন্ত রেখায় যুক্ত করেছেন কাঠের টুকরো। নীলে আবৃত কাঠ ভেসে চলেছে ব্রোঞ্জ নির্মিত বীজের গা ঘেঁষে। আলো, স্থান আর আকৃতির সৃষ্ট জীবনবোধের রূপ এখানে স্পষ্ট হয়েছে। হামিদুজ্জামানের ভাস্কর্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য—কৌণিক গতি নির্ণয় করা, সেই সাথে ভাস্কর্যকে প্রকৃতির অংশ করে তোলা। সিড অব লাইফ কাজটি গ্যালারির এক কোণে অবস্থান করলেও মাটি আর আকাশের মাঝামাঝি অবস্থান করছে মানব জীবন যাপনের মতো করে। ভাস্কর্যগুলোর বেস বা ভূমি চৌকোণো বাক্স হলেও কিছু কাজে ভূমির কাজ করেছে সিমেন্ট ও পাথরের তৈরি আকৃতি। নিরেট জড়বস্তুর বাইরে হামিদুজ্জামানের করা অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের কাজও জ্যামিতিপ্রধান হয়ে ধরা দেয়। রঙের উল্লম্ফনের হাতছানি নেই। পোড়া দগদগে ঘা আছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ হাজির হয়েছে কোনো কাজে। ইম্প্রেশনিজমের সাথে বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদের যোগাযোগ তৈরির প্রচেষ্টা অ্যাক্রিলিকের রিফ্লেকশান ‘রানিং ইন দ্য সার্কেল’ ও অন্যান্য কাজে। অন্তর্দহনের বহিঃরূপ চিত্রতলকে সমৃদ্ধি দিয়েছে। রঙের প্রলেপে ঘূর্ণন, স্থিরতা আর রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরের কথা মনে করায়। বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্য গড়ার ক্ষেত্রে হামিদুজ্জামানের সৃজনচিন্তা গণমানুষের কাছে ভাস্কর্যশিল্পের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। ত্রিমাত্রিক নির্মাণ, মাধ্যমের বৈচিত্র্য, স্থানের সাথে শিল্পকর্মের সাযুজ্য এবং উন্মুক্ত বিশাল পরিধি ভাস্কর্যের সাথে মানুষ ও প্রকৃতির যোগাযোগ স্থাপন করে হামিদুজ্জামানের সৃষ্টিকর্ম। নগরায়ণের এ সময়ে প্রকৃতির উপস্থিতি জরুরি—এ কথাটি মনে করিয়ে দেয় এই প্রদর্শনী। এথেনা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের আয়োজনে গত ৮ মার্চ শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে ৩১ মার্চ।