অখণ্ড বাংলার গ্রামাঞ্চলে বিশাল এক জমিদারবাড়ি। দৈত্য আকারে এই বাড়িটি এঁটেল মাটি দিয়ে বানানো, দেয়াল প্রায় দুহাত পুরু। দোতলা বাড়ি, সব মিলিয়ে কুড়িটির কাছাকাছি ঘর। আজ সন্ধ্যা নামতেই পুরো বাড়িটি একদম সুনসান নীরব। বিশাল সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি থেকে এইমাত্র নামলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, ডান হাতে একটি ছোট খাতা, গোলাপি মলাট দেওয়া। জমিদার চৌধুরী পড়িমরি করে কবিগুরুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই তিনি বলে উঠলেন—‘তোমাকে কতবার না বলেছি যে আমায় প্রণাম করার সময় আমার হাঁটুর নিচে স্পর্শ করবে না’। উনার কথা খুব বেশি গ্রাহ্য করলেন না জমিদার চৌধুরী। আমি হাতে একটি হারিকেন নিয়ে কবিগুরুর সঙ্গে দোতলার একটি ঘরে হাজির হলাম। পেছন পেছন আসলেন চৌধুরী। কবিগুরু ঘরে ঢোকামাত্রই ৫ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ একত্রে উঠে দাঁড়ালেন। সবাই বলে উঠলেন, ‘প্রণাম গুরুদেব। কেমন আছেন? আপনার শরীর এখন কেমন?’ একটি ইজিচেয়ারে কবিগুরু হেলান দিলেন ততক্ষণে। জমিদার চৌধুরীও বসে পড়লেন ঘরে রাখা একটিমাত্র পালঙ্কে। ইজিচেয়ারে প্রায় আধশোয়া অবস্থায় কবিগুরু পাঁচ জনকে শান্ত অথচ দৃঢ়গলায় নিজ নিজ আসন গ্রহণ করতে বললেন। তাদের উদ্দেশ করে কবিগুরু বললেন, ‘আমার শরীর ভালোই আছে। তোমরা আমাকে যত বৃদ্ধ মনে কর, ততটা বৃদ্ধ এবং দুর্বল আমি নই’। লক্ষ করলাম, তারা পাঁচ জনই কিছুটা লজ্জা পেলেন। মাথাটা কিঞ্চিত্ নুইয়ে রাখলেন কয়েক সেকেন্ড। আমি অতি মনোযোগের সাথে তাদের দেখছিলাম। কবিগুরুর ধমকে হুঁশ ফিরে এল। তিনি আমায় বললেন, ‘এই ছোকড়া, হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিস কেন? তোর কর্তার কেরোসিন কি বেশি হয়েছে? দেখতে পাচ্ছিস না যে ঘরে হ্যাজাক জ্বলছে? হারিকেনটা নিভা।’
এমন ধমক খাওয়ার পরও আমি তো রীতিমতো খুশিতে গদগদ। মনে মনে ভাবলাম, যাক বাব্বা, কবিগুরু যে আমার দিকে তাকিয়েছেন, সেটিইবা কম কিসের। ইতোমধ্যে গৃহপ্রভু জমিদার ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। আমাকে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে বললেন, তাড়াতাড়ি জলখাবারের ব্যবস্থা করতে। অভ্যাসবশত জিজ্ঞেস করতেই তিনি আমাকে জানালেন, ‘ওরাই তো বাংলাসাহিত্যের পঞ্চপাণ্ডব। তিরিশের আধুনিক কবি। বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে এবং জীবনানন্দ দাশ।’ আমি তো একেবারেই থ! মনে মনে স্থির করলাম, এই বৈঠকে আমাকে যে করেই হোক উপস্থিত থাকতেই হবে। অর্থকরী অথবা জমিদারি নিয়ে যে এই বৈঠকে কোনো আলাপ-আলোচনা হবে না, সেটি আমি ত্বরিত বুঝে যাই। তাই চৌধুরীকে অনুরোধ করতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘তা থেকো, কিন্তু কোনো কথা বলতে পারবে না। সবাই বেশ মেজাজী মানুষ। কিন্তু তার আগে জলখাবারের ব্যবস্থা করবে তো! অনেক দূর থেকে এঁরা এসেছেন।’ আমি ‘যাচ্ছি’ বলে ছুটে গেলাম বাড়ির অন্দরমহলে। সেখানে জলখাবার প্রস্তুতই ছিল। দুজন ভৃত্যযোগে আমি সেই জলখাবার নিয়ে বৈঠকঘরে আবার প্রবেশ করি। জলখাবার দেখে পঞ্চপাণ্ডবদের চোখমুখ চিক চিক করে উঠলেও কবিগুরুর মুখে কেমন জানি একটু বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল। তিনি বলে উঠলেন, ‘তোমরা শুরু করো। আমি শুধু একটু জল খাব। লেবু মিশ্রিত পানি হলে বেশ হতো।’ এবার তিনি জমিদার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে হঠাত্ বলে উঠলেন, ‘তোমাকে আরও দুজনকে খবর পাঠাতে বলেছিলাম—প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়। খবর পাঠিয়েছিলে? ওরা আসল না যে?’ জমিদার চৌধুরী বেশ কাতর হয়ে নিচুস্বরে বললেন, ‘সেই দায়িত্বটি আমি বুদ্ধদেব বাবুর হাতে দিয়েছিলাম।’ কথাটি শোনামাত্রই বুদ্ধদেব ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। কিছুটা সামলে তিনি বললেন, ‘গুরুদেব, প্রেমেন্দ্র কেন জানি ইচ্ছে পোষণ করলেন না, শরীরটাও নাকি ইদানীং তার ভালো যাচ্ছে না। আর মার্ক্সবাদী সুভাষ তো পার্টির কাজে কোথায় কোথায় থাকে, তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায় মাঝে মাঝে। ওকে কতবার বলেছি, কবিতা আর রাজনীতি একপাত্রে থাকে না। কিন্তু সে তো আমার কথা শোনে না। গুরুদেব, আপনি যদি ওকে একটু বলে দিতেন।’
এবার কবিগুরু মনে হয় একটু বিরক্ত হলেন, দেখলাম। বললেন, ‘শুনবে কোথা থেকে। শুনলাম, দীপ্তি ত্রিপাঠি নামের এক গবেষক ‘আধুনিক বাংলা কাব্য-পরিচয়’ নামে একটি গবেষণাগ্রন্থে শুধু তোমাদের পাঁচ জনকে নিয়ে পাঁচটি অধ্যায় করে শেষ করেছে। অন্যদের নাকি স্থানই দেননি। এমনকি পূর্ববঙ্গের কাজী সাহেব কিংবা জসীম উদ্দীনেরও কোনো উল্লেখ নেই। গবেষক আধুনিক বলতে কী বুঝিয়েছেন এখানে? আজকাল হচ্ছেটা কী এসব?’ কবিগুরু জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলেন। বুঝলাম, কিঞ্চিত্ উত্তেজনায় হাঁপিয়ে উঠেছেন। কথাগুলো কেন জানি তিনি বুদ্ধদেব বাবুর দিকেই তাকিয়ে বলছিলেন, বিধায় বুদ্ধদেব মাথা নিচু করেই রইলেন কিছুক্ষণ। একটু পরেই কবিগুরু নিজেই আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রানু [প্রতিভা বসু] কেমন আছে? ওর গান অনেকদিন শুনি না।’ এবার বুদ্ধদেব মাথা তুলে বললেন, ‘ভালো। এখানে আসার সময় আপনার জন্য একটি গান লিখেছে রানু। আপনাকে উত্সর্গ করে।’ পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিতেই কবিগুরু বলে উঠলেন, ‘থাক, ওসব পরে হবে।’
কবিগুরু এবার বুদ্ধদেবকে বললেন, ‘তুমি ‘‘তিথিডোর’’ উপন্যাসে এমন রগরগে যৌনতা কেন আমদানি করেছ? হারিয়ে যাওয়া বাংলা সাহিত্যের পাঠককে যৌনতার সুড়সুড়ি দিয়ে উদ্ধার করতে চাও? আমার উপন্যাসের সাথে টেক্কা দিতে চাও? পারবে না। সাহিত্যে যৌনতাকে কিভাবে শৈল্পিক উপায়ে ব্যবহার করতে হয়, সেটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে জেনে নিও। শুনেছি মানিক তোমার কবিতাভবনে প্রায়ই যান।’ মানিকের প্রসঙ্গ আসতেই লক্ষ করলাম কবিগুরুর চোয়ালখানি একটু শক্ত হয়ে গেল। হ্যাজাকের আলোর দিকে তাকিয়ে একটু কুঁচকানো ভ্রুতে তিনি বলে উঠলেন, ‘মানিক খুব শক্তিমান লেখক। কিন্তু ছোকড়াটার দেমাগ বেশি। শুনেছি সে নাকি তার কোনো বই কোনোদিনও কাউকে উত্সর্গ করেনি। এমনকি আমাকে পর্যন্ত কোনোদিন কোনো গল্প, উপন্যাস, কবিতার বই উত্সর্গ তো দূরে থাক, পড়তে পর্যন্ত পাঠায়নি। বেশ অবাক হয়েছি।’ বুদ্ধদেব উত্তর দিলেন, ‘মানিক বাবু এমনই। তিনি খুব ভালো মানুষ। রানুু উনাকে বিশেষ পছন্দ করে। ‘‘জীবনের জলছবি’’তে মানিক বাবুর কথা স্মরণও করেছে রানু। তবে গুরুদেব, আপনি জানেনই যে সাহিত্যে নারী-পুরুষের যৌনতা...।’ কবিগুরু বুদ্ধদেবকে এবার কথার মাঝপথে থামালেন। বললেন, ‘তুমি অনেক পড়ুয়া পণ্ডিত। আমার থেকেও জীবনে বেশি পড়েছ সম্ভবত। কিন্তু আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না। আমি জানি তুমি কী বলতে চাইছ। তুমি বলবে সাহিত্যে ফ্রয়েডের অবচেতনের প্রভাবের কথা।’
এবার কবিগুরু অমিয় চক্রবর্তীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সর্বনাশটা তো অমিয় ঘটিয়েছে। ফ্রয়েডের সাথে ভিয়েনার ইম্পেরিয়াল হোটেলে আমার মাত্র একবার দেখা হয়েছিল কিছু সময়ের জন্য। আমিই তাকে চায়ের নেমন্তন্ন দিয়েছিলাম। ফ্রয়েড তার দুই কন্যা এনা আর মার্থাকে নিয়ে এসেছিলেন। আমার সবসময়ই এটি মনে হয়েছে এবং এ ব্যাপারে আমি কিছু প্রবন্ধ লিখে জানিয়েছি যে, সাহিত্যে তত্ত্ব হিসেবে মনোসমীক্ষণবাদ অবশ্যই অচল। তোমরা সবাই জানো যে আমি অমিয়ের কবিতার ভক্ত একজন পাঠক। অমিয় অক্সফোর্ডে পিএইচ ডি করতে গেলে সেখানকার তত্কালীন কবিদের সংস্পর্শে আশা শুরু করে। তাদের লেখা কবিতার বই আমাকে ইংল্যান্ডে থেকে পাঠাত অমিয়। তখন দেখতাম, সবার কবিতায় মার্ক্স আর ফ্রয়েডের প্রভাব। অমিয় স্বয়ং সেই ঢংয়ে কবিতা লেখা শুরু করে। সেগুলি বুঝতে গিয়ে আমি একটু হিমশিম খাই। তখন আমি ফ্রয়েডের পাশাপাশি, ইয়ং, এডলার এদের সকলের লেখা বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। এখন বিষয়টি বুঝতে পারি যে, মনোসমীক্ষণবাদ নিয়ে আমার পূর্বের অবস্থান সম্ভবত ভুল ছিল। অক্সফোর্ডে থাকার সময় অমিয় এবং আমার ভেতরে ২০০টিরও বেশি পত্রবিনিময় হয়েছিল। সেগুলো দেখলেই তোমাদের কাছে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে কবিগুরু একটু দম নিলেন। সামনে রাখা পানির গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন মাত্র একটি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পানিতে লেবুর পরিমাণ বেশি হয়েছিল।’ আমি আলতো করে জিহ্বায় কামড় বসিয়ে বললাম, ‘মার্জনা করবেন। আর ভুল হবে না।’
এবার কবিগুরু তাকালেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দিকে। ততক্ষণে সবাই জলখাবার শেষ করে চায়ের জন্য অপেক্ষারত। সুধীনবাবুর গলায় তখন সোনার একটি লকেট ঝুলছিল। অত্যন্ত সুদর্শন সুধীনবাবু বেশ আভিজাত্যের ভঙ্গিমায় বসেছিলেন বিষ্ণু দে-র পাশে। কবিগুরু তাকাতেই এবার নড়েচড়ে বসলেন তিনি। কিছু একটা বলতে চাইছিলেন, কিন্তু তার আগেই আমি শুনতে পেলাম কবিগুরুর কণ্ঠ। তিনি বললেন, ‘তোমার সব কিছু আমার ভালো লাগলেও তোমার গদ্য অতি দুর্বোধ্য। প্রবন্ধের মধ্যে যত পারো চিন্তা ঠেসে দাও, তাতে পাঠকের বেশ উপকার হবে। কিন্তু এমন ভাষা দিও যাতে পাঠকের জন্য সুগম হয়। তোমার ‘‘স্বগত’’ বইখানা আমাকে পড়তে পাঠিয়েছিলে। আমাকেও বাংলা অভিধান বালিশের পাশে নিয়ে নিয়ে বসতে হয়েছিল। এমন করে গদ্য আর লিখবে না। লিখলে তোমার গদ্য আর কেউ পড়তেই চাইবে না। লাইব্রেরিতে উঁইপোকা তোমার বই কাটবে’। কবিগুরু থামতেই সুধীনবাবু কিছু বলার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘জানি গুরুদেব, আমার গদ্যদোষ বহুল এবং সেই জন্য তা আপনার অনুমোদন পায়নি।’ কবিগুরু তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার অনুমোদনে কী আসে যায়। পাঠকের মন জোগাতে চেষ্টা করো। তাতেই তোমার মঙ্গল হবে। শুনেছি তরুণপ্রজন্ম তোমার প্রতি দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছে তোমার ভাষার দুর্বোধ্যতার জন্য। আমার উপদেশগুলি কানে নিও।’
বিষ্ণু দে-কে দেখলাম দামি একখানি কাশ্মিরি শাল গায়ের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত জড়িয়ে চুপচাপ গুরুদেবের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন। বিষ্ণু দে বুঝতে পারলেন, এবার তার পালা। চেয়ারে তিনি কিছুটা নড়েচড়ে বসতেই কবিগুরু তাঁর দিকে দৃষ্টি দিয়ে শুরু করলেন, ‘তোমার কবিতায় কিছু মুদ্রাদোষ আমার চোখে পড়েছিল। কোনো এক চিঠিতে তোমাকে তা জানিয়েছিলাম। কতটুকু শুধরে নিয়েছ জানি না। আজ এই ভরা মজলিশে আবার বলি। ইংরেজি সাহিত্যে পড়েছ ভালো কথা। তাই বলে বাংলা কবিতা লেখার সময় হুট করে বিদেশি চিত্রকল্প আনো কেন? হ্যাঁ, ভারতবর্ষে শান-বাঁধানো পুকুরঘাট থাকলেও পুকুরপাড়ে হিজল, তমাল, জাম, আম, জামরুল গাছ থাকে। ম্যাপল পাতা আর পাইন গাছের সারি থাকে না। কবিতায় চিত্রকল্প ব্যবহারে সতর্ক থাকবে। মানুষ এখন নানান কথা বলে। তারা এখন গবেষণা করে বলার চেষ্টা করছে যে, তিরিশের আধুনিক কবিরা মোটেও আধুনিক ছিলেন না, সেটি ছিল পাশ্চাত্য প্রভাবিত ঔপনিবেশিক আধুনিকতা। তারা নিজেরা ভারতবর্ষের জন্য আধুনিকতা নির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তোমরা আমার উত্তরসূরি। এসব কথা শুনতে আমারই লজ্জা লাগে। মনে হয় আমিই ব্যর্থ হয়েছি। আর হ্যাঁ, ইদানীং তোমার কবিতায় নাকি চাঁদ আর কাস্তের প্রভাব বেশ দেখা যাচ্ছে। কবিতা দিয়ে সমাজ পরিবর্তন হয়েছে—কোনোদিন দেখেছ এমন কিছু? শোন; কবিতাকে কবিতা থাকতে দাও। তোমার কিছুটা কলাকৈবল্যবাদের চর্চার দরকার দেখছি। বুদ্ধদেবের কাছে বাকিটুকু জেনে নিও।’ বিষ্ণু দে কাঁচুমাচু মুখ নিয়ে বুদ্ধদেবের দিকে তাকাতেই দেখলাম, তিনি একটা তৃপ্তির হাসি দিলেন।
ইতোমধ্যে রাত বেশ গভীর হয়েছে। ঘরের একদম ডান কোনায় নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশকে আলাদা করে চিনতে কষ্ট হলো না। তাঁর পোশাক-আশাকে দারিদ্র্যের ছাপও বেশ স্পষ্ট। চেহারাও বেশ জীর্ণ স্বভাবের। বেশ কয়েকদিন ধরে দাড়ি কাটেননি। তাঁকে দেখে আমার একটু মায়াও হচ্ছিল। আভিজাত্যের এই বৈঠকে বাহ্যিকভাবে তাঁকে আমার কিছুটা বেমানানই ঠেকছিল। কবিগুরু তাঁর দিকে তাকাতেই জীবনানন্দ বাবু তাঁর হিমশীতল চোখ তুলে কবিগুরুর দিকে তাকালেন। কবিগুরু বলতে শুরু করলেন, ‘শুনেছি তোমার কবিতা নাকি এখন সবাই পড়ে। পাঁচ জনের মধ্যে তোমার কবিতা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি গবেষণা হচ্ছে। এটি এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, তিরিশের কবিদের মধ্যে তুমিই একমাত্র মৌলিক এবং যথার্থ আধুনিক কবি। এগুলি আমার কানে আসে। আমার শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু তোমার প্রতি অভিযোগও আছে আমার। তোমার গল্প এবং উপন্যাসগুলি কেন ট্র্যাঙ্কে বন্দি করে রেখেছিলে? সেগুলিও তোমার কবিতার মতো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তোমার স্ত্রী ভাগ্যিস সেগুলি প্রকাশের অনুমতি দিয়েছিল। আর একটা কথা তোমাকে বলি, তোমার স্ত্রীর লেখা স্মৃতিকথা আমি পড়েছি। আমার মনে হয়, লাবণ্য তোমাকে অত্যন্ত ভালোবাসে। তোমাদের দাম্পত্যকলহের গল্পটি সম্ভবত সাহিত্যের গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন। তবে এটির জন্য তোমার ২/১টি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসও কম দায়ী নয়। আর হ্যাঁ, আরেকটি কথা, ট্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় একটু সাবধানে থাকবে। তুমি প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই উদাসীন।’
কবিগুরু এবার খুব কাছে বসা বুদ্ধদেবকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, ‘‘‘কালের পুতুল’’ গ্রন্থে তুমি তোমার সতীর্থ কবিদের যে যোগ্য সম্মান দিয়েছে, সেটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। সে জন্যে আমি তোমার ওপর যারপরনাই প্রসন্ন হয়েছি। তবে জীবনানন্দের কবিতার বাঁকবদল যে তোমাকে কিছুটা অসুবিধায় ফেলে দিয়েছে, সেটি আমি বুঝি। তোমার ব্যাখ্যাই জীবনানন্দকে নির্জনতার কবি, নিসর্গের কবি ইত্যাদি বানিয়েছে। তুমি আসলে ভুলভাবে জীবনানন্দকে অরাজনৈতিক কবি হিসেবে দেখাতে চেয়েছ। আসলে সে তা মোটেও নয়।’ কবিগুরুর এমন কথায় বুদ্ধদেব বাবুর কোনো দ্বিমত করার ছিল না। এবার তিনি তাকালেন সুধীনন্দ্রনাথ বাবুর দিকে। বললেন, ‘শুনেছি জীবনানন্দকে তুমি কবি হিসেবে তুচ্ছ মনে করতে, স্বীকৃতি দিতে চাইতে না। এই ধরনের অভ্যাস ত্যাগ করো। ভবিষ্যতের বাংলা সাহিত্যের পাঠক নির্ধারণ করবে কে কবি আর কে কবি নয়। তা এতদিনে বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছ আশা রাখি।’
জীবনানন্দের প্রতি কবিগুরুর এমন পক্ষপাতিত্ব সবার নজরে পড়লেও তিনি আগের মতোই নির্জন আর নিশ্চুপ রইলেন। তবে কিছুটা ইতস্তত করছিলেন। ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি বাইরে চলে যেতে চান। বিষয়টি কবিগুরুর চোখও এড়াল না। এবার তিনি ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন এবং পঞ্চপাণ্ডবদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটা সময়ে তোমরা সবাই আধুনিক কবিতার নামে আমাকে নানা স্থানে সভা-সমিতি করে সমালোচনা করেছ, কিন্তু সেই তোমরাই আবার রাতের বেলা কুপি জ্বালিয়ে আমার রচনাবলিই পড়েছ। আমাকে তো সমালোচনা করলে এই বলে যে, সারা জীবন কলিকাতায় থেকেও কলিকাতা নিয়ে একটিও কবিতা লিখিনি বলে। আমি নাগরিক কবি নই, তাই আধুনিকও নই। বিষয়টি মোটেও ঠিক নয়। এ-সকল সমালোচনার উত্তর আমার অসংখ্য গবেষক দিয়েছে। তোমরা তা জানো। শুধু শহর কেন, দুই বাংলার আনাচেকানাচে ভ্রমণ করে দেখতে পারো—তোমরা বেশি জনপ্রিয় নাকি রবীন্দ্রনাথ। যা-ই হোক, তাই বলে আমি তোমাদের কোনোদিনও দূরে ঠেলে দিইনি। আমি চেয়েছি, তোমাদের হাতে বাংলা সাহিত্য আরও পরিপক্কতা লাভ করুক। সময়ই বলে দেবে তোমাদের অর্জন বাংলা সাহিত্যকে কতখানি সমৃদ্ধ করেছে। আজ আমি উঠি। সবাই ভালো থেকো।’
খোলা জানালা দিয়ে রাতের আকাশে কবিগুরু তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি জানি বললেন। এবার ইজি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। জমিদার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সামনের সপ্তাহে পূর্ণিমার রাতে মানিক, বিভূতি এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে খবর পাঠাবে। বাংলা কথাসাহিত্য নাকি এই তিন বন্দোপাধ্যায়ের বাইরে এক ফুটও বৃদ্ধি পায়নি; ইদানীং এমন কথা বাতাসে ভাসছে। আগামী বৈঠক তাদের নিয়েই করব’। জমিদার চৌধুরী বললেন, ‘আজ্ঞে গুরুদেব। আমি সব ঠিক করে আপনাকে খবর পাঠাব।’ পঞ্চপাণ্ডবদের হ্যাজাকের আলোয় ফেলে রেখে কবিগুরু ধীরে পদযুগে দোতালার সিঁড়ি দিয়ে নামা শুরু করলেন। সবার সামনে আমি হারিকেন নিয়ে এগিয়ে চলেছি। কবিগুরুর সাথে আছেন জমিদার চৌধুরী। আমি বার দুয়েক পেছনে তাকিয়ে দেখি, ঘর থেকে শুধু বুদ্ধদেব বাবু বেরিয়ে এসেছেন। সিঁড়ি থেকে নেমে কবিগুরু আর পেছনে তাকালেন না। একেবারে ঘোড়ার গাড়ির সামনে এসে থামলেন। এবার আমি সাহস করে ঘোড়ার গাড়ির অনেকটা কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘গুরুদেব, এই অধমকে মার্জনা করবেন। আমার প্রস্তাব হলো, আপনার কথাসাহিত্য নিয়ে এমন একটি বৈঠক করলে কেমন হয়? আমরা সবাই আরও উপকৃত হতাম।’ এবার গুরুদেব আমার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকালেন। হারিকেনের আলোয় আমার মুখখানি গুরুদেবের সামনে জ্বলজ্বল করছে। এবার আমি বেশ ভয় পেয়ে বসলাম। কিছুটা কাঁচুমাচু করে জমিদার চৌধুরীর দিকে তাকালাম। বরিঠাকুর আমার দিকে না তাকিয়ে চৌধুরীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার বাড়িতে এই যুবককে পূর্বে কখনো দেখিনি। কী তার পরিচয়?’। জমিদার চৌধুরী বললেন, ‘পূর্ববঙ্গের সন্তান। আমদের একটু দূরের আত্মীয়। এখানে কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে এসেছে।’ গুরুদেব এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার কথাসাহিত্য নিয়ে পাহাড় সমান গবেষণা হয়েছে। নতুন করে কিছু বলার দরকার নেই।’ আমি মনে মনে এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। বললাম, ‘পূর্ববঙ্গের এক লেখক, ‘জীবিত থাকলে রবীন্দ্রনাথকেই জিজ্ঞেস করতাম’ নামের এক নিবন্ধে একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন... বলতেই কবিগুরু আমার দিকে তাঁর চাদরের ভেতরে থাকা হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হুম। তার নাম আহমদ ছফা। শুনেছি, বড়ই বেপরোয়া আর উদ্ধত, কিন্তু মেধাবী আর দেশপ্রেমিক ছিল সে। তবে এগুলি ফালতু প্রশ্ন। এ-সকল প্রশ্নের জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করি না আমি’।
কবিগুরুর ভাব দেখে আমি মনস্থির করলাম যে থাক, শেষ সময়ে উনার মেজাজটা বিগড়ে দেবার দরকার নেই। আর তাই কিছুটা আন্তরিকতা স্থাপনের জন্যে আমি ত্বরিত তাঁর হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম করে বললাম, ‘গুরুদেব, এই অধমের বাড়ি পূর্ববঙ্গে। আপনার এক সময়ের জমিদারি কালিগ্রাম পরগণার পতিসরের নিকটে। আমার আম্মার নানা আপনার কাছারি বাড়ির অন্যতম নায়েব ছিলেন। আমরা ছোটবেলায় আপনার কাছারি বাড়িতে অসংখ্যবার গিয়েছি। সেই তালগাছ একপায়ে আর দাঁড়িয়ে না থাকলেও গুড়িটি আছে এখনো। নাগর নদী এখনো এঁকেবেঁকে চলে তবে কিছুটা শীর্ণ হয়ে গেছে। ‘‘ছিন্নপত্রাবলী’’র ২৫টি পত্রে আপনি পতিসরের যে নৈসর্গিক চিত্র এঁকেছিলেন, তেমন দৃশ্য আজও চোখে পড়ে খানিকটা। আমি এখনো মাঝে মাঝে পতিসর বেড়াতে যাই। আপনার কাছারি বাড়িটি এখন রীতিমতো জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। আপনার ছেলের নামে করা রথীন্দ্রনাথ হাইস্কুলটি এখন আরও বড় হয়েছে, সরকার নতুন ভবন করে দিলেও পুরোনো ভবনটি এখনো সংরক্ষিত আছে। সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ২৫শে বৈশাখ আপনার জন্মদিন বেশ ধুমধামের সাথে পালন করা হয়। পতিসরকে ঘিরে আপনার গ্রাম উন্নয়নের প্রচেষ্টা এখনো শ্রদ্ধাভরে সবাই স্মরণ করে। তরুণপ্রজন্ম আজ পতিসর ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আর সেখানে এসি লাগানো ডাকবাংলো বানানো হয়েছে। আপনি পতিসর শেষবারের মতো এসেছিলেন ১৯৩৭ সালে। দীর্ঘ বিরতির পর আপনাকে পূর্ববঙ্গের সেই পতিসরে, আপনার পতিসরে আসার জন্য আমি নেমন্তন্ন করলাম গুরুদেব।’ কবিগুরু স্থির নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে একটানে বলে যাওয়া আমার কথাগুলি শুনলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন। কোনো কথার জবাব না দিয়ে তিনি এবার জমিদার চৌধুরীর সাহায্য নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠলেন। গায়ের চাদরখানি এবার কিছুটা আলগা করে তিনি জমিদার চৌধুরীকে বললেন, ‘ছেলেটিকে আমার ওখানে নিয়ে এসো পারলে।’ কথাটা শেষ হতেই ঘোড়ার চিত্কার শুনতে পেলাম আমি। উত্তরের ফাঁকা মাঠের দিকে আস্তে আস্তে ঘোড়ার গাড়িটি মিলিয়ে যেতে থাকল আধা ডজন পেয়াদা সঙ্গে নিয়ে। আমি তখনও হারিকেন হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ঘোড়ার গাড়িটির দিকে, নিকষ আঁধারে অদৃশ্য হওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
