ফকরুল চৌধুরীর ‘সংস্কৃতির রূপকল্প’

সাংস্কৃতিক চিন্তার বই

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪২
ফকরুল চৌধুরী সংস্কৃতির রূপকল্প প্রচ্ছদ :সব্যসাচী মিস্ত্রী প্রকাশক :সংবেদ প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০১৩ মূল্য :২৫০ বাংলা ভাষায় সংস্কৃতি বা কালচার সম্পর্কে ধারাবাহিক, গভীর ও পূর্ণতাপ্রয়াসী চিন্তার সূচনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। তাঁর আগে বাংলা ভাষায় সংস্কৃতি নিয়ে কারও চিন্তার সন্ধান পাওয়া যায় না। উনিশ শতকের শেষ পাদে ম্যাথু আর্নল্ডের ‘কালচার অ্যান্ড অ্যানার্চি’ বইটি পড়ে বঙ্কিমচন্দ্র ইউরোপীয় কালচারের ধারণার সঙ্গে পরিচিত হন এবং এ ধারণাটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে স্বদেশি ধর্মের ধারণার আমূল পুনর্গঠনের তাগিদ অনুভব করেন। ম্যাথু আর্নল্ড লিখেছিলেন, the substance of religion is culture. বঙ্কিমচন্দ্র এই উক্তির অনুসরণে লিখেছেন, ‘মানববৃত্তির উত্কর্ষণেই ধর্ম’। বঙ্কিম থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চিন্তকেরা প্রত্যেকেই কালচার বা সংস্কৃতি সম্পর্কে চিন্তা করেছেন। তবে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ চিন্তকেরা কালচার বা সংস্কৃতির ধারণাকে যেভাবে বিকশিত করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচারমাধ্যম ধারণাটিকে তা থেকে বিচ্যুত করে অর্থের দিক দিয়ে একেবারেই সংকীর্ণ করে ফেলেছে। আজকের দিনে দেখা যায়, সংস্কৃতি বলতে কেবল বোঝানো হচ্ছে নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি বিনোদনমূলক বিষয়কে। অথচ ‘সংস্কৃতি’ শব্দের যে ভার, তা এতটা সোজাসাপ্টা আর ছোটপরিসরের মধ্যে আটকে থাকার বিষয় নয়। প্রশ্ন হলো, আজকের বিশ্বে দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বুঝব? সংস্কৃতি কি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় বা জাতিগত বিষয় নাকি এর বৈশ্বিকতা রয়েছে? তাছাড়া আজকের দিনে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ বলে যে শব্দযুগলের উদ্ভব হয়েছে, এর মাজেজাই বা কী? ঐতিহ্য-ঐতিহ্য বলে যে প্রতিনিয়ত কথা হয়, এর উত্সমূল কোথায়? সমস্ত ঐতিহ্যই কি গ্রহণযোগ্য? বিশ্বায়নের নামে পুঁজিবাদী বিশ্ব বিভিন্ন ঐতিহ্যকে ব্যবহার করছে কিভাবে? সম্প্রতি প্রকাশিত ফকরুল চৌধুরীর ‘সংস্কৃতির রূপকল্প’ বইটি পাঠ করতে গিয়েই এসব প্রশ্ন মাথায় এসে কড়া নাড়ে। বইটিতে সংস্কৃতিকে বিভিন্ন দিক থেকে পর্যালোচনা করে মোট ৮টি প্রবন্ধ রয়েছে। প্রবন্ধগুলো লেখার প্রেরণা মূলত ইতালীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তেনিও গ্রামসির সাংস্কৃতিক চিন্তার সারবস্তু। এখানে গ্রামসির সংস্কৃতি-চিন্তার এমন কিছু ভাষ্য রয়েছে, যা আমাদের সমাজপ্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক। গ্রামসির মতে, ‘সংস্কৃতি হলো এমন একটি ব্যাপ্তি যেখানে ব্যক্তি গোষ্ঠী প্রভৃতির বৈশিষ্ট্যসূচক চিন্তারীতি পরিব্যাপ্ত ও বিন্যস্ত, যেখানে হেজেমনি সংস্থাপিত এবং ভঙ্গুর ও পুনর্গঠিত হতে পারে। একটি সামাজিক গোষ্ঠীর প্রাধান্য দুইভাবে প্রকাশ পায়—একদিকে কর্তৃত্ব আর অন্যদিকে বৌদ্ধিক ও নৈতিক নেতৃত্ব। আর কোনো গোষ্ঠীর সম্মতি আদায় সাংস্কৃতিক উপায়েই সম্ভব। ইতিহাস সাক্ষী, সংস্কৃতির যা কিছু অর্জন তা সাধারণ জনসাধারণের সৃষ্টি, জনগণের সম্পত্তি—অধিপতি শ্রেণি এই সবই দখল করে নিয়েছে। সংস্কৃতির ভোগ-ব্যবহারে সবার অধিকার সমান নয়।’ ২. ‘সংস্কৃতির রূপকল্প’ বইটির প্রথম প্রবন্ধ ‘সংস্কৃতি পরিচয়’-এ ফকরুল চৌধুরী সংস্কৃতির সঙ্গে ঐতিহ্যের সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রচলিত ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, প্রচলিত অনেক ঐতিহ্যই রয়েছে, যার মধ্যে কেবল পাওয়া যায় শোষণের চিহ্ন। অনড় ঐতিহ্য বা বিশুদ্ধ ঐতিহ্য বলে কিছু নেই। এটি আসলে উদ্ভাবিত ও পুনরুদ্ভাবিত। ঐতিহ্যের ক্ষয় যেমন আছে, এর দুষ্টক্ষতও আছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানান—১৮৬০ সালের আগে ভারতীয় ও ব্রিটিশ সৈন্য উভয়ই পশ্চিমা ধরনের পোশাক পরতো, পরবর্তীকালে ব্রিটিশরা ভারতীয় সৈন্যদের জন্য নতুন ধরনের পোশাক তৈরি করে দেয়—পরিবর্তীকালে পোশাকে পাগড়ি, কোমরে ফিতা এবং বিশেষ পরিচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ব্রিটিশ কর্তৃক তৈরি ভারতীয় পোশাকই পরে সেখানে ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাত্ আমাদের প্রচলিত বহু ঐতিহ্য আসলে শেষপর্যন্ত আমাদের তৈরি নয়। এর মধ্যে রয়েছে ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক শোষণ-প্রক্রিয়ার দাগ। ফকরুল চৌধুরী তাই লিখেছেন—‘ঐতিহ্যের যা কিছু ভালো তা-ই গ্রহণীয়, মন্দটুকু বর্জনের মধ্যে অর্জন—নতুন জীবনাচারের সন্ধান। ঐতিহ্যকে নতুন রূপ দিতে পারে সংস্কৃতি।’ এ বইয়ের অন্যান্য প্রবন্ধগুলো হচ্ছে—‘সংস্কৃতির গতিমুখ’, ‘লোকসংস্কৃতির মহিমা’, ‘নিম্নবর্গ সংস্কৃতি’, ‘সংস্কৃতি ও বিশ্বায়ন’, ‘ভাষা ও যৌথ বোধ’, ‘জাতীয়-লোকায়ত সংস্কৃতি’ এবং ‘ভাষা রূপক রাজনীতি’। এসব প্রবন্ধে রয়েছে সংস্কৃতির প্রশ্নের কিছু দিক ও প্রস্তাবনা। রয়েছে কিছু চিন্তার নয়া প্রকাশ, কিছু নতুন চিন্তার উপস্থাপন। প্রবন্ধগুলোতে সংস্কৃতির সঙ্গে প্রকৃতি, ভাষা, অর্থনীতি, বিশ্ববাজার, বিশ্বায়নের রাজনীতি বা মনুষ্য সমাজের বৈষম্যমূলক জীবন-যাপনের কী সম্পর্ক, তা অনুসন্ধান। প্রবন্ধগুলোতে দেখানো হয়েছে আজকের নগরসভ্যতার পুঁজি কিভাবে দখলে নিয়েছে লোকসংস্কৃতিকে, কিভাবে বন্ধ করে দেয় নতুন করে লোকসংস্কৃতি নির্মিত হওয়ার পথ। গ্রামসির সংস্কৃতি বিষয়ক চিন্তার আলোকে অনুসন্ধান করা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরবর্তী সময়ে দেশের বিশাল সম্ভাবনা থাকার পরও কেন জাতি গঠনের মজবুত ভিত গড়ে ওঠেনি, কেন সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পদ্ধতিগতভাবে কোনো মতাদর্শ গড়ে ওঠেনি। প্রবন্ধগুলোয় নানা তত্ত্ব ও মতবাদকে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির ভেতরটা অনুভব করার চেষ্টা করা হয়েছে, যার মধ্যে উঠে এসেছে সংস্কৃতির প্রশ্নের বিবিধ জবাব। আবার তৈরি হয়েছে বহু প্রশ্নের সূত্রমুখ। সব মিলে বলা যায়, বইটি পাঠকের সংস্কৃতি জিজ্ঞাসা সমৃদ্ধ করবে। সংস্কৃতি নিয়ে নতুন ভাবনার উদ্বোধন ঘটাবে। যাদের সংস্কৃতি নিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে, তাদের অবশ্যই বইটি পাঠ করা উচিত।