সেলফোনে একটা অচেনা কল। হ্যালো বলতেই ভেসে এল, আমি পারমিতা। চিনছেন? মনে করুন। কয়েক সেকেন্ড পর আবার সেই কণ্ঠ, ওই যে সেই বৃষ্টিভেজা পারমিতা। আর আপনি হলেন ছাতাওয়ালা। এবার অঝোর হাসি। হ্যাঁ চিনেছি। কেমন আছেন? ভালো। শুনুন আপনার আমব্রেলা ব্যাগটা আমি ফিরিয়ে দিতে চাই। দরকার নেই। মানে? বলুন আপনি কখন ফ্রি? আমি আসব। সময় করে এসো। তবে এক্ষুনি আসি। এবার কম্পিউটারের কি-বোর্ড থেকে হাত উঠালাম। না, বলে হাসলাম নিঃশব্দে। শোন মেয়ে, এখন ছাতাটা আমার দরকার নেই। এসব কাব্যিক কথা ভালো লাগে না আমার। কাল এ সময়ে আমি অফিসে আসব। আপনি থাকবেন। দেখা হবে। বাই। লাইনটা কেটে গেল।
কলকাতা থেকে জেট এয়ারলাইনস। ঢাকার ফ্লাইট। প্লেন ছাড়তে একটু বিলম্ব, ঢাকায় নাকি অনেক বৃষ্টি। যাত্রীরা প্রায় সবাই ট্রানজিটের। কেউবা লন্ডন, কেউবা সিডনি, কেউবা আফ্রিকা থেকে এসেছে। তার মধ্যে কিছু আবার কলকাতার। পরের গন্তব্য ঢাকা। প্রায় দুঘণ্টা লেটে প্লেনটি ছাড়ল। আকাশ তখনও মেঘলা। চারদিকে সাদা-কালো মেঘের ভেলা। মাঝারি ধরনের ঝাঁকির মধ্যে দিয়ে প্লেন চলছে। যাত্রীদের চোখে-মুখে ঘরে ফেরার প্রচ্ছন্ন আকুতি। এর মাঝেই সিটবেল্ট বাঁধার অনুরোধ কানে এল। চারদিকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। রানওয়ের জমানো পানি চিরে অবশেষে বিমানটি যখন থামল, তখন মনে হয় বৃষ্টির তেজ আরো বেড়ে গেছে। এরই মাঝে নামতে হবে। আমি আমার হ্যাট আর আমব্রেলা ব্যাগটি হাতে নিলাম সামনের প্রয়োজনের কথা ভেবে। এয়ারলাইনসের কয়েকজন বড় ছাতা নিয়ে প্লেনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীদের সাহায্যের জন্য যা নিতান্ত অপ্রতুল যাত্রীদের তুলনায়। আমি আমার কাউবয় হ্যাটটি মাথায় চড়িয়ে সিঁড়িতে পা দিতেই দেখি, আমার পাশের মেয়েটির এক পা সিঁড়ির আগের ধাপে চলে গেছে। মেয়েটির পায়ে ছিল উঁচু হিল। উপড় হয়ে পড়ার আগেই ওর হাত ধরলাম। তাকাল আমার দিকে। বেশ মায়াভরা মুখ। আমি নিচু কণ্ঠে বললাম—লেগেছে? ইশারায় না, বলল। চোখে হাসির ঝিলিক। সিঁড়ির শেষ ধাপে নামার আগেই আমার রঙিন ছাতার ব্যাগটি ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম। বললাম, মুভ। সে তা-ই করল। ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে গেল, মনে হয় পাশের যাত্রীটিও টের পায়নি। সে বাসে উঠতেই বাসটি ছেড়ে দিল। আমি কাকভেজা হয়ে অন্য বাসের দিকে হাঁটছি। চলন্ত বাসটির দিকে তাকিয়ে দেখি, চুল মুছতে মুছতে মেয়েটি যেন ইশারায় কিছু বলছে আমায়।
—ভাগ্যিস আমব্রেলা ব্যাগটির মধ্যে আপনার একটা ভিজিটিং কার্ড ছিল। তা না হলে তো আপনাকে আমি থ্যাঙ্ক্সটুকুও জানাতে পারতাম না। আমি রাইনা পারমিতা। লন্ডনে ল-এর ওপর লেখাপড়া করি। আপনার সবই ভিজিটিং কার্ডে আছে। আপনার বাসার ল্যান্ডফোনে রিং হয়। কিন্তু কেউ রিসিভ করে না। আর অফিসে ফোন করার পর আপনার পিএ মিনিট পাঁচেক লাইনে রেখে বলে, স্যার মিটিংয়ে আছেন। পরে গতকাল আপনার সেলফোনে ফোন করলাম। স্যরি, পারমিশন ছাড়াই আপনার ঘরে ঢুকলাম। ননস্টপ মেয়েটি বলে যাচ্ছে। পুরো ঘটনাটি বুঝতে একটু সময় লাগে আমার। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম—
কী খাবে পারমিতা?
জাস্ট ব্লাক কফি।
একটু পরে মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে দেখি, এক অপরূপা প্রসেস দ্য মোনাকো আমার সামনে বসা। প্লেনে দেখা সে মেয়েটির সাথে ড্রেসে তার একদম মিল নেই। গোলাপি শাড়ি আর গোলাপি টিপে এ এক অনন্য বাঙালি প্রতিমা।
আমার সাথে মুখ গম্ভীর করে কথা বলবেন না।
আমার ধরনটা এ রকমেরই পারমিতা।
তাই।
কফিতে চুমুক দিতে দিতেই বলে, এই আপনার ছাতার ব্যাগ। বেশ সুন্দর। আমি লন্ডনে গিয়েই একটা কিনব।
এটা ব্যাংকক থেকে কেনা। তোমার পছন্দ?
হেসে মাথা নাড়ল।
তবে এটা তোমার।
হাসুন। না হেসে বললে আমি নেব না।
আমি হাসলাম। এবং ওর অনুমতি নিয়ে একটা চুরুট ধরালাম।
হাসলে আপনাকে অনেক সুন্দর লাগে।
পারমিতা এখন প্রায়ই আমার সেলফোনে কল করে। লন্ডনের গল্প শোনায়। ভালোলাগা মন্দলাগা শেয়ার করে। আমিও তার গল্প শুনি। তার একাকীত্বের গল্প। সে থাকে বারিধারায়। আমি পল্লবী। আমার বয়স তার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। তবু গল্প থেমে থাকে না। আমার অনেক পথচলা। ঢাকা থেকে সেই দক্ষিণ বাংলার তেঁতুলিয়ার পার। সেখান থেকে আমার ‘স্বপ্ন চূড়া’ আবার কখনো ওপার বাংলার আঙরভাসা নদী। এরপর ব্যাংককের নিজের ব্যবসা। পারমিতা এক ভিআইপির কন্যা। বাংলাদেশে তার বাবাকে এক নামে চেনা যায়। তার আবাস বারিধারায়। শুধু কথার ফুলঝুরি। একদিন সে জেনে যায়, আমিও একা। বেশ চটপটে-সপ্রতিভ।
আচমকা পারমিতার ফোন অসময়ে, আপনি কোথায়?
আমি শেরাটনে।
আমি আসছি।
মানে?
কোনো মানে টানে নয়। আমাকে কিছু সময় দিবেন। ও.কে। একটু সময় নিয়ে বলি—বেশ, তুমি পৌঁছে আমাকে ফোন কোরো। পারমিতাকে নিয়ে আমি সুইমিংপুলের পাশে বসি। ওর প্রিয় ফুডের সাথে আমি নিজের জন্য একটা ড্রিংকসের অর্ডার দিই। তার অনুমতি না নিয়েই একটু চুরুট ধরাতেই হঠাত্ বসন্তের বৈশাখী ঝড়। তার মনটা ভালো করার জন্য বলি—কী রাজকন্যা, হাসি থেমে গেল কেন?
আপনি কি আমার হাসি দেখতে চান?
হ্যাঁ, বলে মাথা নাড়তেই আমার মুখের চুরুটটা নিজের হাতে নিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দূরে ছুড়ে মারে। আমি বললাম, পারমিতা তুমি কী করছ?
আমি ঠিকই করছি, মামুন সাহেব। এটা একদম ছেড়ে দিন। মানুষের কথা ভাবেন, মানুষের জন্য কাজ করেন, নিজের জন্য একটু ভাববেন না? অনেক পরে আমি হাসলাম।
দেখি আপনার হাত দুটো, বলে আমার রিস্টওয়াচটা নিজের হাতে খুলে রোমার ব্রান্ডের একটা ঘড়ি পরিয়ে দিয়ে বলল, বেশ লাগছে।
এটা কি ঠিক, পারমিতা?
এটাই ঠিক, মি. মামুন।
আর শুনুন, নেক্সট সানডেতে আমার সাথে রাতে খাবেন। আমার বাবাও থাকবেন। আপনার মতো ঘাসফুলের সাথে আমরা খাব। আমার বাবা কিন্তু একদম মন্দ মানুষ নন।
এই মেয়ে, তুমি তো অনেক কথা জানো।
শুনুন, আমাকে ‘এই মেয়ে’ বলে ডাকবেন না।
তুমি তো বৌদ্ধধর্মের দেবী। Who can do all.
ও, তাহলে আপনি জানেন আমার নামের অর্থ?
জানি, পারু।
আপনার হাতটা একটু ছুঁই?
ছোঁও।
আপনাকে এখন ‘ম্যান অন ফায়ারের’ নায়ক ডেনজল ওয়াশিংটনের মতো লাগছে।
বাড়িয়ে বলছ।
একদম না।
তাহলে তুমি পিটা। লুপিটা।
মুভিটা আপনি দেখেছেন?
অনেকবার।
মাই গুডনেস। শুনুন, এসব এনজিও টাইপের ব্যবসা করেন? তাইতো। টকশোতে দেশপ্রেমিক বনে জান। বাইরের টাকায় নিজেরা বিলাসী জীবন-যাপন করেন আর বলে বেড়ান, মানুষের সেবায় দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ান। একবার নেদারল্যান্ডে আমি দেখেছি, বাংলাদেশি এক এনজিও আমাদের দেশের দরিদ্রতাকে পুঁজি করে রাস্তায় মানুষের অর্ধনগ্ন ছবি দেখিয়ে টাকা চাইছে। আর এদেশে এসে বাবার কাছে শুনলাম, ওই এনজিও-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর বেতন-গাড়ি-বাড়িসহ প্রতিষ্ঠান থেকে নেন নাকি কয়েক লাখ টাকা। আমি হাসলাম।
তুমি তো অনেক কিছু জানো পার্বতী। আমি একজন গরিব মানুষ। নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি।
ও তাই!
হ্যাঁ।
আমিও স্যরি। তবে আমি পার্বতী নই কিন্তু, পারমিতা। মনে থাকবে?
থাকবে, তোমার চোখের কাজলে...
মানে? একটা হাসির ঝিলিক। আমার কাছে যা ছিল বৃষ্টিস্নাত এক পূর্ণিমা রাতের মতো।
ঢাকায় নিজের এবার কাজের ব্যস্ততা অনেক বেশি। তারপরেও পারমিতার সাথে আমার ফোনে গল্প করা যে কখন কাজের অংশ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে তা নিজেও বুঝিনি। কথায় কথায় বেলাও বয়ে গেছে খানিকটা, যা কিছুটা বর্ণিলও। যে সানডেতে সে খাবারের নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল, সেদিনই খবর পেলাম, আমাকে কলকাতা যেতে হচ্ছে একটা সেমিনারে। যেহেতু ভিসা আগেই ছিল, টিকিটটা কনফার্ম করে আয়োজকরা জানিয়েছে। সন্ধ্যায় ফ্লাইট। এয়ারপোর্টে পৌঁছে পারমিতাকে একটা ফোনও করেছিলাম। রিসিভ করেনি সে। কলকাতার ব্যস্ততার জন্য রাতে ওকে মেইল বা ফোন করতে পারেনি। পরেরদিন ইন্ডিয়ান সিম পেয়ে ওকে ফোন করেছিলাম, চেনা রিংটোন। ডিসপ্লেতে দেখতে পেয়েছি No answer. কলকাতা থেকে দীঘা। অমৃতা হোটেলে ছিল আমাদের জন্য ছোট্ট একটা আয়োজন। ওখানেই অ্যাটাচড একটা মেইল পেলাম। ডাউনলোড করতে খুব সময় লাগেনি। গোলাপি কাগজে বাংলায় লেখা একটা চিঠি।
মি. মামুন,
কেন যেন মন বলছিল সেদিন আপনি আসবেন না। আমার লেখা প্রথম চিঠি গোলাপি কাগজে। একুশ বছরের জীবনে আমি প্রথম রান্না করেছিলাম, মুগডালের সাথে মাংস। ইলিশ মাছ আর ডাল ভর্তা, সাথে বেগুন ভাজা। আপনার প্রিয় খাবারের তালিকাটা যেভাবেই হোক, জেনেছিলাম। বিকেলের ফোনটা ইচ্ছে করেই রিসিভ করিনি। বিলেত আর ঢাকা দু-জায়গায়ই কিছু বন্ধু হয়েছিল আমার, একসময় তারা বেশ কাছেরও হয়ে যায়। একদিন আমি বুঝতে পারি, ড্রাগস আর অবাধ যৌনতাই এ ফ্রেন্ডশিপের মুখ্য বিষয়। যা আমাকে একটুও ছুঁতে পারেনি। নিজেকে একটু আলাদা মনে করেই সেই আলাদা প্রকৃতির একজনকেই লিখছি, যে ভাবনাটা আমার ভুল হওয়ার কথা নয়। বাবার কাছেই জেনেছিলাম, আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব মাও সেতুং-এর কথা। রাতে যখন ফোন করে শুনলাম, The dialed number is currently unreachable, অভিমান আর অজানা আশঙ্কায় চোখের জল লুকাতে পারিনি। সকালে অফিসে ফোন করে জেনেছি, হঠাত্ই আপনি কলকাতা চলে গেছেন। শীঘ্রই বিলেতে ফিরে যাব। আবার হয়তো দেখা হবে। হয়তো বা না। তবে আপনাকে মনে রাখব। প্রায় ষোল বছর আগে বেবী নামে একজন আপনাকে ভালোবাসার চিঠি লিখত নীল কাগজে। আমি লিখলাম গোলাপি কাগজে। ভালো থাকবেন। পারমিতা।
