আল্লাহপাক মানুষকে নিজ সুরতে সৃষ্টি করে আবার তিনি নিজে মানুষেরই অন্তরে অবস্থান নিয়েছেন। তাই মানুষের দিল হচ্ছে মহাভেদ ও বাতেনের দরিয়া। একজন ডুবুরি যেমন গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে তলদেশ থেকে মণি-মাণিক্য তুলে আনেন, তেমনি মানুষও তার দেলের মধ্যে ডুবে জগতের সবচে মুল্যবান রত্ন আল্লাহপাককে আবিষ্কার করতে পারেন। আল্লাহকে খুঁজে বের করার জন্য অনেকগুলো সাধনা রয়েছে, তারমধ্যে উত্তম সাধনা হচ্ছে আত্মশুদ্ধি, নামাজ ও মোরাকাবা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “সেই সফলকাম, যে পবিত্রতা অর্জন করে ও তাঁর প্রভুর নামে জিকির করে এবং সালাত আদায় করে” (সূরা আল্-আ’লা : ১৪, ১৫)। নামাজকে প্রধান বৃত্ত ধরে অন্যান্য আমল বা সাধনাও একসঙ্গে চর্চা করতে হয়। নয়তো মনজিলে মুকসুদে পৌঁছানো যায় না। আজকের লেখায় দৈনিন্দন আমলের সহজ ওয়াজিফা ও হাকিকত তুলে ধরবো। একজন সাধকের জন্য শ্রেষ্ঠ ইবাদতটি হলো নামাজ। তবে অবশ্যই প্রথমে এর সঙ্গে আত্মশুদ্ধির কৌশল ও মোরাকাবার পদ্ধতি শিখে নিতে হবে। আর আত্মশুদ্ধির জন্য খাঁটি মোর্শেদের পরামর্শ গ্রহণ করা আবশ্যক। নামাজের জন্য প্রথমে করতে হয় অজু। অজু করার যথাযথ নিয়ম পালন করার সময় মনে মনে খেয়াল করতে হবে পানি দিয়ে আমরা নিজের জাহেরী হাত, মুখ নাক, মুখমন্ডল, মাথা, কান, গলা এবং পা ধুয়ে দেহ যেমন পবিত্র করি, ঠিক তেমনি বাতেনী হাত, মুখ, নাক, মুখমন্ডল, মাথা, কান, গলা এবং পা-ও মোর্শেদের ফায়েজ দিয়ে ধৌত করে আত্মা পবিত্র করছি। অত:পর কাকুতি মিনতি করে আল্লাহপাকের সাহায্য কামনা করতে হবে, যাতে নিজ অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিয়ে কোনরকম পাপের কাজ সংঘটিত না হয়। সুফিসাধক তথা মোমেন বান্দার নামাজের ওয়াক্ত হলেই ফায়েজের তাছিরে কলব ও শরীর পুড়তে শুরু করে। কারো কারো মধ্যে জজবাহর হালত হয়। এমন অবস্থায় নামাজে দাঁড়ালে তার কেবল কান্না আসে। হযরত ইমাম হাসান (রা.)-এর অজু করার সময় হাত থরথর কাঁপতে শুরু করত। পানি পড়ে যেত। সঙ্গীরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করল, কেন আপনার এমন হচ্ছে? উত্তরে তিনি বললেন, কিছুক্ষণ পর আমি এক মহান বাদশাহর সামনে দাঁড়াতে যাব- এই ভয়েই আমার এমন হচ্ছে।
একজন তরীকতপন্থী সাধক মূলত হাকিকতে সালাত আদায় করে থাকেন। কারণ তাকে জাহেরের সঙ্গে বাতেন ঠিক রেখে সাধনা করতে হয়। তাই হাকিকতে অজু শেষে কেবলামুখী হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে দুই চোখ বন্ধ করে খেয়াল কলবে ডুবিয়ে দিয়ে আল্লাহকে লক্ষ করে মনে মনে বলতে হবে, ‘ওগো দয়াল মাওলা, দয়াল আল্লাহ, তোমাকে দেখার মত যোগ্য চক্ষু আমার নেই, তাই আমি তোমাকে দেখি না; কিন্তু তুমি আমাকে দেখছ। তোমার কথা শুনার মত যোগ্য কান আমার নেই; তাই আমি শুনি না; কিন্তু তুমি আমার কথা শুনছ।’ এমনিভাবে খেয়াল কলবে ডুবিয়ে হুজুরী দিলে বা একাগ্রতার সাথে নামাজ আদায় করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জাহেরী চক্ষু না বন্ধ করলে বাতেনী চক্ষু খোলে না। আর বাতেনী চোখ দ্বারাই মোমেন বান্দা নামাজে আল্লাহর নূর তথা আল্লাহর দর্শন লাভ করে থাকেন।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী নামাজে সূরা ফাতেহা পাঠ করার পরে পবিত্র কুরআন থেকে আয়াত পাঠ করতে হয়। পবিত্র কুরআন মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এতে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে কী কী করণীয় রয়েছে তা নির্দেশিত হয়েছে। নামাজ যেহেতু আল্লাহপাকের নিকট বান্দার প্রার্থনা, তাই নামাজে সূরা ফাতেহার পর পবিত্র কুরআনের প্রার্থনামূলক আয়াত পাঠ করা অধিক ফজিলতপূর্ণ ও যুক্তিযুক্ত। যেমন- “রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আন্তাস ছামিউল আলিম- রাব্বানা ওয়াজ আলনা মুসলিমাইনি লাকা ওয়া মিন জুররি ইয়াতিনা উমমাতাম মুসলিমাতাল লাকা ওয়া আরিনা মানাসিকানা ওয়াতুব আলাইনা ইন্নাকা আন্তাত তাওয়াবুর রাহিম অর্থাত্ : “হে আমাদের প্রভু! আমাদের এ কাজ গ্রহণ করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। হে আমাদের প্রভু! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার এক অনুগত উম্মত করবেন। আমাদেরকে ইবাদতে নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হোন। আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (সূরা-আল বাকারা : ১২৭ ও ১২৮)। এছাড়া সূরা বাকারা : ১২৭, ১২৮, ১২৯, ২০১ ও ২৮৬ সূরা আলে ইমরান : ৮, ৫৩, ১৪৭, ১৯১, ১৯২, ১৯৩ ও ১৯৪ সূরা ইব্রাহিম : ৩৮, ৪০ ও ৪১ সূরা আরাফ : ২৩ সূরা আনআম : ১৬২ সূরা ইউসুফ : ১০১ সূরা বনি ইসরাইল : ৮০ সূরা কাহাফ : ১০ সূরা ত্বাহা : ২৫-২৮ সূরা ফোরকান : ৬৫ ও ৭৪ সূরা নামল : ১৯ সূরা মোমিন : ৭ সূরা মুমতাহিনা : ৫ সূরা হাশর : ১০ ইত্যাদি ‘রাব্বানা...’ দিয়ে শুরু আয়াতগুলো সূরা ফাতেহার সঙ্গে পড়াই শ্রেয়। এসব আয়াতের অর্থগুলোর শুনলে চোখে পানি চলে আসে, আল্লাহর প্রতি বিনয় ও ভয়ে শীর নত হয়ে আসে। তাছাড়া দিলে পরম শান্তি অনুভুত হয়। কেননা, নামাজ হলো আল্লাহ নিকট বান্দার প্রার্থনা বা দরখাস্ত।
