দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ

বায়তুল মোকাররমের খুত্বা

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২২
আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- হে মুমিনগণ! আমি তোমাদের যা কিছু দান করেছি তা থেকে হালাল বস্তুগুলো ভক্ষণ কর এবং আল্লাহপাকের শোকর আদায় কর যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত করে থাক। হজরত রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- হালাল সম্পদ কামাই করা ফরজের পর ফরজ। অত্র হাদিস আল্লামা বায়হাকি হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। হজরত রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সত্যবাদী, আমানতদার ও বিশ্বাসী ব্যবসায়ী ব্যক্তি হাসরের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের দলে থাকবেন (তিরমিজি শরিফ)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- মহান আল্লাহ অতীব পূতপবিত্র। তিনি কেবল পাক-পবিত্র বস্তুই কবুল করেন। আর এ ব্যাপারে তিনি মুমিনদের ওই আদেশই করেছেন, যা দ্বারা তিনি রাসূলগণকে আদেশ করেছেন, তিনি বলেছেন, হে রাসূলগণ আপনারা পাক-পবিত্র হালাল মাল খাবেন এবং নেক আমল করবেন। এ একই আদেশ মুমিনদের করতে গিয়ে তিনি বলেন- হে মুমিনগণ! আমার দেওয়া পাক-পবিত্র হালাল রিযিক খাও। অতঃপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে দূর-দূরান্তে সফর করছে। তার মাথার চুল এলোমেলো, শরীরে ধুলাবালু। এ অবস্থায় সে উভয় হাত আসমানের দিকে উঠিয়ে কাতর স্বরে হে প্রভু, হে প্রভু বলে ডাকছে। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম ও পরিধেয় বস্ত্র হারাম। এ লোকের দোয়া কিরূপে গৃহীত হবে? (মুসলিম শরিফ)। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে দেহের গোশত হারাম মাল দ্বারা গঠিত উহা বেহেশতে প্রবেশ কর েত পারে না। হারাম মালে গঠিত প্রত্যেক দেহের জন্য দোজখই অধিক উপযুক্ত (দারামি)। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ১০ মুদ্রায় একটি কাপড় খরিদ করল, যার মধ্যে একটি মুদ্রা অবৈধ উপায়ে অর্জিত, তার নামাজ কবুল হবে না। যে পর্যন্ত ওই কাপড় তার পরিধানে থাকবে (আহমদ)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- মেরাজ রাতে আমি এমন একদল লোকের কাছে উপস্থিত হলাম যাদের পেট ঘরের ন্যায় বড় এবং তার ভেতরে বহু সাপ রয়েছে, যেগুলো পেটের বাইরে থেকে দেখা যায়। আমি (আমার সঙ্গীকে) জিজ্ঞেস করলাম হে জিব্রাঈল! এরা কোন লোক? তিনি বললেন- এরা সুদখোর (আহমদ শরিফ)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহপাক বলেন- কেয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণির লোকের বিরোধিতা করব ওই ব্যক্তি, যে আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করল (মান্নত করল) অতঃপর উদ্দেশ্য লাভের পর সে তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। ওই ব্যক্তি যে স্বাধীন লোক বিক্রি করত উহার মূল্য ভক্ষণ করে। ওই ব্যক্তি যে কোনো শ্রমিককে পরিশ্রমের বিনিময়ে কাজের জন্য নিযুক্ত করল। অতঃপর সে তার দ্বারা পুরোপুরি কাজ বুঝে পেল কিন্তু সে তাকে পারিশ্রমিক পরিশোধ করল না (বোখারি শরিফ)। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের হারাম থেকে দূরে রেখে হালাল দ্বারাই যথেষ্ট করুন এবং গায়রুল্লাহ থেকে বিমুখ করে আপনার অনুগ্রহ দ্বারা ধন্য করুন। মহান আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের মহাগ্রন্থ কুরআনের বরকত দান করুন। তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করোনা এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায় পন্থায় আত্মসাত্ করার উদ্দেশ্যে শাসনকর্তা বা বিচারকদের হাতে উেকাচ (ঘুষ) তুলে দিওনা (সূরা বাকারা-১৮৮ আয়াত)। সমাজের অসহায় এবং ক্ষমতাহীন মানুষেরা তাদের হূত অধিকার কিংবা অন্যের অধিকারকে করায়ত্ব করার লক্ষ্যে ধূর্ত দুর্নীতিপরায়ণ কর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে অবৈধ অর্থ কিংবা পণ্যসামগ্রী পর্দার অন্তরালে প্রদান করে স্বার্থ হাছিল করার নিমিত্তে উেকাচ প্রদান করে থাকে। যা মানব বিধ্বংসী গুরুতর অপরাধ। এর মাধ্যমে হাক্কুল ইবাদ বান্দার হক বা অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়। যে অপরাধ ক্ষমা করা না করার বিষয়টি স্বয়ং আল্লাহতায়ালা বান্দার হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। বান্দা ক্ষমা না করলে আল্লাহতায়ালা এই অপরাধ কখনোই ক্ষমা করবেন না। ঘুষ গ্রহণ করা নিন্দনীয় ও গুনাহের কাজ বলে রসূল (স.) তার হাদীসেও উল্লেখ করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত রসূল (স.) বলেন, ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামে যাবে (তাবারাণী)। হযরত ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত অন্য হাদীসে আছে যে ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়কেই রসূল (স.) লানত করেছেন (আবু দাউদ)। হযরত ছাওবান (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রসূল (স.) ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা এবং ঘুষের দালাল সকলের উপর লানত করেছেন (আহমদ তাবারাণী)। এই পৃথিবীতে মান-মর্যাদা ও সম্মান-প্রতিপত্তির অধিকারী হওয়ার মাঝেই সার্থকতা রয়েছে। বিত্ত-বৈভবের প্রাচুর্য-এর তুলনায় খুবই মূল্যহীন মানুষ মান-সম্মান অর্জনের জন্যই দেদারছে সম্পদ ব্যয় করে। অন্য বিষয়ে ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই খাতে তার ব্যয়ের সীমা পরিসীমা থাকে না। সম্পদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মানুষ তার মান-সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের পিছনে ব্যয় করে থাকে। মানব জীবনের প্রকৃত সার্থকতা হলো মান-মর্যাদা অর্জন। আর এর মোকাবেলায় অর্থ-বিত্ত একেবারেই মূল্যহীন বস্তু। তাই যখন কেউ ঘুষ গ্রহণ করে তখন তার মানসম্মান ধুলোয় মিশে যায়। সূরা বাকারার ১৬৮ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মানবজাতি। জমিনের মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তা থেকে তোমরা হালাল ও পবিত্র বস্তুসমূহ খাও। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করোনা, কেন না সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। অনুরূপভাবে সূরা নাহেল বলা হয়েছে তোমাদেরকে আল্লাহ তায়ালা যে পবিত্র ও হালাল রুজি দান করেছেন তা থেকে তোমরা খাও এবং আল্লাহর নেয়ামতসমূহের শুকরিয়া আদায় করো, যদি তোমরা তারই উপাসক হয়ে থাকো। পৃথিবীতে জীবন পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা এবং অপরিহার্যতা সম্পর্কে যেমন সবাই একমত, তেমনি অর্থ-সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রেও ভাল ও মন্দ তথা বৈধ-অবৈধ দু’টি ব্যবস্থার ব্যাপারেও দুনিয়ার সবাই একমত। দুনিয়ার সবাই মন্দ বলে মনে করে থাকে চুরি, ডাকাতি, ধোকা, ঘুষ, জুয়া প্রভৃতি কাজকে। এই পন্থাগুলোর মধ্যে বৈধ ও অবৈধ নির্ধারণের কোনো মানদণ্ড সাধারণ মানুষের কাছে নেই। এ বিষয়গুলো নির্ধারণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা ও তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (স.) যা দেশ-কাল ও গোত্র গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলের নিকটই সমভাবে গ্রহণযোগ্য এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ঘুষ চার প্রকার (১) ক্ষমতাসীন হওয়ার জন্য নেতৃত্ব ও পদবী লাভের জন্য, নিজের স্বপক্ষে রায় দেয়ার জন্য উচ্চ পর্যায়ের বা নিম্ন পর্যায়ের লোকদেরকে যা দেয়া হয় তা ঘুষ (২) ন্যায়কে অন্যায় ও অন্যায়কে ন্যায় বানানোর জন্যে যা ব্যয় করা হয় তাও ঘুষ। উক্ত দুই প্রকারের ঘুষদাতা, ঘুষখোর ও ঘুষের দালাল রসূল (স.) এর হাদীস অনুযায়ী অভিশাপ প্রাপ্ত ও জাহান্নামী (৩) নিজের প্রকৃত হক উদ্ধারের জন্য কর্মকর্তা বা তার নিকট সুপারিশকারীকে কিছু দেয়া। (৪) কোন অত্যাচারী জালিম ব্যক্তি হতে বা তার জুলুম থেকে নিজের এবং পরিবার পরিজনের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রু রক্ষার সম্ভব হচ্ছে না। সেই ক্ষেত্রে অসহায় ও নিরুপায় অবস্থায় ঘুষ দেয়ার বিষয়ে কিছুটা অবকাশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু গ্রহীতার ক্ষেত্রে সকল অবস্থায় ঘুষ নেয়া হারাম এবং হাদীসের ভাষায় সে অভিষপ্ত ও জাহান্নামী। বি. দ্র. গত ২৮ মার্চ শুক্রবারের খুত্বার আলোকে তৈরি