মূল্যবান মালামাল কাগজে আছে, বাস্তবে নেই

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:০৭
রেলওয়ের পশ্চিম জোনের স্টোরগুলো লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ স্টোরের কাগজপত্রে মূল্যবান মালামাল ও যন্ত্রপাতি থাকলেও স্টোরগুলোতে প্রকৃত মালামাল ও যন্ত্রপাতির হিসাব নেই। মূল্যবান মালামাল ও যন্ত্রপাতি কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে নেই। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ঠিকাদারের নিকট থেকে প্রকৃত মালামাল বুঝে নেয়া হয় না। অথবা মালামাল গোপনে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া হয়। এবিষয়ে রেলওয়ের অডিট অধিদপ্তর প্রতিবছর সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও সংশ্লিষ্টরা তা দেন না। জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয় না। ফলে স্টোরের মূল্যবান মালামাল চুরি অথবা সরবরাহ না নেয়া অব্যাহত এবং জড়িতরা বহাল তবিয়তে রয়েছেন। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, বিগত ২০১২-১৩ অর্থবছরে রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের এসএসএই/ওয়ে/তিস্তা কার্যালয়ের স্টোর রিটার্ন অ্যাডভাইস নোটে বর্ণিত ৫৬.৩৬ টন স্টিল ট্রাফ প্লেট প্রতি টন ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রয়ের অর্ডার হয়। স্টোর কর্তৃপক্ষ ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বরাবরে মাত্র ২৮.৩ টন স্টিল ট্রাফ প্লেট সরবরাহ করে। বাকী ২৮.৩৬ টন স্টিল ট্রাফ প্লেট স্টোরের কাগজপত্রে থাকলেও এসএসএই/ওয়ে/তিস্তার নিকট বাস্তবে নেই। তাই ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে তা সরবরাহও করা যায়নি। এতে রেলওয়ের ১০ লক্ষ ৯১ হাজার ৮৬০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ বিষয়ে অডিট অধিদপ্তর যথাসময়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা নির্বিকার। রেলওয়ের নিরীক্ষা দলকে লালমনিরহাট বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের অডিটের দায়িত্ব দিলে এমন হাজারো পুকুর চুরির তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের এসএসএই/ওয়ার্কস/ লালমনিরহাট কার্যালয়ের স্টোরেও একই ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। বুড়িমারীতে অবস্থিত স্টোরের কাগজপত্রে ৩ হাজার ১৬৮.২৩ ঘনমিটার স্টোন ব্যালাস্ট থাকার কথা। কিন্তু রিটার্ন অ্যাডভাইস নোটের হিসাব অপেক্ষা ১ হাজার ৭৬১.১১ ঘনমিটার স্টোন ব্যালাস্ট কম রয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক প্রতি ঘনমিটার স্টোন ব্যালাস্টের বাজার মূল্য ৮০৮ টাকা হিসেবে উক্ত ব্যালাস্টের মূল্যবাবদ রেলওয়ের ১৪ লাখ ২২ হাজার ৯৭৬.৮৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এ জন্য রেলওয়ের অডিট অধিদপ্তর লালমনিরহাট কার্যালয়ের এসএসএই/কার্য হোসেন আহম্মদকে দায়ী করে ব্যাখ্যা চেয়েছে। লালমনিরহাট কার্যালয়ের ব্যালাস্ট সরবরাহের চুক্তিপত্র অনুযায়ী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কসমস কনস্ট্রাকশন ব্যালাস্ট সরবরাহ না দেয়ায় রেলওয়ের ৮ লাখ ৮ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। জানা গেছে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কসমস কনস্ট্রাকশন ১০ হাজার ঘনমিটার ব্যালাস্ট সরবরাহের পরিবর্তে ৩ হাজার ১৬৮.২৩ ঘনমিটার সরবরাহ করেছে। ফলে ৬ হাজার ৮৩১.৭৭ ঘনমিটার ব্যালাস্ট কম সরবরাহ দেয়ায় চুক্তিপত্র মোতাবেক ১০% টাকা জরিমানা হিসেবে আদায়যোগ্য। কিন্তু ২০১৩ সালে নিরীক্ষাকালীন পর্যন্ত উক্ত টাকা আদায় করা হয়নি, যা গুরুতর অনিয়মের পর্যায়ে পড়ে। দরপত্রেও অনিয়ম, প্রতিকার নেই ২০১২-১৩ অর্থবছরে রংপুর স্টেশন বিল্ডিং মেরামত এবং যাত্রী সুবিধা বাড়ানোর কাজের চুক্তিপত্র দরপত্রে নির্ধারিত তারিখের একদিন পর স্বাক্ষরিত হয়েছে। পিপিআর ২০০৮ এর ১০২ ধারার অনুচ্ছেদ ৪ মোতাবেক কৃতকার্য দরদাতা যথাসময়ে চুক্তি সম্পাদন করতে না পারায় দরপত্র জামানত বাবদ ৯৪ হাজার ৯৭৩ টাকা আদায়যোগ্য। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আদায় না করায় রেলওয়ের উল্লিখিত টাকা ক্ষতি হয়েছে। উক্ত বিধি মোতাবেক কাজপ্রাপ্ত দরদাতার দরপত্র জামানত হবে এবং দ্বিতীয় কৃতকার্য দরদাতাকে চুক্তি সম্পাদনের জন্য আহবান জানানোর নিয়ম। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে তা না করায় বিষয়টি গুরুতর অনিয়মের পর্যায়ে পড়ে। অন্যদিকে ব্রিজ নং-৬১/এফ এর স্প্যান এবং গার্ডার ওয়াল নির্মাণ কাজের ঠিকাদার নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারির ২৮ দিনের মধ্যে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেননি। নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করা হয়েছে ১৬ জানুয়ারি। ৭ দিনের মধ্যে ঠিকাদার তা লিখিতভাবে গ্রহণ করবেন। কিন্তু ঠিকাদার তা গ্রহণ করেছেন এক মাস ২ দিন পর অর্থাত্ ১৮ ফেব্রুয়ারি। এছাড়া নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড মোতাবেক ২৮ দিনের মধ্যে (১৩ ফেব্রুয়ারি) চুক্তি স্বাক্ষরের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার তা করেছেন আরো ৫ দিন পর ১৮ ফেব্রুয়ারি। পিপিআর ২০০৮ এর ১০২ ধারার ৪নং ক্রমিক মোতাবেক কৃতকার্য দরদাতা তফসিল-২-এ বর্ণিত ৭ দিনের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে সম্মতি না দিলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে তা না করায় রেলওয়ের ১ লাখ ৪২ হাজার ১৯৮ টাকা ক্ষতি হয়েছে।