আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং লেনদেন, আমদানি-রফতানি, ব্যাংক ঋণ প্রভৃতি বিষয় দিনে দিনে জটিল হয়ে উঠছে। শুরুতে ব্যবসা-বাণিজ্য আজকের মতো এতোটা কঠিন ছিল না। পৃথিবীর খুব পুরনো পেশা হিসেবে ব্যবসা ছিল ব্যক্তির মধ্যে পারস্পরিক পণ্যের আদান-প্রদান। একসময় তা দেশের আন্তঃলেনদেনে গড়ায়। তখন আজকের মতো ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয়নি। দীর্ঘপথ পরিক্রমার মধ্যদিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। ক্রমবিবর্তন, পরিবর্তন এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আধুনিক ব্যবসানীতি পদ্ধতি চালু হয়েছে। এখন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। এক্ষেত্রে নিজস্ব বুদ্ধি অতীত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে পুঁজি করে সেসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেন ব্যবসায়ীরা। আর্থিক ব্যবস্থাপনার আধুনিক কলাকৌশল জানা না থাকলে এখন ব্যবসা-বাণিজ্যে টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংকিং লেনদেনের নানা ধাপ, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং পরিচালনা, বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানসমূহ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান ইত্যাদি ছাড়া আজকাল ব্যবসা করা একদম অসম্ভব। এক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি অর্থাত্ আর্থিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন একান্ত জরুরি। ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি মানে হিসাব বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো রপ্ত করাই নয়। এর সঙ্গে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্যাংকার হিসেবে প্রাত্যহিক ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড পরিচালনাকালে সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনদের নানা অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা, অসচেতনতা প্রত্যক্ষ করার বিষয়গুলো সম্পর্কে বলা যায়। এমন অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যাংক গ্রাহক রয়েছেন যারা বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন রয়েছেন। পেশাগত জীবনে যারা ব্যাংকে টাকা তোলার জন্য প্রদত্ত চেক সঠিকভাবে লিখতে পারেন না। একইভাবে টাকা জমা দেয়ার স্লিপিও লিখতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যান। ব্যাংক লেনদেনের মাসিক অর্ধবার্ষিক ত্রৈমাসিক বিবরণী বুঝতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হয় অনেককে। ব্যাংকের কোন্ স্কিমে টাকা জমা রাখলে ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে সেটাও জানেন না অনেক পরিণত বয়সের মানুষ। এজন্য তারা বিভিন্নজনের সাহায্য সহযোগিতা নেন। ফলে তাদের আর্থিক বিষয়ের গোপনীয়তা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। আর্থিক বিষয়ক পেশায় যারা নিয়োজিত তাদের জন্য ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি যেমন প্রয়োজন তেমনিভাবে সাধারণ মানুষের জন্যও এটা খুব বেশি দরকার। বর্তমান সামাজিক আর্থিক প্রেক্ষাপটে এটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যারা ব্যবসা বাণিজ্যে নিয়োজিত সরকারি বেসরকারি চাকরি করেছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমায় কাজ করছেন তাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ডে সঠিকতা থাকা দরকার। পেশাগত অভিজ্ঞতায় তারা অনেক কিছুই রপ্ত করেন। তবে আগে থেকেই ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি অর্থাত্ আর্থিক স্বাক্ষরতা যদি তারা অর্জন করতে পারেন, তাহলে তাদেরকে কোনো জায়গায় ঠেকতে বা ঠকতে হবে না। আর্থিক স্বাক্ষরতার অভাব কিংবা ঘাটতির কারণে সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ বিনিয়োগ সম্ভব হয় না অনেকের পক্ষে। অনেকটা অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে তাদের পথ চলতে হয়। এভাবে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে কেউ কেউ ভাগ্যক্রমে লাভবান হয়েছেন আবার অনেকেই ধরাশায়ী হয়েছেন। অনেকটা হুজুগে মেতে একসময়ে অগণিত মানুষ শেয়ার ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু না বুঝে না জেনে কোটি কোটি টাকা ভুল জায়গায় বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন এদেশের লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। তাদের চাপা দীর্ঘশ্বাস আর দুঃখ আহাজারি ভরা আর্তনাদে আজও বাংলাদেশের বাতাস ভারি হয়ে আসে। ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি এ ক্ষেত্রে একজন বিনিয়োগকারীকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দিতে পারে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের আর্থিক সাক্ষরতা জ্ঞানের অভাবের কারণে বিভিন্ন প্রতারকচক্র রাতারাতি লাখপতি কোটিপতি বানিয়া দেয়ার মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানির নামে ইতিমধ্যে লাখ লাখ নারী পুরুষকে পথের ভিখারীতে পরিণত করা হয়েছে। যে মানুষটি ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে পেরেছেন তিনি কোনোভাবে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানি কিংবা ভুয়া সমবায় সমিতির প্রতারণার জালে নিজেকে জড়াবে না সে বিষয় নিশ্চয়তা দেয়া যায়।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির বিকাশ হতে হবে। এটা জোর করে চাপিয়ে দেয়া কোনো বিষয় নয়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাজের সবস্তরেই ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির চর্চা যাতে হয় সেদিকে মনোযোগী হতে হবে। বাজেট প্রণয়নে নীতিমালা, বাজেট তৈরিতে দক্ষতা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ, পণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ, মূলধন ব্যয়, রাজস্ব ব্যয় ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা না থাকলে আজকাল ব্যবসায়ী কিংবা শিল্পপতি হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তেমনিভাবে ব্যাংক-বীমা কর্পোরেট দুনিয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে।
বই-পুস্তক পড়ে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আর্থিক বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান না নিয়েও এখন হঠাত্ হঠাত্ অনেকেই ব্যবসা বাণিজ্য কর্পোরেট জগতে চমত্কার কৃতিত্বের প্রমাণ দিচ্ছেন। তারা নিঃসন্দেহে অসাধারণ মেধার অধিকারী। তাদের এই কৃতিত্ব কোনোভাবেই ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির এবং প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে ম্লান করে না। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কেলেংকারি, অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনাগুলো ঘটার পেছনেও যথার্থ ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাবকে দায়ী করা যায়। উপযুক্ত আর্থিকজ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতার অভাবের কারণে ব্যাংক কর্মকর্তাদের নাকের ডগা দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ী, ঋণগ্রহীতারা হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুটে নিয়ে যেতে পেরেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে স্কুল ব্যাংকিং বিশেষ তাত্পর্যময় ভূমিকা রাখছে। সঞ্চয় বিপদের বন্ধু, একথা সবাই জানেন। কিন্তু বাস্তবে সঞ্চয়ী হওয়ার বিষয়ে আমরা সবাই তেমন সচেতন ও সিরিয়াস নই। অভিভাবক যদি নিজে সঞ্চয়ী মনোভাবের হন এবং সন্তানদের সেভাবে একই আদর্শের অনুসারী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তাহলে পারিবারিক সুখ, সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হতে পারে। আজ যারা স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় হিসাব খুলে বিভিন্ন ব্যাংকে লেনদেন শুরু করেছে তারা আগামীদিনে জ্ঞান, তথ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
