আমদানিকৃত পাট বীজের উপর নির্ভরশীল দেশের পাট চাষ!

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:০৯
বিশ্বে প্রধান পাট উত্পাদনকারি দেশ বলে পরিচিত বাংলাদেশ। অথচ পাট বীজ আসে ভারত থেকে। বাংলাদেশে পাট বীজের বাজার বর্তমানে ভারতীয় বীজ ব্যবসায়ীদের দখলে। আর ভারতীয় পাট বীজে বাজার সয়লাব। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ ডলারের পাট বীজের ব্যবসা করে ভারতীয় বীজ ব্যবসায়ীরা। দেশে পাট চাষ ভারতীয় বীজ নির্ভর হয়ে পড়েছে। পাটের দেশ বাংলাদেশ। আগের দিনে চাষী তার প্রয়োজনীয় পাট বীজ নিজে উত্পাদন করত। সে বীজ ঘরে ঘরে যত্ন করে রাখত্ এবং পাট চাষ করত। দেশ স্বাধীনের পর চোরাপথে ভারত থেকে কিছু পরিমাণ পাট আসতে শুরু করে। যতই দিন যেতে থাকে ভারতীয় বীজ আসা বাড়তে থাকে। বিগত শতকের ৯০-এর দশকের মধ্যে ভারতীয় পাট বীজের উপর নির্ভর হয়ে পড়ে আমাদের দেশ। আগে চোরাপথে আসলেও বর্তমানকালে বৈধভাবে আমদানির মাধ্যমে আসছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রে জানা যায়, এ বছর বীজ ব্যবসায়ীদের সাড়ে ৩ হাজার টন পাট বীজ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। আর সরকার আমদানি করবে এক হাজার টন। বেনাপোল ও বুড়িমাড়ি বন্দর দিয়ে এ বীজ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। ৩০ মার্চ পর্যন্ত বেনাপোল বন্দর দিয়ে ১১শ’ টন এবং বুড়িমাড়ি দিয়ে ৭শ’ টন পাট বীজ আমদানি হয়েছে। এখনও বীজ আসা অব্যাহত আছে বলে দুটি বন্দরের কোয়ারেনটাইন অফিস সূত্রে জানা যায়। প্রতি কেজি পাট বীজের আমদানি মূল্য এক ডলার ১০ সেন্ট থেকে এক ডলার ৫০ সেন্ট পর্যন্ত বলে এক আমদানিকারক বলেন। অর্থাত্ এক টনের দাম ১১শ’ ডলার থেকে ১৫শ’ ডলার। ভারতের কৃষি কল্যাণের চক্র মার্কা, ন্যাশনাল সিড করপোরেশনের পাঞ্জা মার্কা. পান্ডে কৃষি ভান্ডারের রানী মার্কা, জয়সাল সিড কোম্পানীর মহারানী মার্কা, জয় কিষান সিড’র গরু মার্কা, কৃষি সেবায়নের বেটাবেটি মার্কাসহ আরো কয়েকটি কোম্পানীর পাট বীজ বাংলাদেশে আমদানি হয়ে থাকে। প্যাকেটগুলো সুন্দর বলে চাষিকে আকৃষ্ট করে। ফলে ভারতীয় বীজ বেশি বিক্রি হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বীজের দোকানগুলোতে দেশে উত্পাদিত পাট বীজের ক্রেতা মিলে না বলে বীজ ব্যবসায়ীরা জানান। এক কেজি ভারতীয় পাট বীজ একশ’ ১০ টাকা থেকে একশ’ ৩০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। বৃষ্টি নেই বলে বীজের চাহিদা কম। তবে অনেক চাষী সেচ দিয়ে বীজ বপন করছেন। বৃষ্টি হলে চাহিদা বেড়ে যাবে বলে বীজ ব্যবসায়ীরা জানান। ভারতে পাট বীজ উত্পাদন হয় মহারাস্ট্রে। সব কোম্পানীর বীজের প্যাকেটে লেখা থাকে মহারাস্ট্রে তৈরি জেআরও - ৫২৪। আমাদের দেশে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এর কর্মকর্তা ড. এ কে এম মাকসুদুল আলম বলেন, পাট চাষের ধরন বদলে গেছে। আগে দেশি জাতের পাট শতকরা ৮০ এবং তোষা জাতের পাট শতকরা ২০ ভাগ চাষ হত। এজন্য দেশে তৈরি বীজে চাহিদা মিটত। এখন শতকরা ৮০ ভাগ তোষা এবং শতকরা ২০ ভাগ দেশি জাতের পাট চাষ হচ্ছে। বছরে পাট বীজের চাহিদা ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টন। দেশি বীজ আমদানি করতে হয় না। তোষা জাতের বীজের প্রায় পুরোটা আমদানি করতে হয় বলে তিনি জানান। কৃষক তার প্রয়োজনীয় বীজ নিজেই উত্পাদন করতে পারে। এজন্য দরকার উত্সাহ ও প্রনোদনা। বাড়ির আশে-পাশের পতিত জমিতে শাক-সবজির সাথে সাথী ফসল হিসাবে পাট বীজ উত্পাদন করা সম্ভব বলে তিনি জানান। আগষ্ট মাসের দিকে বীজের চাষ করলে জানুয়ারি মাসে বীজ ঘরে তোলা যায়। এজন্য চাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। এভাবে দেশে পাট বীজের ঘাটতি মিটানো যেতে পাবে বলে তিনি জানান। পাট অধিদপ্তরের উচ্চ ফলনশীল পাট ও পাট বীজ উত্পাদন, উন্নত পাট পচন প্রকল্পের পরিচালক ড. মঙ্গল চন্দ্র চন্দ বলেন, বীজ ছিটিয়ে বপন পদ্ধতিতে, চারা তৈরি করে রোপণ পদ্ধতি ও পাটের ডগা কেটে রোপণ পদ্ধতিতে পাট বীজ উত্পাদন করা যায়। বাড়ির পাশে পতিত জমিতে এভাবে চাষী তার প্রয়োজনীয় বীজ উত্পাদন করতে পারে। আমাদের দেশে ০৭২ এবং ০৯৯৭ জাত দুটি ভাল মানসম্পন্ন পাট বীজ। ফলনও ভাল হয়। তিনি জানান, বিএডিসি এক হাজার টনের মত, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট একশ’ টনের মত, পাট অধিদপ্তর ১২শ’ টন, বিএডিসি হাজার টনের মত, সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার টন পাট বীজ দেশে উত্পাদিত হয়ে থাকে। এতে দেশি জাতের চাহিদা মিটে থাকে। কিছু পরিমাণ তোষা বীজেরও চাহিদা মিটে।