সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলো জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, সরকার ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এই লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পত্র দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কিভাবে এই কাজটি সম্পাদন করবে তার কোন দিক-নির্দেশনা কিন্তু দেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছুদিন আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আমানত এবং ঋণের সুদের হারের পার্থক্য অর্থাত্ স্প্রেড (আমানত ও ঋণের সুদ হারের পার্থক্য) ৫% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। দেশীয় ব্যাংকগুলো এই নির্দেশ মোটামুটি মানলেও বিদেশি ব্যাংকগুলো তা পালন করছে না। এমনিতে পৃথিবীর কোথাও ৫% স্প্রেড বহাল আছে কিনা সন্দেহ। এইসব বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিজ দেশে সুদের হার ৫% এর কম। অথচ আমাদের দেশে তারা স্প্রেডই রাখছে ৫% এর উপর। এছাড়া অস্বাভাবিকহারে ঋণ মঞ্জুরের প্রোসেসিং ফি এবং সার্ভিস চার্জ তো নিয়েই যাচ্ছে। এখন এই স্প্রেড এর বিষয় ছাড়া আর কোন বিষয়ের উপর তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। অথচ যে বিষয়গুলোর উপর সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত তা হল: ১. পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনা ২. আমানতের সুদ হার কমানো এবং ৩. ব্যাংক এর লাভের উপর ধার্য কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, এই বিষয়গুলোর উপর সেভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি।
দীর্ঘমেয়াদী ও চলতি মূলধনের জন্য ব্যাংকের যে সুদের হার আমাদের দেশে বিদ্যমান তা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। ঋণের অতিরিক্ত সুদের কারণে বিনিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্পাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে, ফলে উদ্যোক্তাদের পক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। পরিণতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, শিল্পখাতে মেয়াদী ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো ১৮ থেকে ২১% পর্যন্ত সুদ আদায় করছে। এর সঙ্গে প্রোসেসিং ফি আর সার্ভিস চার্জ আদায় করা হচ্ছে বেপরোয়াভাবে। এছাড়া মেয়াদপূর্তির আগে ঋণ সমন্বয় করতে চাইলে কোন কোন ব্যাংক এ বাবদ অতিরিক্ত ৩ থেকে ৫% হারে চার্জ আদায় করছে। যা কেবল অনৈতিকই নয়— সম্পূর্ণ বেআইনি। যার ফলে সামগ্রিকভাবে উদ্যোক্তাদেরকে ২৩ থেকে ২৫% হারে সুদ গুণতে হচ্ছে, অথচ এগুলো দেখার যেন কেউ নেই। এই হারে সুদে ঋণ নিয়ে যারা শিল্প বাণিজ্য গড়ে তুলেছেন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সব থেকে তুঘলকি ঘটনা ঘটছে এসমই ঋণের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী এখন প্রায় সব ধরনের শিল্প এবং বাণিজ্য এসএমই এর আওতাধীন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারি করা এক সার্কুলারে কঞ্জুমার ক্রেডিট এবং ক্রেডিট কার্ডের ন্যায় এসএমই ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে এইখাতে প্রদত্ত ঋণের উপর স্প্রেড এর সীমা রহিত করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো যেন এসএমই খাতে ঋণ দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সার্ভিস চার্জ আর প্রোসেসিং ফি ঋণের সঙ্গে যোগ করে তার উপর সুদ ধার্য করা হচ্ছে। ফলে এসইমই খাতে ঋণের সুদের হার ২৫% এর উপর পড়ছে। শিল্প খাত ছাড়াও সমুদয় বাণিজ্য খাতেও ব্যাংকগুলো গ্রহীতাদের এসএমই খাতের মেয়াদী ঋণ নিতে বাধ্য করছে। সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে ওডি বা সিসি ঋণ মঞ্জুর করা হচ্ছে না বললেই চলে। এখানে উল্লেখ্য যে, দুনিয়ার কোথাও আমাদের দেশের মত ঋণের সুদ হার বিদ্যমান নেই। ভারতে গড়ে এই হার ১০.৭৫%, চীনে ৭.৫০%, থাইল্যান্ডে ৭.০৪%, মালেশিয়ায় ৫%, জাপানে ১.৩৫% এবং তাইওয়ানে ১.৭৫% সুদ হার বিদ্যমান রয়েছে। এই উপমহাদেশে পাকিস্তানে ১২.০১%, শ্রীলঙ্কায় ৯.৪৩%, মালদ্বীপে ১০.৩৮% হারে মেয়াদী ঋণের সুদ ধার্য করা হয়।
এখানে যে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া দরকার, ব্যাংকিং একটি ব্যবসা খাত এবং লাভ করাটাই এখানে মূল উদ্দেশ্য। সিএসআর এর নামে যে অর্থ ব্যয় করা হয় তা নিছক গৌণ। প্রতিটি ব্যবসায় পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারিত হয় চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে। কখনো কখনো দুষ্প্রাপ্য পণ্য বা সেবার জন্য ক্রেতাদের অধিক মূল্য দিতে হয়। কিন্তু ব্যাংক ঋণের অর্থের যোগান তো দুষ্প্রাপ্য নয় বরং, ঋণের চাহিদা কম হওয়ায় প্রদানযোগ্য উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ আশি হাজার কোটি টাকার উপরে। ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে সক্ষম না হওয়ায় এই উদ্বৃত্ত তারল্যের সিংহভাগ সরকার গ্রহণ করছে। অথচ এর জন্যে সরকার ব্যাংকগুলোকে নাম মাত্র সুদ দিলেও ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের জন্য সুদের হার কমাচ্ছে না। বাংলাদেশে এখন সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে অর্ধ শতাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আবহে ঋণের সুদের হার কমে আসা উচিত। কিন্তু তা হচ্ছে না। এর জন্য মূলত কারণ দুটি: ১. অত্যাধিক পরিচালন ব্যয় ২. বিরাজমান অলিগোপলি বা কার্টেল ব্যবস্থা।
এমনিতেতো ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয় অধিক। এর সাথে যুক্ত হয় বড় বড় অংকের চাঁদা। বিভিন্ন সময়ে সরকারের যখন ফান্ড সংগ্রহের প্রয়োজন হয় ব্যাংকগুলো যেন উদার হস্তে সেখানে শরিক হয়। অবশ্য আরেকটি কারণে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার কমাতে পারছে না। সেটি হল ব্যাংকের কস্ট অফ ফান্ড। আগে ব্যাংকগুলোর কস্ট অফ ফান্ড ৮ থেকে ৯% হারে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা অনেক অনেক বেড়ে গেছে। এর কারণ জমাকৃত আমানতের সুদ হার। আগে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবে আমানতের পরিমাণ থাকত সিংহ ভাগ। এ কারণে কস্ট অফ ফান্ড ৮ থেকে ৯% হারে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হত। এখন ব্যাংকে আমানতের ৮০% এর বেশি হল স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট। ব্যাংকগুলো তো আমানত সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে এই হার আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বিগত দুই বছরের মন্দাজনিত কারণে কিছু কিছু ব্যাংক আমানতের উপর সুদ হার কমিয়ে দেয়। এতে ভাল ফল হয়। এ কারণে কস্ট অফ ফান্ড কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো কিছু ক্ষেত্রে ঋণের সুদ হারও কমাতে সক্ষম হয়। ১৪ থেকে ১৬% হারে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে শুরু করে। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন চালানো যায়নি। সরকার নিজস্ব আমানত সংগ্রহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে আমানতের সুদ হার বাড়িয়ে দেয়। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদী আমানতের উপর ১৩.২৪% হারে মুনাফা দেয়া শুরু করে। এর পাশাপাশি সরকারি বন্ড অর্থাত্ সঞ্চয়পত্রের মুনাফাও দৃশ্যমান হারে বাড়িয়ে দেয়া হয়। এখন এই হারের বেশি দিতে ব্যর্থ হলে বাণিজ্যিক ব্যাংকে তো কেউ টাকা জমা রাখবে না। তাই কস্ট অফ ফান্ড আর ৫% স্প্রেড যোগ করে ঋণের সুদ হার কমানো আদৌ সম্ভব হবে কিনা তা বিবেচনার দাবি রাখে।
লেখক: সভাপতি, এসএমই ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
